ভাইকে বলি–কবে তোরা যাবি? আমি শিয়ালদায় গিয়া খাড়াইয়া থাকুম।
অবশেষে বন্ধুদের কাছে বিল্টুদায় নিয়ে পরের দিন পরিবারের সাথে গিয়ে পৌঁছালাম টাকি রেল স্টেশনে। কাকার কাছে বর্ডার পার হয়ে এপারে আসার প্রমাণপত্র ছিল। সেই কাগজ দেখিয়ে–”মোরা পূর্ববাংলার থিকা আইছি” বলে অফিসের খাতায় নাম লিখিয়ে ঢুকে পড়লাম অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরের তাবুর মধ্যে।
এবার আমাদের এখানে থাকতে হল দিন পনের। তারপর যাবার “ডাক” এল। আমরা শিয়ালদহে এসে দাঁড়িয়ে থাকা একখানা ট্রেন, যার নাম রিফিউজি স্পেশাল তাতে উঠে পড়লাম। সেই ট্রেন আউট লাইন দিয়ে ঘুরে ঘুরে যে পথ সাধারণ ট্রেন বারো ঘন্টায় পার হয়, তিনদিন সময় নিয়ে পৌঁছাল জগদ্দলপুর। জগদ্দলপুর আদিবাসী জেলা বস্তারের সবচেয়ে বড় শহর। এখান থেকে ট্রাক ভরে কিছু পরিবারকে নিয়ে যাওয়া হল উড়িষ্যার মালকানগিরি, উমরকোট আর কিছু পাঠানো হল বস্তার জেলার পারালকোটে। পারালকোটে সর্বমোট ১৩৩টা বাঙালী গ্রাম আছে। কোন নাম নেই, শুধু নাম্বার। নাম্বার দিয়ে তাদের পরিচয়। পারালকোট ভিলেজ সংক্ষেপে পি.ভি.। আমাদের রাখা হল পি.ভি. ৯৮তে। যেখান থেকে নিকটস্থবাজার, পঁচিশ মাইল দূরে। বাসস্ট্যান্ডও সেখানেই। যেখান থেকে রেল স্টেশনের দূরত্ব দুশো মাইল। চারদিকে ঘন গভীর জঙ্গল। কোথাও কোন জন মানবের চিহ্ন নেই। সেই জঙ্গলের খানিকটা সাফ করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এই গ্রামটা, এ এমন এক গ্রাম যদি বিশ্বযুদ্ধও হয়ে যায় এখানকার মানুষ টের পাবে না। যদি এই গ্রামটা কোন কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, বিশ্ববাসী জানতে পারবে না।
আমরা এখানে আসবার আগে পঁচিশটি পরিবার ছিল, এবার আমাদের পঁয়ত্রিশ পরিবার মিলে মোট ষাট হয়ে গেল। কয়েকদিন পরে অবশ্য দশ পরিবার এখান থেকে সরিয়ে পিভি ৫৬তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই দশ পরিবারের চার পরিবার আমরা এবং আমার কাকা জ্যেঠা।
সরকারি কর্তা ব্যক্তিদের ইচ্ছা ছিল প্রতি ভিলেজে ১০০ পরিবার এনে রেখে দেবার। কিন্তু সেই ৫৮ সাল থেকে ৬৪ সাল পর্যন্ত বহু চেষ্টার পরেও টার্গেট পুরো করা যায়নি। কোন ভিলেজে পঞ্চাশ কোনটায় তারও কম। আর ৬৪ সালের পর থেকে তো পলায়ন পর্ব চলছে। মোড়ে মোড়ে পাহারা “নাকা” বসিয়েও যে পলায়ন ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ফলে বহু ভিলেজে বহু ঘর খালি পড়ে আছে। কোন ভিলেজে কতঘর ফাঁকা সেই হিসাবে এখন লোক এনে ভরাট করা হচ্ছে।
চারদিকে মোটা মাটির দেওয়াল। উপরে টিনের ছাউনি। লম্বায় আঠেরো হাত, চওড়ায় বারো হাত। এমন ঘর পূর্ববঙ্গের শতকড়া আটানব্বই জন নমঃ পোদ জেলে কামার কুমোর ঘরামির কাছে অকল্পনীয় ব্যাপার। সেই ঘর ফেলে মানুষ কেন যে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে রেল লাইন, খালধার, ফুটপাতে থাকে সেটা তখন আমার কাছেও এক অবোধ্য ব্যাপার ছিল। যা পরে আর অবোধ্য থাকেনি।
