আমি গরফায় যেদিন আসি তার ঘন্টা দুয়েক পরে এখানে পুলিশ এসেছিল। এটা তাদের রুটিন কাজ। কখনও পুলিশ কখনও সিপিএম মাঝে মাঝে নকশালদের এই ঘাটিটার ওপরে হামলা চালাত। ওদের সম্মিলিত প্রয়াস ছিল যেভাবেই পারে এই ঘাটিটাকে চূর্ণ করে দেবে। এই দুপক্ষের স্বার্থের সামনে হিমালয় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এই ঘাটির কিছু অকুতোভয় যুবা। তাই এই আক্রমণ। তো সেদিন আমি আমার অক্ষম অচল শরীর নিয়ে ঘটনাক্রমে সেই অসমযুদ্ধের শরিক হয়ে গিয়েছিলাম। একদিকে মারাত্মক মারণাস্ত্র সজ্জিত একদল হায়নাতুল্য হিংস্র পুলিশ আর একদিকে আদর্শের বলে বলীয়ান একদল আগুনখোর যুবক। যাদের কাছে গোটা কয়েক হাত বোমা আর রেল লাইনের খোয়া ছাড়া অন্যকোন অস্ত্র ছিল না। তবু সেই দৃঢ় প্রতিরোধের সামনে থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী ভয়, সেদিন নিজেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এটা যখন একটা যুদ্ধ, ক্ষয়ক্ষতি যে দুপক্ষেরই হবে সেটা তো স্বাভাবিক। ওপক্ষের কতটা কী হয়েছিল তা আমি জানি না। তবে এ পক্ষের কাতু নামের মধ্যবিত্ত ঘরের একটা ছেলের হাত উড়ে গিয়েছিল। পাল বাজারের পিছনে যে কাঠগোলা, হাওয়াই চটি পায়ে, হাতে বোমা নিয়ে পেছল কাঠের উপর দিয়ে দৌড়াতে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ে যায় সে। তখন হাতের বোমা হাতেই ফেটে যায়।
আর সেদিন, চিরদিনের নিপীড়িত নির্যাতিত দরিদ্র দুর্বল এক মানুষ আমি, বিপ্লব স্পন্দিত বুকে সেদিন আমার মনে হয়েছিল আমি লেলিন আমি মাওসেতুং, আমিই সেই মহান বিপ্লবী চেগুয়েভারা।
আমি লেখা পড়া জানি না বটে তবে এদের নাম জানি। এদের ইতিহাসও জানি। সে সব আমাকে বলেছিলেন রামকৃষ্ণ উপনিবেশের আর.এস.পি নেতা “ছেলেধরা” প্রণব চক্রবর্তী। কে জানে যদি আমাকে সি.পি.এমরা না মারত, যদি আমার বাবাকে মারা অনিল, তার দলের সাথে যুক্ত না থাকত, আমি প্রণবদার সাথেই থাকতাম কী থাকতাম না। আর এখন সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম লালগড় এবং বাসন্তীর ঘটনার পরেও আর.এস.পির লালবাড়ির নেশায় পড়া নেতা মন্ত্রিদের নির্লজ্জ লেজুড়বৃত্তি দেখে দল ছেড়ে বসে গিয়ে প্রণবদার মত নষ্ট করা চল্লিশ বছরের জন্য মাথার চুল ছিড়তাম কী না!
