একবার আমি বাইপাশ পার হয়ে রাধা হাউসিংয়ের কাছে একজন লোককে খুঁজতে গেছি। তিনি বলেছিলেন, হাউসিংয়ের পিছনেই ওনার বাড়ি। তিনি ভ্যান রিকশা চালান। দুপুর বেলা সেখানে গিয়ে দেখি ছোট ছোট অনেকগুলো ঘর। এর ঠিক কোনটায় তিনি থাকেন বুঝতে পারি না। শেষে এক ঘরের সামনে একটি মেয়েকে দাঁড়ানো দেখে জিজ্ঞাসা করি–আচ্ছা বলতে পারেন এখানে এক ভদ্রলোক থাকেন, ভ্যান রিকশা চালান। তার বাড়িটা কোথায়? আমার কথা শুনে মেয়েটা বড় ভাবনায় পড়ে গিয়ে বলে–এখানে যারা ভদ্রলোক সব তো হাউসিংয়ে থাকে। তারা সব চাকরি করে। কেউ ভ্যান চালায় না। ভ্যান রিকশা চালায় আমার বাবা কিন্তু সে ত… মেয়েটির বয়স বছর চব্বিশ। অল্প লেখাপড়াও জানে। দেবী শেঠির হাসপাতালে কাজ করে। পুরাতন অভ্যাসে সেও অন্যদের মত তার ভ্যান রিকশা চালক বাবাকে ভদ্রলোক বলে ভাবতে পারছে না। তার ভাবনাকেও বিকৃত করে দিয়েছে এই দুষিতকরণ প্রক্রিয়া।
সেদিনে আমাদের ঘরের সামনের মাঠে ’পাঁচ-ছটা’ ভদ্রলোকের সন্তান ব্যাটবল নিয়ে ক্রিকেট খেলতে এল। এটা সত্যি যে এ পাড়ায় বাচ্চাদের খেলবার মতো কোন ফাঁকা জায়গা নেই। তারা এসে আমার ভাইবোনকে তাড়িয়ে দিয়ে জায়গাটার দখল নিল। মা বাবা দুজনে কাজে গেছেন। মেজ ভাইও ঘরে নেই। আমি কি এক দরকারে যেন কোথায় গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি আমার ভাই নিরু কাঁদছে। কাঁদছে কেননা ও পাড়ার বাচ্চারা তার কাঁচের গুলি সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। যার দুটো সে খুঁজে পাচ্ছে না।
মাথাটা ধাঁ করে উঠল আমার। আমরা এখানে থাকি। আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে। যতদিন আমরা আছি আমাদের অধিকার সবার আগে। আমার ভাইয়ের গুলি ফেলে দেয় এত স্পর্ধা কার! আমি ছুটে গিয়ে ওদের উইকেট তুলে ফেলে দিই–যা! এখানে কোন খেলা ফেলা হবে না। তারা গিয়ে তাদের দাদাদের সে কথা জানাল। খেলতে দিচ্ছে না। উইকেট তুলে ফেলে দিয়েছে। এরপর দাদারা দৌড়ে এল। এক দাদা যে আমার চেয়ে বছর সাত আট বড় দশ-বারো ইঞ্চি বেশি লম্বা সে ঠাস করে এক চড় হাঁকাল আমার বাঁ গালে। বাঞ্চোৎ, এত সাহস তোর! আমাদের পাড়ায় থাকিস আবার আমাদের উপর মস্তানি দেখাস! আন, এনে যেখানের উইকেট সেখানে পুতে দে!
