এসব কথা লিখতে সময় লেগে গেল দশ মিনিট ভাবতে সময় লেগেছিল দশ সেকেন্ড। তারপর আমার সেই কালো হাত যা থেকে এখনও আমি রক্তের গন্ধ পাই, সেই খুনি হাত তুলে চেকারের দিকে এগিয়ে গেলাম।
আমি এগিয়ে ছিলাম মাত্র এক পা। কিন্তু সে আমার চোখ মুখ চেহারায় ফুটে ওঠা পরিবর্তনের অর্থটা বুঝে ফেলেছে। বুঝে ফেলেছে, এই রাত আঁধারে তাকে খুন করা হবে। তাই ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তারপর কুকুরের মত লেজ তুলে ছুটে পালিয়ে চলে গেল। সারারাতে আর আমার ত্রিসীমানায় এল না।
রাত শেষ হয়ে পরের দিন সকাল সাতটা নাগাদ নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেলাম হাওড়া স্টেশনে। তাকালাম প্লাটফর্ম থেকে বাইরে যাবার পথের দিকে। পথ আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কতগুলো পাষাণ হৃদয় পাহারাদার।ওদের হাতে হয় টিকিট নয় ঘুষ দাও, তবেইমিলবে মুক্ত দুনিয়ায় পৌঁছাবার ছাড়পত্র। আমার যে কিছুই নেই। না তির না তুণীর, খালি হাতেই আমাকে এই ব্যুহচক্র ভেদ করতে হবে।
জীবন তো একটা যুদ্ধ। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকেরা সরীসৃপের মতো বুকে হেঁটে এগোয়। দূর থেকে লক্ষ্য করে দেখলাম বাইরে যাবার গেটের সামনে যে অবরোধক চক্র, তার একটায় তালা মেরে গেট কিপার কোথায় যেন গেছে। একটু ভানদিক ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে সেই চক্রের কাছে গিয়ে শুয়ে পড়লাম নিচে। তারপর বুকে হেঁটে চক্রের তলা থেকে বের হয়ে গেলাম বাইরে। এরপর হাঁটতে শুরু করলাম শিয়ালদহের দিকে।মনে হয় তখন হাওড়া থেকে শিয়ালদহের বাসভাড়া বেড়ে কুড়ি পয়সা হয়ে গিয়েছিল। সেদিন আমার কাছে কুড়ি পয়সাও ছিল না। পুঁজির পাঁচটাকা রায়পুরে পৌঁছাবার আগেই খরচ হয়ে গিয়েছিল। কাল বিকেল থেকে পেটে জল ছাড়া আর কিছু পড়েনি। খিদেয়, পথশ্রমে, মানসিক ধকলে আমার শরীর আর শরীর নেই–একটা বোঝা হয়ে গেছে। এই বোঝা নিয়ে কোথায় যে যাব তা বুঝে উঠতে পারি না।
অবশেষে স্থির করি সেই পুরাতন জায়গা যাদবপুরেই যাব। গরফায় আমার বন্ধুরা আছে। যদি কিছু সহায়তা পাওয়া যায়–যা আমার এখন একান্ত দরকার, তা এদের কাছেই পাওয়া যেতে পারে। না হলে আর তো কেউ নেই।
মনে হয় বেলা বারোটায় এসে পৌঁছেছিলাম যাদবপুর স্টেশনে। ওখানে দেখা হয়ে গেল আমার এক পূর্ব পরিচিতর সাথে। তার মুখে খবর পেলাম বাহাত্তরের ইলেকশনের দিন আশু মজুমদার মিলিটারির সাথে এক মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা গেছেন। গরফা সেলিমপুরে এখন আর নকশালরা নেই। কিছু মারা গেছে, কিছু পালিয়ে গেছে, কিছু ধরা পড়ে জেলখানায় পচছে। আর কিছু যাদের রাজনৈতিক সচেতনার অভাব ছিল তারা প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে কংগ্রেসের ঝাণ্ডার নিচে। গরফা জুড়ে এখন দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে কংগ্রেসি গুণ্ডা হাতকাটা জীতেন এর দলবল। শুধু কামারপাড়া বাদে সমস্ত যাদবপুর কংগ্রেসের দখলে।