এখানে আসবার পর আমাদের সরকারি অফিস থেকে কিছু জামাকাপড় কিছু হাড়িকুড়ি আর শাবল কোদাল, গাইতি কুড়ুল এসব দেওয়া হল। দেওয়া হল কিছু চাল ডাল নগদ টাকা। চাল ডালের পরিমাণটা কত ছিল মনে নেই। তবে টাকা মনে হয় মাসে পঁচাত্তর দিত। সেই চাল টাকা যাকে শিরোমণিপুরে বলা হোত ডোল এখন বলা হয় সাবসিডি, তা দিয়ে আমাদের পাঁচজন প্রাপ্ত বয়স্ক দুজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক সর্বমোট সাতজনের পরিবার, অনেক মেপে, অংক কষে, হিসেব করে, আধপেট খেয়ে দিন পনেরোর বেশি চলত না।
চলবে না সে ওরা-ও জানে। এটা ওদের তো অংক কষে হিসেব করে বার করা। সেই বাকি পনের দিন খাবার জন্য মজুর খাটতে যেতে হবে। আর নাম মাত্র মজুরি দিয়ে আমাদের খাঁটিয়ে নেওয়া যাবে। রিফিউজিদের এখানে আনাইতো হয়েছে সেই জন্যে। এবং একদিন নিয়ে যাওয়া হল এক ঠিকাদারের অধীনে এক জঙ্গলে, জঙ্গল সাফ করাবার জন্য। জঙ্গল তো এখানে সর্বত্র। কোথাও ঘন কোথাও পাতলা। সেই জঙ্গল একটু একটু সাফ করে বসানো হয়েছে ভিলেজ, বের করা হয়েছে চাষের জন্য জমি, এখন আমাদের সেখানে আনা হয়েছে এই জঙ্গল সাফ করে যে জমি বের হবে তা আমাদের পরে কৃষিকার্যের জন্য দেওয়া হবে। এই জঙ্গলের পরিচয় এখন আর জঙ্গল নয় ল্যানডম্যাপে কৃষিকর্মের উপযোগী ভূমি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
আমরা সেখানে গিয়ে দেখি জমি জুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অগনন বৃক্ষ। ঠিকাদার ফিতে মেপে গাছের গায়ে দাগ মেরে দিয়ে বললেন–এই হচ্ছে এক একর। প্রথমে গাছগুলো কাটতে হবে। তারপর গোড়া খুঁড়ে শেকড় সহ তুলে ফেলতে হবে। এর জন্য মজুরি মিলবে দেড়শো টাকা। সেই এক একর জমি” সাফ করতে আমি, আমার ভাই চিত্ত এবং বাবা তিনজনের বাইশ দিন সময় লেগে গেল। তিন একর জমি সাফ করতে গাইতি কোদাল সব ক্ষয়ে গিয়েছিল। এখানকার মাটি তো মাটি নয়, পাথর। গাইতি দিয়ে মাটিতে কোপ মারলে ঠন করে শব্দ হয়, আগুন ঠিকরে ওঠে।
গাছ কাটার পর বাঁশ কাটা, মাটি কাটা, পাথর ভাঙা, বিড়ির পাতা তোলা এক ঠিকাদার থেকে আর এক ঠিকেদারের অধীনে এভাবেই কাজ চলতে রইল। এবং যে কাজই হোক যত পরিশ্রমই করি মজুরি তার দিনে দুই আড়াই টাকার চেয়ে বেশি পড়ে না। একদিন আমি আর আমার বাবা আর ভাই গেছি খ্যারকাটা নামের এক জায়গায় মাটি কাটার কাজে। আমাদের নিয়ে গেছে এক ঠিকাদার তার ট্রাকে করে। খ্যারকাটায় বিশ্বব্যাঙ্কের আর্থিক সহায়তায় বিশাল একটা বাঁধের নির্মাণকার্য চলছে। যা শুরু হয়েছিল সেই ১৯৫৮ সালে। যথেষ্ট মজুর না পাওয়ায় যা আজও সম্পূর্ণ করা যায়নি। এবার প্রচুর শরণার্থী আসায় পূর্ণউদ্যমে শুরু করা হচ্ছে বাঁধ নির্মাণের কাজ। বাঁধের কাজ সম্পূর্ণ হলে রিফিউজিরা জমিতে চাষের জন্য কতটা জল পাবে, পারাল কোটের কতটা উন্নয়ন হবে তা এখনও বোঝা যাচ্ছেনা। তবে কন্ট্রাকটার, মজুর যোগানদার, কিছু মন্ত্রী নেতা যে কোটিপতি হয়ে যাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
