এর কিছুক্ষণ পরে পাড়ার মাতব্বর গোছের মানুষরা বের হয়ে এসেছিলেন। তাদেরই একজন আমার হাত থেকে কুড়ুল ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন। পথে যেতে যেতে যে পুলিশ ভ্যানখানা দাঁড়িয়ে পড়েছিল গণ্ডগোল দেখে, তুলে দিয়েছিলেন সেই ভ্যানে। তবে কেন কে জানে তারা আমাকে থানায় নিয়ে কোন কেস না দিয়ে একদিন এক রাত আটকে রেখে দু চার ঘা মেরেই ছেড়ে দিয়েছিল।
আমি শয়তানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। বিনিময়ে শয়তান কী আমাকে রাজকন্যা আর অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে দিল? না তা দিল না। দিল এক অদ্ভুত মানসিক আরাম দিল সেই সুমহান আত্মশক্তি, যা প্রবল ঝড় ঝঞ্জার মধ্যে এক শিশুবৃক্ষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে শেখায়।
আমরা যেখানে থাকি তার পাশের কলোনি আনন্দপল্লীর দুই উঠতি মাস্তান কাজল আর পনু, এরাই আমার কাছেশয়তানের অবতার। আমার কথা তাদের কানে পৌঁছেগিয়েছিল। বুঝে ফেলেছিল তারা, আমার মধ্যে উপাদান আছে। কাঠে আগুন আছে পাথরে আগুন আছে। সে আগুন বের হয় তখন, যখন দুটো কাঠকে ঘর্ষণ করা হয়, দুটো পাথরকে ঠোকা হয়। আমাকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে ঠেলে দিলে আমিও আগুন হয়ে উঠব। ওরা আমাকে তাদের সঙ্গী করে নিল। আগে আমি ছিলাম এক আমার পিছনে দুই আসায় বারো হয়ে গেলাম। ওরা আমাকে শিখিয়ে দিল কেমন করে বোমা বানাতে হয়, কেমন করে তা ছুঁড়তে হয়। এবার আবার আমি পুলিশের দৃষ্টিপথে এসে গেলাম। এখন আর আমাকে ধরলে কেস না দিয়ে ছেড়ে দেবে না। আচ্ছামত “বায়নট” করে চালান দেবে।
রামকৃষ্ণ উপনিবেশের মাঝখানে একটা ছোট্ট একতলা বাড়ি। বাড়ির চার দিকে উঁচু দেওয়াল। এই বাড়ির মালিকদের লাইসেন্স বন্দুক এবং দেশে প্রচুর জমি জায়গা। এরা কি করে এক জবরদখল কলোনির প্লট পায় সে এক রহস্য। এরা তো পূর্ববঙ্গের লোকই নয়। সব সেই প্লট কেনাবেচার রহস্যময় মোড়কে লুকানো।
স্বনামধন্য সাহিত্যিক “যাযাবর” লিখেছেন তার “দৃষ্টিপাত” উপন্যাসে–বাঙালী যেখানে যায় সবার আগে গড়ে একটা কালীমন্দির। সেই নিয়মে ভাদুড়ি বাড়ির ডানপাশে–টিবি হাসপাতালের পচাখাল ঘেসে এ কলোনির লোক একটা কালীমন্দির বানিয়েছে। সেখানকার ভগ্নমন্দিরে এক গরিব কালীর পূজা হয়। একদিন সেই কালীমন্দিরের পিছনে বসে রামকৃষ্ণ উপনিবেশের “আলু স্বপনের” সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন সারা দেশে নকশাল বাড়ির লাল আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। সে আগুন থেকে যাদবপুরও রক্ষা পায়নি। ফলে আমাদের কথপোকথনে বারবার উঠে আসছিল ওই নাম। আমি শিলিগুড়ি গিয়েছিলাম, তাই নকশাল, কানু সান্যাল জঙ্গল সাওতাল তাদের বিষয়ে বক্তা ছিলাম আমি, স্বপন শ্রোতা।
