খ্যারকাটা ড্যামের সব কাজই ফুরনে চলে। যত কাজ তত পয়সা। দশ ফুট লম্বা দশ ফুট চওড়া এক ফুট গভীর, মাটির মাপে যা একশো, এইটুকু মাটি কাটার মজুরি পচাত্তর টাকা শুনে আনন্দে আমরা লাফিয়ে গিয়ে ট্রাকে উঠেছিলাম। নিজেদের শ্রমক্ষমতার উপর আমাদের আস্থা আছে। ভেবেছিলাম শুয়ে বসে জিরিয়ে আমি আর ভাই দুজনে একশো মাটি নিশ্চয় কেটে ফেলব। বাবার হাত লাগাবার দরকারই পড়বে না। কাজের কাছে গিয়ে মাটি দেখে বুক কেঁপে গেল। যা কাটতে হবে তা মাটি নয় চুনের মত নরম আঠালো এক ধরনের পাথর। এ মাটিতে গাইতি চলে না কোদাল বসেনা। ছেনি হাতুড়ি দিয়ে খুঁচে খুঁচে তুলতে হবে। এ কাজে অতি বড় পরিশ্রমীও দুটাকা মজুরি তুলতে পারবে না।
সে সময়টা আবার মে-জুন মাস। এটা বছরের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়। বাতাসে তখন বইছে। বস্তার জেলার সেই কুখ্যাত-লু! যা গায়ে লাগলে চামড়া পুড়ে ফোঁসকা পড়ে যায়। বেলা আটটা-নটাতেই মাটি যেন রুটি সেকা চাটুর মতো তেতে ওঠে। আমাদের পায়ে চপ্পল গায়ে জামা নেই। রাগীরোদ তার ইচ্ছামত আমাদের উদ্যোমশরীরে ছোবল মারে। বাংলার নরম জল হাওয়ায় গঠিত এই দেহ বস্তার জেলার পরিবর্তিত প্রকৃতির দাপট সহ্য করতে পারল না। অসুস্থ হয়ে পড়লাম আমি। আবার সেই বাল্যবেলার রোগ-আমাশা আমাকে চেপে ধরল। এবার তা আগের চেয়ে তীব্র। এবার হাসপাতাল ছিল। সারারাত চলল স্যালাইন, ওষুধ,ইনজেকসান। দিন ছয়-সাত লেগেছিল রোগমুক্ত হতে।
এরপর ভিলেজে ফিরে এসে ভাঙাচোরা মন আর অর্ধেক সুস্থ শরীর নিয়ে কাজে যাবার ক্ষমতা ছিল না। বসে রইলাম ঘরে। আমি কাজে যেতে পারছি না, বাবারও শরীর ভালো নয়। একা চিত্ত কী কাজ করবে।ক পয়সা পাওয়া যায় তাতে?তখন এমন হল যে সাবসিডির চালে যে কয়দিন চলে তারপর আর চাল কেনা যায় না। ফলে যে ভয় আমাদের সারা জীবন তাড়া করে বেড়ায়, যে কষ্ট বুকের উপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে থাকে সেই না খাওয়া দরজায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমরা এই গ্রহের এমন এক অভাগা জীব যে কিছুতেই অনাহার আমাদের পিছন ছাড়ে না। এই আমাদের মতো মানুষদের জন্যই বোধহয় এমন কথার উদ্ভব–আমি যাই বঙ্গে কপাল যায় সঙ্গে। ধনধান্যে ভরা বাংলাতেই আমাদের অন্ন জোটেনি। আর এতো বস্তার। এখানকার আদিবাসী মানুষরাই ভাতের বদলে কেঁদো কুটকি মান্ডিয়া এই সব ঘাসের দানা খেয়ে বাঁচে। তরকারি বানায়। কচি বাঁশের ডগা দিয়ে। এবার খিদের জ্বালায় আমরাও ওই সব খেতে বাধ্য হলাম।
এদিকে সরকার থেকে বলা হয়েছিল, এখানে আমাদের পুনর্বাসন দেওয়া হবে জমি জায়গা দেওয়া হবে। যদি তা পাওয়া যেত একবার চেষ্টা করে দেখা যেত কিছু করা যায় কিনা। বছর ঘুরে গেল কিন্তু সে বিষয়ে সরকারের তরফে কোন উচ্চবাচ্য শোনা যাচ্ছে না। কবে যে তারা ঘুমভেঙে জেগে উঠবে তা কে জানে।
মনটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে আমার। নিজের উপর নিজের ধিক্কার আসে। বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন, আদিবাসী অধ্যুষিত এক গভীর জঙ্গলের মধ্যে এভাবে খেয়ে না খেয়ে জীবনযাপন করে কী হবে। এভাবে বেঁচে থাকাটাই তো কষ্টের। যত বেশি দিন বাঁচা হবে ততটাই বেশি কষ্ট। মনে মনে স্থির করি–পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যাব। সেখানে গিয়ে যা হয় হোক, তবু এখানে আর নয়।
আমার মেজভাই চিত্তকে বলি সে কথা–এখন একসাথে সবার পশ্চিমবঙ্গে যাওয়াটা ঠিক হবে না। গিয়ে থাকব কোথায়। কী কাজ করব। খাব কী? আগে আমি একা যাই। পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় জায়গা। শুধু তো যাদবপুর না। কোথাও একটু মাথা গোঁজার ঠাই করে তারপর সবাইকে নিয়ে যাব। ওরও এখানে মন টিকছিল না তাই মত দিল সে–যা, গিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারিস আমাদের নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর। মরণ এইখানে, মরণ সেইখানে। তয় বাংলার মানুষ বাংলায় গিয়া মরি।
আমার কাছে তখন পথখরচা বলতে আছে মাত্র পাঁচটা টাকা। এখান থেকে নিকটস্থ রেল স্টেশন রায়পুর দুশো মাইল দূরে। যার বাসভাড়া সাড়ে দশ টাকা। রেলে বিনা টিকিটে যাওয়া যায়, বাসে যায় না। খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম আর একটা রেল স্টেশন আছে দল্লী-রাজহারায়। কখন যেন সেখান থেকে এক আধটা যাত্রী ট্রেন কোথায় যেন যায়। তখন আর আমার ভাবনা চিন্তা করবার অবকাশ ছিল না। একদিন কাপসী থেকে একটাকা দশ পয়সার টিকিট কেটে চেপে বসলাম দল্লী যাবার বাসে। সকালে বাসে চেপে ছিলাম দুঘন্টা পরে বেলা এগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম দল্লী।
দল্লীকে আমি চিনি না । দল্লীও আমাকে চেনে না। কিন্তু একদিন এই দল্লী শহরকে আমি চিনবো। সেদিন এই ছোট্ট শহরটা অনেক বড়, অনেক প্রিয় হয়ে উঠবে। এই দল্লী আমাকে দেবে প্রাণের আরাম-বেঁচে থাকার অবলম্বন আর এক মহত্তম পরিচয়। তবে সে অনেক পরে ঘটবে। এখন সবে ৭২/৭৩ সাল। এখনও শংকর গুহ নিয়োগী দল্লী এসে পৌঁছাননি। উনি আসবেন ৭৭ সালে। ইতিহাস গড়বেন, তবে তো আমি সেই ইতিহাসে যুক্ত হবো।
দল্লী স্টেশনে এসে শুনি আমি এখানে আসবার দু ঘন্টা আগে–বেলা নটার ট্রেন ছেড়ে চলে গেছে। যার যাত্রা ভিলাই পর্যন্ত। সেই ট্রেন আবার রাত আটটায় ফিরে আসবে। না যাবার না আসবার আর কোন ট্রেন নেই। কী আর করি, সারাটা দিন এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দিই। বাজার দেখি, বাস দেখি, পাহাড় দেখি, খাদানে কাজ করে ফেরা মানুষ দেখি, লাল পতাকা ওড়া একটা ইউনিয়ন অফিস দেখি। আর রাত হয়ে গেলে মুড়ি ভোলা খেয়ে স্টেশনের পাশে এক মন্দিরের চাতালে শুয়ে থাকি। এখন এই মন্দিরটা খুব ছোট। কুড়ি পঁচিশ বছর পরে আবার যখন আসব বিরাট বড় হয়ে যাবে। ইউনিয়ন অফিসটা বড়, ওটা তখন আর থাকবে না। মজুররা ঝান্ডার রঙ বদলে নেবে। সি.পি.আই ছেড়ে সব ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চায় যোগ দেবে।
