পরের দিন ট্রেনে চেপে এসে পৌঁছাই ভিলাই। ভিলাই থেকেও হাওড়া যাবার ট্রেন ধরা যায় সেটা তখন আমার জানা ছিল না। তাই সেখান থেকে আর একটা ট্রেনে চেপে এসে নামলাম রায়পুর। শুনলাম, ঘন্টা খানেক পরেই এখানে আসছে বম্বে টু হাওড়া মেল। বসে থাকি সেই ট্রেনে চাপবার আশায়। এমনিতে স্টেশনটা বেশ ফাঁকাই ছিল, স্টেশনে ট্রেন ঢোকবার মিনিট দশেক আগে কোথা থেকে কে জানে শত শত পুলিশ, চেকার এসে সারা প্লাটফর্মে ছড়িয়ে গেল। পুলিশ লাঠি উঁচু করে স্টেশনের যত ভিখারি ভবঘুরে মুটে হকার সব খেদিয়ে এক নাম্বার প্লাটফরম থেকে দুরে সরিয়ে দিল। তাড়া খেয়ে আমিও রেল ব্রিজের উপর দিয়ে দু নাম্বার প্লাটফর্মে এসে পড়ি। দাঁড়িয়ে থাকি সেখানে এই আশা নিয়ে, ওই ট্রেন এলে উল্টো দিক থেকে রেল লাইন টপকে ছুটে গিয়ে ট্রেনে চেপে বসব। দুনাম্বার প্লাটফর্মের এক গেটের চেকার আমার অভিসন্ধি বোধ হয় বুঝে গিয়ে থাকবে। সে এসে আমাকে ধরল। টিকিট নেই জেনে গেটের বাইরে বের করে দিল। বাইরে এসে লোহার রেলিংয়ে থুতনি ঠেকিয়ে বড় কাতর চোখে দেখলাম সেই ট্রেনখানা স্টেশনে প্রবেশ করল।
এটা কোন সাধারণ ট্রেন নয়। এ হচ্ছে বম্বে টু হাওড়া উইকলি স্পেশাল। এর ভাড়া বেশি। যাত্রীদের সুখ সুবিধাও বেশি। চলে দ্রুত, থামে খুবই কম স্টেশনে। মিনিট পাঁচেক থেমে থাকার পর সিটি দিয়ে সে রওনা দিল হাওড়া উদ্দেশ্যে। এখন আমি কী করি! আমাকে না নিয়ে আমার স্বপ্নের গাড়ি চলে যাচ্ছে। চলে যাবে এত সহজ নাকি? মাথা গরম হয়ে গেল আমার। গেটে চেকার, যে যেতে দেবে না আমাকে। না দিক, আমি আমার জন্য অন্যপথ খুঁজে নেব। সারাটা জীবনই তো আমি অন্যপথের পথিক। উঠে পড়লাম রেলিংয়ের উপর। তারপর লাফিয়ে পড়লাম দু নাম্বার প্ল্যাটফর্মের মধ্যে। তাড়া ছিল বলে অবতরণ সঠিক হল না। আছাড় খেয়ে পড়লাম কংক্রিটের মেঝেয়। হাটুর মালাইচাকি ছড়ে গেল। সেদিকে তখন আর দেখার সময় নেই। আমি দেখছি ট্রেন, যার ক্রমে গতি বেড়ে যাচ্ছে। আর দেরি নয়। ছুটে গিয়ে লাফিয়ে নেমে পড়লাম নিচে, রেল লাইনের উপরে। তারপর আর একটু ছুটে ধরে ফেললাম চলন্ত ট্রেনের দরজার পাশের হাতল। ঝুলে পড়লাম হাতল ধরে। তখন সারা প্লাটফর্মে লোক ভয়ে চিৎকার করছে এ্যাই রে। গেল বুঝি। গেলাম, তবে চাকার তলে নয়, কামরার মধ্যে। এক হাতে হাতল ধরে রেখে অন্য হাতে দরজার লক খুলে অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশ ঘটল আমার। এই ট্রেনে আমার মত দৈনদশার-চেহারা পোষাকের আর একজন যাত্রী পাওয়া যাবে কিনা কে জানে। আমি কোনদিকে না তাকিয়ে–আমার মত যাত্রীর জন্য ঈশ্বর দ্বারা নির্ধারিত যে স্থান-দরজার পাশে পায়খানা বাথরুমের সামনে বসে পড়ি।