এক সময়ে আমাদের আড্ডা শেষ হল। আমি যখন ঘরের পথে পা দিয়েছি স্বপন হঠাৎ কি মনে করে কে জানে কালীমন্দিরের সামনে পড়ে থাকা হোমের একখানা পোড়াকয়লার টুকরো তুলে এগিয়ে গেল ভাদুড়িদের দেওয়ালের সামনে। চুনকাম করা সাদা দেওয়াল, যার এককোণে লেখা ইংরাজি বর্ণমালার তিনটি অক্ষর–সি.পি.এম। স্বপন তার পাশে অহেতুক একটা ‘এল’ অক্ষর বসিয়ে দিল। এই দেওয়াল দখল ছিল সি.পি.এম দলের। দখলচ্যুত হয়ে তা সি.পি.এম.এল–অর্থাৎ নকশালদের হয়ে গেল। তখন সেই পথে হেঁটে যাচ্ছিল সুলেখা কারখানার কর্মী সিটু ইউনিয়নের নেতা দেবদাস। সে এইশিল্পকর্ম এবং শিল্পীদের প্রত্যক্ষ করে গেল। তারপর দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর যা কাজ–সে খবরটা লোকাল পার্টি অফিসে পৌঁছে দিল।
সেদিন সি.পি.এম. পার্টির যুব সংগঠন ডি.ওয়াই.এফয়ের একটা মিছিল ছিল। সে মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জঙ্গি নেতা পিন্টু সেন। নানা পথ ঘুরে লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই শ্লোগান দিয়ে সে মিছিল এসে শেষ হয় “মেজদার” চা দোকানের সামনে। যেখানে আমি বসেছিলাম। ওরা ধরে নিয়ে গেল আমাকে।
সুন্দরবন নয় এটা, তবু এমন একটা অঞ্চল যেখানে বাঘেরা বাস করে। যে বাঘের নাম সি.পি.এম. এখানকার আশেপাশের কোন কলোনিতে অন্যকোন পার্টির নামগন্ধ নেই। সব বাঘেরা খেয়ে নিয়েছে। সেই বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! সি.পি.এম পার্টির বড় শত্রু নকশাল অনুপ্রবেশ! এর এখনই একটা প্রতিষেধক ব্যবস্থা না নিলেই নয়।
পিন্টু সেনবাবু একজন বিচক্ষণ নেতা। তিনি মন দিয়ে “কি করিতে হইবে” সেই বইখানা পড়েছিলেন। “আলু” স্বপন এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। সে ভালো ফুটবল খেলে, যে কারণে যুবজনের প্রিয়। এ ছাড়া তারা চার পাঁচ ভাই। বাপের পাইকারি আলুর কারবার। জাতিতে কায়স্থ। ওকে কিছু করলে এলাকায় তার একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ওর সাথে থাকা অন্য যে ছেলেটা কি যেন নাম, ওর বাপ মজুর ঘাটে মা করে ঝিগিরি। ওরা এই অঞ্চলের কেউ নয়। জাতিতেও নিচু। এছাড়া তার নামের পিছনে কিছুটা বদনামও আছে, ওকে ধরে মারায় কোন ঝামেলাই নেই।
সর্বহারা পার্টির নেতা সেনবাবুর এক সর্বহারাকে ঝাড় দিতে মনটা একটু কাতর হয়েছিল, কিন্তু তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার উপায় ছিল না। এটা একটা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। ঝিকে মেরে বউকে বোঝাও এটা আমাদের প্রাচীন পদ্ধতি। এই জন্য ওকে একটা দৃষ্টান্তমূলক মার দিতে হবে। সেই মার দেখে যেন অঞ্চলের যুবজনের কাছে একটা বার্তা পৌঁছে যায়। দেখ নকশাল করলে তার কী হাল হয়। ভয়ে যেন কেউ নকশাল নাম পর্যন্ত মুখে না আনে।
