সেই ১৯৫৮ সালের ভারত সরকারের দণ্ডকারণ্য প্রকল্প তখনও বন্ধ হয়নি।এতগুলো দাঙ্গার পরেও–সব রকম সরকারি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ওই অঞ্চলে আশানুরূপ জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা যায়নি। কিছু কিছু রিফিউজিদের নানান ক্যাম্প থেকে নানান কায়দায় ওখানে পাঠানো হয়েছিল বটে কিন্তু তার বড় অংশটাই সেখানে থাকতে পারেনি। পালিয়ে এসে মিশে গেছে পশ্চিমবঙ্গের জন সমুদ্রের মধ্যে। যার ফলে দণ্ডকারণ্যের বিশাল বনাঞ্চলে মজুরের অভাবে কোটি কোটি টাকার বন সম্পদ বনে পড়ে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংগ্রহ সম্ভব হয়ে উঠছে না।
এবার চালাক সরকার আর আগের ভুলের ফাঁদে পা দিলেন না। কোন ক্যাম্পে না রেখে শরণার্থীদের টাকি থেকে সোজা–সরাসরি পাঠিয়ে দিতে লাগলেন মধ্য প্রদেশের মানা ক্যাম্পসহ দণ্ডকারণ্যের নানা অঞ্চলে। অংক একেবারে সরল, যতদিন এরা এখানে থাকতে চায়, থাকুক। যুদ্ধ শেষ হলে যদি সে দেশে ফিরে যেতে চায় তাতেও কোন আপত্তি নেই। যদি না যায় পুরাতন রিফিউজি পরিবারের স্থলে এদেরই সেই ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি জমির মালিকানা দিয়ে দেওয়ায় কোন অসুবিধা নেই।
আমার বাবারা আট ভাই। তিন ভাই মারা গেছে। একভাই সন্ন্যাসী হয়ে গেছে। এক ভাই পূর্ববঙ্গে থেকে গিয়েছিল। এবার সেই ভাই বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে চলে এসেছেন এপার বাংলায়। পরিবারের সবাইকে টাকির অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে রেখে তিনি দেখা করতে এলেন বহু বছরের বিচ্ছিন্ন নিজের ভাইদের সাথে। প্রথমে গিয়েছিলেন ঘোলা-দোলতলার ক্যাম্পে। সেখান থেকে সংবাদ জেনে যাদবপুরে এলেন আমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে। আমরা তখন শ্যামা কলোনির যে ঘরে আগে ছিলাম আমি গরফায় চলে যাবার পর এবং সে কথা গোপন না থাকায় কিছু লোক বাবাকে আর সেখানে থাকতে দেয়নি। তারা তখন রেল কলোনির এক ঝুপড়িতে থাকছিল। আমার এক জ্যেঠামশায় ও সেই কাকা দুজনে বাবাকে খুঁজে পেয়ে দেশের সমাচার পরিবার পরিজনের কুশল বিনিময়ের পর জানতে চান, রঞ্জনকে দেহি না ক্যান। হে কই? আবার পলাইছে নাকি বিদ্যাশে? তখন বাবা আমার বিষয়ে আদ্যপান্ত সব খুলে বলেন ভাইদের কাছে। “হেয়ারে মোনে কয় আর বাঁচাইতে পারমুনা। এইখানে রোজ মানুষ খুন হয়। কবে শুনমু ও মইরা পইড়া আছে।”
তখন কাকা আর জ্যেঠা দুজনে বুদ্ধি বিবেচনা করে বাবাকে পরামর্শ দেন আমরা সব যাইতে আছি দণ্ডকারণ্যে। এত বছর এইখানে রইলাম, ভালো কিছু তো হইল না। কই কী, তুমিও আমাগো লগে চইল্যা চলল। হেইখানে গেলে আর কিছু না হউক পোলার পরান তো বাঁচবে।
যে বিপিন ব্যাপারী একদিন দণ্ডকারণ্যের নামে কেঁপে উঠতেন এখন পুত্রের প্রাণ রক্ষার্থে সেই গভীর বনে যেতে রাজি হয়ে গেলেন। এই হয়। যদি কারও পিছনে বাঘ তাড়া করে, লোকটার সামনে যদি নদী থাকে, সাঁতার না জানলেও সে নদীতেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমার জীবন রক্ষার্থে এক বিপন্ন বাপ শেষকালে অরণ্যকেই পরিত্রাতা হিসাবে গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হলেন। সে যে কী অরণ্য তা বুঝতে পেরেছিলেন সেখানে যাবার পর। সেখানকার বনের বাঘ মানুষ খায় না। মানুষই মানুষকে খেয়ে নেয়।
আমার মেজভাই চিত্ত সেই ভয়াবহ দিনে চারদিকে চলা গুলি-বোমার মধ্যে গরফায় গিয়ে আমাকে খুঁজে বের করে সব কথা বিস্তারিত জানাল। কিন্তু আমি এখন কি করি? যাদের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসি, যারা নিজের প্রাণ বিপন্ন করে দু তিনবার আমাকে নিশ্চিন্ত মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে এনেছে, তাদের ফেলে নিজের প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাব?
