আমাকে নিয়ে গিয়ে উপনিবেশের সি ব্লকের পার্টি অফিসের সামনের লাইট পোস্টে বাঁধা হল। লড়াই লড়াই লড়াই চাই, শ্লোগানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ গরান কাঠের যে ঝান্ডাবাঁধা ডাণ্ডা তা দিয়ে খুব মেপে আমার হাটুতে হিট করলেন সেনবাবু–বল তোদের বোমা পাইপগান কোথায় আছে? কতজনকে খুন করেছিস? তোদের দলে আর কে আছে? কতদিন ধরে নকশাল করিস? একটা করে প্রশ্ন একবার করে হিট। ওরা জানে আমার কাছে এসব প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। আমিও জানি উত্তর নেই, তাই শুধু বাবাগো মাগো করি। জবাব দেবার মত প্রশ্ন আসে একটা, বল দেওয়ালে কেন লিখেছিস? বলি, মুই লেহি নাই। মুই তো ল্যাখতে জানি না। সে কথা কোন ঘাস জল খায় না। মার চলতে থাকে।
ঘন্টা দুয়েক ধরে আমাকে দুরমুশ, থেঁতো, গুড়ো করার পর শেষে একটা রিকশা ডেকে তুলে দেওয়া হল তার পাদানিতে। যা এটাকে শ্যামাকলোনির মোড়ে ফেলে রেখে আয়।
সেদিন সারারাত গাঠের যন্ত্রণায় কাতরেছিলাম আমি। জ্বর এসে গিয়েছিল। তখন ভীষণ ভয়ও করছিল আমার, আর বোধহয় কোনদিন পায়ের উপর উঠে দাঁড়াতে পারব না। পঙ্গু হয়ে যাব। এখন আমার দরকার চিকিৎসার। চিকিৎসা করাতে যে টাকা লাগে, সে আমরা কোথায় পাব! তাইবিনা চিকিৎসায় পড়েছিলাম আট-দশদিন।কাজল পনু যাদের উপর আমার ভরসা ছিল তারাও এ সময়ে কেউ আমার কোন খোঁজ নিল না। ওরা টের পেয়ে গেছে, সময় বদলে যাচ্ছে। এখন মস্তানি গুন্ডামি চালিয়ে যেতে হলে পার্টির ছত্রছায়া ছাড়া গতি নেই। ওরা শক্তিমান, আমাকে দেখতে এসে তাদের বিষ নজরে পড়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। খবর পেলাম “আলু স্বপন” তার বাবাকে সাথে নিয়ে সেনবাবুর কাছে সারেন্ডার করে এসেছে, যা করেছি ভুল করেছি। এখন থেকে আপনি যা বলবেন তাই করব।
সেনবাবু আমাকে মেরে অবশ্যই কিছু লাভবান হয়েছিলেন। তবে সব ক্রিয়ার একটা সমানুপাতিক প্রতিক্রিয়া থাকে, নিউটনের সেই সূত্র অনুসারে আমারও কিছু লাভ হয়েছিল। চারিদিকে আমার খ্যাতি ছড়িয়ে গিয়েছিল।
একদিন সকালে যখন আমি কিছুটা সুস্থ সচল হয়েছি, আমাদের ঘরের সামনে মেজদার চা দোকানে গিয়ে একটু বসেছি। তখন সেখানে চা খেতে এল সেলিমপুর রেল কলোনির টিউবওয়েল মিস্ত্রি নকুল আর গোষ্ট। চা দোকানদার মেজদাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল ওদের সাথে। আর তখন মুখ নিচু করে চাপা গলায় বলে গোষ্ট, আমরা তোর খোঁজে এসেছি। আশুদা তোকে দেখা করতে বলেছে।
আশুদা মানে নকশাল নেতা আশু মজুমদার। তখনকার যাদবপুরে এক মহা সংগ্রামের মহানায়ক হিসাবে এই মানুষটি প্রতিষ্ঠিত। তিনি আমাকে দেখা করতে বলেছেন। নিজের অবস্থানে আমার পক্ষে অটল থাকা আর সম্ভব হল না। ওদের পিছু পিছু হাঁটা দিলাম আমি। যেন আমাকে আমার অদেখা ভবিতব্য হটিয়ে নিয়ে গেল গরফায়।