তাহলে আমি এখন কী করব। কোথায় যাব! সামান্য মাত্র কয়মাসে এই শহরটা আমার কাছে এমন নির্বান্ধব হয়ে যাবে এমন অনাত্মীয় শহর হয়ে যাবে কল্পনা করতে পারিনি। এখানে কার কাছে গিয়ে কি সাহায্য চাইব। আমি কোন সাধারণ মানুষের মতো নই। কে কোন গলিতে আমার জন্য ভোলা চাকু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তা কে জানে। এই শহরে আজকাল মারপিট বোমাবাজি আগের তুলনায় কম হয়, তবে লাশ পড়ে বেশি। সব রাজনৈতিক দলের কর্মীরা মারপিটের সেই পুরাতন ছক বদলে ফেলেছে। এখন একদল তক্কে তক্কে থেকে আর একদলের কর্মীকে ধরে সোজা গলার নলিটা কেটে দেয়।
আমার তখন দিনটা তো নানাভাবে কেটে যায় মুশকিল হয় রাত কাটানো। শোবার কোন জায়গা ছিল না তাই কোনদিন স্টেশনের ওভার ব্রিজের সিঁড়ির নিচের অন্ধকারে, কোনদিন টিকিট কাউন্টারের সামনের বটগাছের আড়ালে কোনদিন রিকশা লাইনে তালামারা কোন রিকশার উপর এভাবেই রাত কাটে। এই অবস্থায় কাটিয়ে ছিলাম তিন-চার দিন। এই কদিন বলতে গেলে কিছুই খেতে পাইনি। চান করিনি ঘুমও হয়নি। সেদিন রাতে আমি ঘুমিয়েছিলাম গুঁড়িসুড়ি মেরে এক রিকশার উপরে। তখনও সূর্যের আলো ঠিকমত ফুটে ওঠেনি। একটা ছাই ছাই অন্ধকার পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে চারদিকে। সময় তখন মনে হয় ভোর ছয়টা কী সাড়ে ছয়টা। রিকশা লাইনের সামনের চা দোকানে কয়লার উনুনে সবে আগুন জ্বেলেছে। সাদা ধোয়ায় ভরে গেছে এলাকাটা। স্টেশনে রাত কাটানো কিছু রিকশাঅলা ঘুম চোখে এসে রিকশার তালা খুলে লাইনে লাগাচ্ছে। ভাড়া তোলবার সময় হল। বিহারি হোটেলঅলা ছেচন সাউ কানে পৈতা জড়িয়ে লোটায় জল নিয়ে রেল লাইনের পাশে প্রাতঃকৃত সারতে যাচ্ছে। খবরের কাগজের হকাররা যে যার সাইকেলে কাগজের বান্ডিল বাধছে। রোজকার এই স্বাভাবিক ছন্দে হঠাৎ ব্যাঘাত ঘটে গেল। পরপর শোনা গেল এক ঝক কান ফাটানো গুলির শব্দ। সে শব্দে ভয় পেয়ে ডানা ঝাঁপটিয়ে সামনের বটগাছ থেকে উড়ে পালাল এক ঝাঁক পাখি। টিকিট কাউন্টার আর টি স্টলের মধ্যে দিয়ে স্টেশন থেকে বাইরে আসবার যে পথ, সেদিকে তাকিয়ে মনে হল যেন কোন সামুদ্রিক ঝড় আছড়ে পড়েছে, বাঘ তাড়া করেছে। কোন। তখন ক্যানিং থেকে আসা একটা ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকেছিল। সেই ট্রেন থেকে নামা যাত্রীরা প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে সামনের দিকে ছুটে পালাচ্ছে। গ্রাম থেকে শহরে আসা বাবুবাড়ির কাজের মাসি ছুটতে গিয়ে কাপড়ে পা জড়িয়ে নিচে আছড়ে পড়ে হাত পা কেটে রক্তাক্ত। কেউ তাকে তুলছে না। মাড়িয়ে ডিঙিয়ে সবাই চলে যাচ্ছে। একজন মজুর খাটা লোকের কাধ থেকে ধাক্কা লেগে ছিটকে গেল কোদাল ঝুড়ি। এক মাছঅলার মাছের চাকন উল্টে গিয়ে জলে আর মাছে পথ একেবারে ছয়লাপ। এরই মধ্যে স্টেশনের সুইপার বিজয় পেটে গুলি খেয়ে রক্তপ্লুত অবস্থায় ছিটকে এসে পড়ল রিকশা লাইনের সামনে। কিছুক্ষণ কাটা ছাগলের মত হাত পা ছুঁড়ে শেষে চুপ হয়ে গেল। রিকশার উপর থেকে নেমে আসতেই কে একজন ছুটতে ছুটতে বলে গেল–পালাও। স্টেশনের পুলিশ ক্যাম্পে নকশালরা হামলা করে অস্ত্রশস্ত্র সব নিয়ে গেছে। দু তিনজন মার্ডার।