ওদিকে, মা বাবার প্রতি সন্তানের যে কর্তব্য, জীবনে আমি তার কিছু মাত্র পালন করতে পারিনি। বাবার শরীরের যে অবস্থা কদিন আর বাঁচবেন বলা মুশকিল। সে মৃত্যুও আসবে তার বড় বেদনার সঙ্গে। আমার চিন্তায় তখন প্রাণটা ছটফট করবে। বারবার দরজার দিকে তাকাবেন। এই বোধহয় মুখে জল দেবে বলে বড় ছেলে এল। কারও পায়ের শব্দে চমকে উঠে মাকে জিজ্ঞাসা করবেন–অ খোকার মা, বড়খোকায় কি ঘরে আইলো? অবশেষে এক ব্যর্থ আশা বুকে নিয়ে চির ঘুমে ঘুমিয়ে পড়বেন তিনি। ধর্মবিশ্বাসী সব বাবার যা কামনা মৃত্যুর পরে মুখে আগুন, আমার হাতে তাও তিনি পাবেন না।
এর চেয়েও বড় কথা তারপরও যারা বেঁচে থাকবে, আমাদের সেই পরিবার যাদের সরকারি কোন কাগজে নাম নেই, এদেশের এক অবাঞ্ছিত উদ্বৃত্ত মানুষ ভোটার লিস্টে নাম ওঠেনি রেশ্বন কার্ড পাওয়া যায়নি, কোন নাগরিক অধিকার নেই। এদের কী হবে? যারা অকারণে আমার জন্য বিপদে পড়তে পারে।
আমার সবচেয়ে ভয় ভাই চিত্তকে নিয়ে।বিজয়গড়ের এক কংগ্রেস নেতার নাম ভজন নাগ। তাকে নাগালে না পেয়ে তার শত্রুপক্ষ তার এক ভাই পূজন নাগ, যে তিনফুট উচ্চতার এক বামন–তাকে গলা কেটে মেরে দিয়েছে। আমি এখন এক নিরাপত্তার বলয়ের মধ্যে আছি। আমার নাগাল না পেয়ে আমার শত্রুরা যদি চিত্তকে মেরে দেয়। অনেক ভেবে চিন্তে শেষে সিদ্ধান্ত নিই, যে যা বলে বলুক যে যা ভাবে ভাবুক, আমার এখন প্রধান কাজ পরিবারের সবাইকে যদি একটা আতঙ্ক মুক্ত পরিবেশে কিছুটা নিঃশ্বাস ফেলবার সুযোগ করে দিতে পারি সেই চেষ্টা করা। এটা ঠিক যে তারা যদি আমাকে রেখে একলাই সেখানে চলে যান নির্ভয়ে বাঁচতে পারবেন। কিন্তু এই ভয়ংকর যুদ্ধের পরে–যদি তখনও আমি বেঁচে থাকি, সেই অরণ্য থেকে খুঁজে বের করব কী করে তাদের।