সারা শহর–শুধু শহর কেন পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম নগর সব, কেউ কেউ তো এমনও বলে যে সমস্ত ভারতবর্ষ এখন স্পষ্ট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এক ভাগে আছে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বৃহৎ পুঁজিপতিশ্রেণি ও তাদের দালালরা। যাদের পিছনে রয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা সি.আই.এ. এই ভাগে রয়েছে ভারতবর্ষের শাসকশ্রেণি এবং রাষ্ট্রের আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত বিশাল পুলিশ ও মিলিটারি বাহিনী। আছে মুখে দরিদ্র জনগণের কথা বলা রঙবেরঙের পতাকাধারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। যাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধনিক শ্রেণি।
অপরদিকে রয়েছে আদর্শের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ছাত্র যুব শ্রমিক কৃষক। এক কথায় বিপ্লবী জনগণ। এই কঠিন সময়ে কেউ নিরপেক্ষ নয়। যে নিরপেক্ষ সে আসলে শোষক শ্রেণির শোষণ দমন পীড়নেরই মৌন সমর্থক হয়ে রয়েছে অজ্ঞাতসারে। এই সময় আমাকে ডাক দিয়েছে আমার মানবিক, সামাজিক দায়িত্ব পালন করবার জন্য। আশু মজুমদার কোন এক ব্যক্তি নয়, এই সময়ের মুখপাত্র। সময়ের দাবি মেনে নিয়ে অবশ্যই আমাকে গিয়ে দাঁড়াতে হবে কোন এক পক্ষে। কোন পক্ষে যাব আমি?
যদি যেতে হয় আমাকে সেই পক্ষে যেতে হবে যেখানে আমার মত সর্বহারা মানুষরা রয়েছে। যেখানে আশু মজুমদার রয়েছে। আশু মজুমদারের মতো নিঃস্বার্থতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আর কে বা আছে? ভোট চায়না গদি চায়না সুখভোগ বিলাসব্যাসন কিছুই চায়না তারা। চায় একটা শোষণমুক্ত শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণ করতে। যে সমাজে সব মানুষ সমান সব মানুষ সমান সম্মানীয়। সবার জন্য থাকবে খাদ্যবস্ত্র শিক্ষা বাসস্থান চিকিৎসা।
এই অবস্থা এমনি এমনি আসবে না। একে স্থাপন করতে হলে হাজার বছরের পচা পুরাতন জীর্ণ এই সমাজ কাঠামো, রাষ্ট্র ব্যবস্থাটা ভেঙে চুরে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। এই ধ্বংসের পরে যে নব নির্মাণ তারই নাম বিপ্লব। বিপ্লব এক উগ্র বলপ্রয়োগ দ্বারাই সফল হয়। কারণ কোথাও কোন শাসক স্বেচ্ছায় ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে সরে দাঁড়ায় না। উগ্র বলপ্রয়োগ দ্বারা তাকে উৎপাটন করতে হয়। এর জন্য প্রচুর প্রাণহানি প্রাণ বলিদান আত্মত্যাগ করতে হয়। আশু মজুমদারের দল সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।বিপ্লবী যুবারা বুকের গরম তাজা রক্ত ঢালছে। নির্ভয়ে বুক পেতে বুলেট নিয়ে আত্মত্যাগের এক সুমহান ইতিহাস রচনা করছে। যে জল বিন্দু একা থাকে রোদ তাকে শুকিয়ে দেয়, মাটি তাকে শুষে নেয়। সে যদি কোনভাবে সাগরে গিয়ে পৌঁছাতে পারে সাগর হয়ে যায়। আমি সাগরে পৌঁছে গেছি। আমি ইতিহাসের পাতার উপর পা রেখে দাঁড়িয়ে পড়েছি। সেই স্পার্টাকাস থেকে শুরু করে সিধু কানু বীরসা বীর নারায়ণ তিলকা মাঝি আর এই নকশাল আন্দোলনের বীর শহীদ বাবুলাল বিশ্বকর্মা এদের বুক থেকে ঝরে পরা রক্তের মহাসাগর, আমি সেইরক্ত স্রোতের উত্তরসুরি। আমি এইমাত্র আমাকে চিনেছি। তাই আর ফিরে যাওয়া হল না।
