আছড়ে পড়া বাবার শরীরে যে আঘাত লেগেছিল, মনে লেগেছিল তার বহুগুণ বেশি। সারা জীবন তার মনে একটা ধারণা ছিল সে সৎ মানুষ, কঠোর পরিশ্রমী, কখনও কারও অনিষ্ট করেন না। সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। এই সব সদগুণের কারণে শ্যামাকলোনি ও রামকৃষ্ণ উপনিবেশের মানুষ তাকে ভালবাসে। এইখানে যে তাকে এত অপমানিত হতে হবে সে তার দুরতম কল্পনাতেও ছিল না। এই অপমানিত জীবন রেখে আর কী হবে? মাটি থেকে উঠে বাবা ছুট দিল রেল লাইনের দিকে। আত্মহত্যা করে তিনি সব অপমানের জ্বালা থেকে চিরমুক্তি নেবেন।
আমি তখন যাদবপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়েছিলাম। রাত তখন প্রায় নটা, বাসায় ফেরবার সময় দেখতে পাই কাঁদতে কাঁদতে টালমাটাল পায়ে আমার বাবা সামনের দিকে ছুটে আসছেন। তাকে ধরে ফেলে থামিয়ে সব শুনলাম। আর তখন সেই অবমাননাময় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে–চিরমঙ্গলময় ঈশ্বরকে অস্বীকার করলাম আমি। হে ঈশ্বর তুমি যখন তোমার এক অন্ধভক্তকে বিপদের দিনে বাঁচাতে এলে না–তোমাকে আমার আর কোন দরকার নেই। আজ থেকে আমার উপাস্য তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী–শয়তান। মনে মনে ডাকলাম হে শয়তান, আমাকে সাহস দাও শক্তি দাও। যে হাত দিয়ে অনিল আমার বাবাকে মেরেছে সেই হাতটা কাধ করে নামিয়ে দেব–সেই সাধনায় সিদ্ধি দাও।
সন্ধ্যের মুখে ওরা আমার ভাইকে নিয়ে গিয়েছিল, আর ছেড়েছিল রাত প্রায় সাড়ে নটায়। এত দীর্ঘ সময়-আশেপাশের মানুষ তামাশা দেখেছে। কিন্তু এক জনের মনেও শুভবুদ্ধির উদয় হল না। কেউ গিয়ে বলল না, কেন, তোমরা ছেলেটাকে এভাবে মারছো।ও যে চুরি করেছে তার প্রমাণ কী?
সেদিন যা জেনেছিলাম, বুঝেছিলাম আমার সেই জানাবোঝার এত বছর পরেও এতটুকু টোল পড়েনি। দীন দুর্বল অসহায় মানুষের উপর অত্যাচার করতে সবল শক্তিমানের কোন প্রমাণ দরকার পড়ে না। তার ইচ্ছাই যথেষ্ট। এখানে আর একটা কথা বলে রাখি-আমি অনিলের হাত কেটে ফেলতে পারিনি। সেটা আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ। কারণ যতদিনে আমি নিজেকে সেই পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হই, ততদিনে সে তার নব বিবাহিত বধূকে রেখে ব্রেন টিউমারে মরে যায়।
আর একটা কথা, শেষ পর্যন্ত সেই হাঁসটা পাওয়া গিয়েছিল। কেন কে জানে সে ড্রেনের পাশের ঢোলকলমির জঙ্গলে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিল। অনেক রাতে ভয় পেয়ে প্যাক প্যাক করে ডেকে উঠলে বাসকের ভাই গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে আসে।
.