আগে আমি এদের হাতে অনেকবার মার খেয়েছি। এই দাদাও একবার মেরেছিল। কিন্তু এখন আমি অন্য মানুষ। যার একমাত্র উপাস্য শয়তান। যে আমাকে শিখিয়েছে কোন ভয়ভীতির সামনে নত না হতে। মানুষ একবারই মরে, কাপুরুষ মরে বারবার। যে মানুষ মরতে ভয় পায়, তাকে সবাই ভয় করে। আমিও চড়ের বদলে এক চড় বসিয়ে দিলাম তার ডান গালে। ওই চড় যেন মৌচাকে ঢিল মেরে দিয়েছে। পাঁচ-সাত জন একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর। কিল চড় লাথি ঘুসি-মুহূর্তে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল আমার শরীরের উপর দিয়ে। তারা যখন ক্লান্ত হয়ে থামল তখন আমার নাকমুখ থেকে গলগল করে রক্তের ঢল নেমে বুকপেট সব ভাসিয়ে দিচ্ছে।
কলকাতা শহরে এসে এ আমার এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমাদের ক্যাম্পে দেখেছি দুজনে ঝগড়া মারামারি হলে দশজনে এগিয়ে এসে তাদের থামিয়ে দেয়। এখানে একজনের উপর দশজন মিলে হামলে পড়লে অন্য সবাই দূরে দাঁড়িয়ে দেখে। এক বিভৎস আনন্দে অবগাহন করে। কেউ কাছে আসে না। এখানকার নীতি যে আক্রান্ত সে যদি পারে আত্মরক্ষা করুক, না পারলে মরুক।
“জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা।” মানব মনোবৃত্তি সম্বন্ধে এই যে জ্ঞান তা আমারও একদিন কাজে লাগবে। যেদিন আমিও মারতে শিখে যাব। কিন্তু আমি এখন কী করব।ওরা অনেক আমি একা, তাবলে মার খেয়ে মাটিতে পড়ে থাকব। ওরা যখন আমাকে উচিৎ শিক্ষা দিয়ে ফিরে যাবার পথ ধরেছে ধুলো ঝেড়ে উঠে বঁছালাম। আমার আরাধ্য দেবতা শয়তানের শরণাপন্ন হলাম আমি। হে দেবতা আমাকে সাহস দাও শক্তি দাও। সারা জীবনে অনেক মার খেয়েছি। অনেক রকমভাবে মেরেছে মানুষ। হয় আমাকে ভয় জয় করে উঠে দাঁড়িয়ে মারতে শেখাও, নয় তো মৃত্যু দাও।
ঘরে আমাদের একখানা ছোট কুড়ুল ছিল। বাবা এই কুড়ুলের সাহসে একা চলে যেতেন কাঠ কাটতে গভীর জঙ্গলে। সেই কুড়ুলখানা আজ আমার হাতে। এ যেন সেই পরশুরামের কুঠার। যা দুর্বিনীত অহংকারী অত্যাচারী ক্ষত্রিয়কুলকে একুশবার ধ্বংস করেছিল। সেই কুড়ুলখানা তুলে ধাওয়া করলাম ওদের। তখন, ওরা অনেক আমি একা, ওরা বলবান আমি বলহীন, ওরা উচ্চবর্ণ আমি নিঃস্ব, এদেশের আইন ধনবানের রক্ষক, ধনহীনের ভক্ষক, এ সব কোন কিছু আর মনে রইলনা। মনের মধ্যে তখন জেগে উঠেছে এক এতকালের ঘুমিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরি। মার কা বদলা মার চাই। খুন কা বদলা খুন।
ওরা আমার দিক থেকে প্রত্যাঘাত আশা করেনি। কাঁদব, নালিশ করব, কপাল চাপড়াব, আমাদের জাত গোত্র শ্রেণির মানুষ চিরকাল যা করে থাকে। সেই চিরকালের বিধান নিয়ম উল্টে দিয়ে নিজেই বিচারকের আসনে বসে বিচার করে নিজের হাতে অপরাধীর শাস্তি দেব সেটা ছিল তাদের কল্পনারও অতীত। তাদের একজনের ঘাড়ে কুড়ুল পড়তেই বাকি সবাই প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে যে যেদিকে পারে ছুট মারল। সেদিন সেই সময় অন্ততঃপক্ষে দশ পনের মিনিট আমার চারপাশে কোন মানুষ হিম্মত করে এসে দাঁড়াতে পারেনি। পাড়ার গলিতে দাপিয়ে বেড়িয়েছিলাম একা আমি। যাকে এই কিছুক্ষণ আগে মনে হয়েছিল একটা চক্রব্যুহ, ভোতা এক কুড়ুলের দাপটে তা পরিণত হয়ে গিয়েছিল একটা মুক্তাঞ্চলে।