গরফায় আমার থাকা ও কাজের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল সেলিমপুর রেল কলোনি। নকুল গোষ্ঠ মন্টু হারু মাধাই রতন নিতাই এবং রাজাপুরের ননীদা যে আমারই মতো নিজের পাড়া ছেড়ে এখানে এসে থাকে, এরাই সব সাথী হল আমার। একমাত্র ননীদা মধ্যবিত্ত বাড়ির সন্তান। এছাড়া আর যারা, সবাই গরিব। এদের কেউ আগে রিকশা চালাত, কেউ স্টেশনে মোট বইত, কেউ বেঁচত উনুন ধরাবার কুঁচো কাঠ, কেউ ছিল টিউবওয়েল মিস্ত্রি। এদের মধ্যে মন্টু রতন হারু অন্য পাড়া থেকে এসেছে নকুল গোষ্ট মাধাই নিতাই এই রেল কলোনিতে থাকে। বিপ্লবী সাজা এদের কাছে বাবুঘরের বিপ্লব বিলাসিতা নয়। ভীষণ জরুরি সুস্থ সুন্দর স্বপ্ন, প্রাণধারণের পক্ষে এক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। যা প্রাপ্ত করার জন্য শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়াই আবশ্যক।
কিছু মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত ছেলে পড়াশোনা চাকরি বাকরি ভবিষ্যত সুখ সব জলাঞ্জলি দিয়ে এই লড়াইয়ে সামিল হয়েছে। তবে তাদের চাইতে আমার এই বস্তির ছেলেদের সাথে স্বাচ্ছন্দ হতো বেশি। শিক্ষিত ছেলেদের বইয়ের ভাষার চাইতে আমি এদের ভাষা সহজে বুঝতে পারতাম। এরা বলত গ্রামদেশের অত্যাচারী জোতদার মহাজন মাতব্বরদের কথা। কী ভাবে এদের সর্বসান্ত করে দিয়েছে সেইসব কথা।
এদের সাথে আমার দিনরাত কাটে। রাত এবং দিনের প্রতিটা মুহূর্তই শঙ্কা সংকট দিয়ে ঘেরা। সশব্দ ও রক্তাক্ত। আক্রমণ প্রতি আক্রমণে রক্ত দু পক্ষেরই ঝরছে। যাদবপুর স্টেশনের পূর্বদিকে কামার পাড়া। ওটা সি.পি.এম পার্টির একটা বড় ঘাঁটি। পশ্চিম দিকে পালবাজার, গরফা এটা নকশালদের শক্ত ঘাঁটি। স্টেশনকে মাঝখানে রেখে দু দলের যোদ্ধারা দাঁড়িয়ে যায় দু পাশে। গুলি চলে বোমা চলে রক্ত ঝরে। বেশ কিছুদিন এই লড়াই চালাবার পর আমি ক্লান্তিবোধ করি। মনে প্রশ্নও জাগে। ওদিক থেকে-যারা লড়ছে তারাও তো আমাদের মতোই গরিব। আমরা এক গরিব আর এক গরিবকে মারছি, পুলিশ আমাদের দুদলকে মারছে, ধরে নিয়ে জেলে ভরে দিচ্ছে, বড়লোকের তো কারও কিছু হচ্ছে না। তবে এত রক্তপাতের সার্থকতা কোথায়!
গরফায় ঢোকবার যে কয়টা রাস্তা সেগুলো দিয়ে পুলিশ যাতে ঢুকতে না পারে আমরা দিনরাত পাহারা দিতাম। এক রাতে রেল লাইনের দিকটা পাহারা দিচ্ছিলাম আমি আর নিতাই। পাহারা দিতে দিতে কখন যে আমাদের ঘুম এসে গেছে আর আমরা রেল লাইনের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছি তা জানি না। ওদিকে ভোর চারটের ডাইমন্ড হারবার ট্রেন যাদবপুর স্টেশন থেকে ভো বাজিয়ে রওনা দিয়েছে ঢাকুরিয়া স্টেশনের দিকে। ঠিক সেই সময় রেল কলোনির একজন লোক প্রস্রাব করতে বেরিয়ে আমাদের দেখে ডেকে শোয়া থেকে তুলে দেয়। সে যাত্রা বেঁচে যাই আমরা দুজন। আর তার দিন দশেক পরে একই ভুল করে ঘুমন্ত মাধাই রেলে কেটে মারা যায়। ওকে কেউ ঘুম থেকে ডেকে দেয়নি।
এভাবেই এসে গেল ১৯৭১ সাল। এই সময় শুরু হয়ে গেল পূর্বপাকিস্থানের তথাকথিত মুক্তি যুদ্ধ। একদিকে আওয়ামী লিগ আর অপরদিকে খানসেনা-রাজাকার। লেগে গেল দুপক্ষের ঘোরতর লড়াই। আওয়ামী লিগের পিছনে যাবতীয় যুদ্ধ সম্ভার নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ইন্দিরাগান্ধীর সরকার। ভারতবর্ষ দেশটা পাকিস্তানের শাসকদের কাছে চিরদিনই এক শত্রু রাষ্ট্র। যা বিধর্মী কাফেরদের আবাস। যেহেতু ভারতমুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, সেই রাগে খানসেনারা আর তাদের সহযোগী রাজকার বাহিনী আওয়ামী লিগের সাথে ওদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর শুরু করে দিল ব্যাপক খুন জখম বলাকার লুটপাট। ফলে তখন পর্যন্ত যে সব হিন্দু পরিবার ওপার বাংলার রয়ে গিয়েছিল এবার তারা প্রাণ ভয়ে পলায়ন শুরু করে দিল। আবার একবার বাংলার সীমান্তে ভিড় জমল বাস্তুহারা মানুষের। এখন আর এদের নাম রিফিউজি নয়–শরণার্থী।