আমি যখন এই ট্রেনে চেপেছিলাম তখন বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামছে। এখন কামরার মধ্যে আলো জ্বলতে শুরু করেছে। বোধহয় আধঘন্টা চলেছে ট্রেন। এমন সময় এলো এক চেকার। কী অদ্ভুত চোখ তার। আমাকে দেখেই সে বুঝে গেছে আমি কোন শ্রেণির যাত্রী। শ্রেণি তো মাত্র দুটো এই কামরায়-হ্যাব আর হ্যাঁব নটস। যাদের টিকিট আছে আর যাদের টিকিট নেই। আমি শেষ দলের। সে তার বেয়নেটের মত তর্জনি আমার দিকে উঁচিয়ে হুকুম দিল–”দো ডাব্বা ছোড়কে আগে নিকল যা।” এই দুটো কামরার দায়িত্বে তিনি আছেন। তিনি তার দায়িত্বের এলাকা থেকে আমাকে স্রেফ আবর্জনার যত অন্যের এলাকায় নিক্ষেপ করে নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন। কিন্তু যার এলাকায় আমি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সে বা আমাকে সহ্য করবে কেন। আধঘন্টা পরে সে এসে অনুরূপ আদেশ দেয়–দো কামরা ছোড়কে ট্রেনে উঠেছিলাম মনে হয় পাঁচটায়, সেই থেকে কোথাও স্থির হয়ে বসতে পারলাম না। রাত দুটো আড়াইটা পর্যন্ত এভাবে কুকুর খেদা চলতে রইল।
এবার যে কামরাটায় গিয়ে পৌঁছালাম তার প্লাটফর্মের উল্টোদিকের দরজাটা হাট করে খোলা। খোলা দরজা দিয়ে হু হু করে মধ্যরাতের ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। আমি আর দেরি না করে গামছা বিছিয়ে সেখানে শুয়ে পড়লাম। যতক্ষণ পারা যায় একটু ঘুমিয়ে নিই। এবং তলিয়ে গেলাম গভীর ঘুমে। কতক্ষণ এভাবে ঘুমিয়ে ছিলাম জানিনা। হঠাৎ যেন একটা বিস্ফোরণ হল। বিকট শব্দের সাথে একটা ভারী কিছু আছড়ে পড়ল আমার মাথার উপরে। মনে হল মাথাটা বুঝি চুরমার হয়ে গেল। কিসের আঘাত এটা? তবে কী দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা এই ট্রেনখানা লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে গেল হাজার ফুট নিচে কোন গিরিখাদে। তারই ফলে মাথায় এই আঘাত। সেই আঘাতে মাথাটা খানিক সময় ঝনঝন করে শেষে অবশ হয়ে গেল। অন্ধকার ঘনিয়ে এল চারিদিকে। কিছু সময় পরে সম্বিত ফিরলে চোখ মেলে দেখি–ঠিক আমার মাথার উপরে উঁচু হয়ে আছে একটা বুটসহ পা। আঘাতটা এসেছে ওই বুট থেকে। বুটের মালিক একটা লাথি মারবার পর আর একটার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লোকটা একজন চেকার। এই কামরা যার দায়িত্বে সে চেহারা, পোষাক, আর ধুলি শয্যা দেখে বুঝে গেছে আমার কোন টিকিট নেই। ফলে এই কামরায় আমি অনধিকার প্রবেশকারী। যা লাথি খাবার উপযুক্ত অন্যায়-অপরাধ। তাই বিনা দ্বিধায় সে সেটা করে দিয়েছে।
লাথি খেয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। উঠে দাঁড়াল আমার মনের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সেই শয়তানটাও। চারদিকে তাকালাম। রাত এখন গভীর। কেউ কোথাও জেগে নেই। সব মানুষ যেন মরে পড়ে আছে। তাকালাম খোলা দরজা দিয়ে অন্ধকার পৃথিবীটার দিকে। যার মধ্য দিয়ে দুরন্ত বেগে ছুটে চলছে এই নৈশ্যযানখানা। এই সময় দরকার মাত্র একটা আচমকা ধাক্কা। পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের রোগা চেকারটা সেই ধাক্কায় খোলা দরজা দিয়ে শোলার মত উড়ে চলে যাবে। এখন আমাকে তাই করতে হবে। ওকে উড়িয়ে দিতে হবে।