আমার ছোট ভাইয়ের নাম নিরঞ্জন। তাকে আমরা ডাকি নিরু বলে। মাথাটা ছোট পেটটা বড়, মায়ের মত মুখ মায়ের মত গায়ের রঙ। এই ভাইটাকে আমি খুবই ভালোবাসি। ছোটবেলায় আমার কোন খেলবার উপকরণ ছিল না। বাবার সে ক্ষমতা ছিল না যে খেলনা কিনে দেবেন। আমি আমার সেই বাল্যের অতৃপ্তি তৃপ্ত করতে চাইতাম নিরুর মধ্যে দিয়ে। আমার কোন ঘুড়ি লাটাই লাট্টু কাঁচের গুলি ছিল না। কিন্তু নিরুর ছিল। আমি তাকে সেসব কিনে দিয়েছিলাম।ও খেলত আর আমি বসে বসে দেখতাম। যেখানে আমরা থাকতাম আমাদের চারপাশের সবাই ছিল স্বচ্ছল শিক্ষিত ভদ্রলোকের দল। যারা কায়িক শ্রমে জীবননির্বাহকারী মানুষকে ইতর ছোটলোক বলে মনে করে। ফলে ওরা আমাদের সাথে মিশত না। খুব দরকার না পড়লে কথা বলত না। আমাদের দারিদ্র্য এবং জাতিগত ভিন্নতা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল আঞ্চলিক সমাজ জীবন থেকে।
আমরা যে ভবনটির নির্মাণ সামগ্রীর পাহারাদার নিযুক্ত হয়েছিলাম সেটির নির্মাণ তখন বেশ কিছুদিন বন্ধ পড়েছিল। তখন আর ইট বালি এসব না আসায় আমাদের ঘরের সামনের মাঠটুকু ফাঁকা পড়েছিল। আমার ছোটভাই নিরু ছোটবোন অঞ্জু ওই জায়গাটুকুর মধ্যে সারাদিন ঘোরাঘুরি করত, খেলত। এই জায়গায় কোন কোনদিন এ পাড়ার বাচ্চারাও খেলতে আসত। তখন ওরা আমার ভাইবোনকে ওখান থেকে তাড়িয়ে দিত। নোংরা আর ছেঁড়া জামা কাপড় কালো কালো চেহারা তেলহীন রুক্ষ মাথার চুল, খড়িওঠা গা–গতর এসব দেখেই সেইসব বাচ্চারা বুঝে গিয়েছিল, আমরা ওদের মত “ভদ্রলোক” নই। তাই তাদের আমাদের সান্নিধ্য থেকে দূরে সরে থাকাই প্রচলিত নিয়ম।
সেটা সম্ভবতঃ ১৯৮১-৮২ সালের কথা। আমি তখন রিকশা চালাই। এইট বি বাসস্ট্যান্ড থেকে স্কুল ফেরতা দুটি বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলাম নর্থরোডে। সাত আট বছরের ফুলের মত সুন্দর বাচ্চা দুটি নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল হাসছিল। সেই পবিত্র নির্মল প্রাণখোলা হাসিতে আমার মনটাও হাসছিল “গাধা ঘোড়া গরু” তুল্য জীবনের কষ্ট অপমান ভুলে। রিকশা চালাতে চালাতে তাদের সাথে আলাপ জমাতে চেষ্টা করছিলাম আমি, কি নাম তোমার খুকুমণি। কোন ইস্কুলে পড়ো…। আর নর্থরোডে পৌঁছে সুদৃশ্য বাড়ির দরজায় রিকশা থামিয়ে বিগলিত আত্মীয় ভাবনায় বলে বসেছিলাম, খুকুমণি আমাগো বাড়ি যাইবা? আর তখন সেই ফুলের মত শিশুর চোখে মুখে সেদিন যে ঘৃণার চালচিত্র ফুটে উঠেছিল তা আমি কোনদিন ভুলতে পারব না। ছোট্ট ঠোঁট বাঁকিয়ে সেই শিশু চরম তাচ্ছিল্যের শব্দে বলেছিল–”তোমাদের বাড়ি কেউ যাবে না। তোমরা রিকশা চালাও।”
ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায়–বঙ্গভূমির বাঙালী মননে, বিশেষ করে কলকাতা মহানগরীর মধ্যবিত্ত ভাবনায়, ছোটজাত, ছোটলোক, কায়িকশ্রম এই তিনটি শব্দ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যারা ছোটজাত তারাই ছোটলোক। তারাই রিকশা চালায় মজুর খাটে, ঠেলা চালায়, বাসন মাজে এবং নানারকম কায়িকশ্রমে পেটের খাবার সংগ্রহ করে। আর যারা ভদ্রলোক তারা ভালো খায়, ভালোবাড়িতে থাকে, ভালো চাকরি করে যাতে কোন ঘাম ঝরে না শ্রম লাগে না। এই ভাবাশ্রয়ী পরাবৃত্তের মধ্যেই তাদের সব অভিগমন। যার দ্বারা পারিবারিক পরিবেশগত কারণে শিশুরাও সংক্রামিত হয়ে পড়ে শিশু বয়েসেই।ওদেরও কচি মনে দাগ কেটে বসে যায় ওরা আমরা এই শ্রেণি বিভাজন। দুয়ের কোন বিন্দুতে সম্মিলন সম্ভব নয়। এই ভাবনা উঁচু থেকে নিচুতে, গাছের মগডাল থেকে শেকড়ে চারিয়ে গেছে। কোন গরিব আর নিজেকে ভদ্রলোক বলে ভাবতে পারে না। ভয় পায়, লজ্জাও পায়।
