পরের দিন সকালে কাউকে কিছু না বলে দিনের আলো ফোটবার আগে অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে চলে এসেছিলাম আমরা। এক হীনমন্যতা গ্রাস করে নিয়েছিল আমাদের। সাহস করে যে পারিশ্রমিকের টাকাটা চেয়ে নেব, তাও পারিনি।
.
রামকৃষ্ণ উপনিবেশ কলোনিতে থাকে একজন ছেলেধরা। এই লোকটার নাম প্রণব চক্রবর্তী। এক পার্টির আঞ্চলিক নেতা। ফরসা লম্বা ভদ্রশিক্ষিত এই লোকটি সবসময় খুঁজে বেড়ায় কাকে ধরবে। উঠতি বয়সের ছেলে তার ভারী পছন্দ। আমাকেও ধরবে বলে তাক করে আছে। মাঝে মাঝে সে ডেকে আমাকে চায়ের দোকানে নিয়ে বসায়। নিজের পয়সায় বড় চা নিয়ে দুভাগ করে।
তিনি একদিন বলেছিলেন–”এই পৃথিবীর যা কিছু মহান যা কিছু শ্রেষ্ঠ যত কিছু সম্পদ সবকিছুর সৃষ্টি হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা। তাই পৃথিবীর সব চেয়ে শ্রেষ্ঠ সবচেয়ে মহান মানুষ হচ্ছে মেহনতি মানুষ, শ্রমিক ও কৃষক।”
আমার কিন্তু শ্রম জীবনের প্রতি কোন আকর্ষণ কোন মোহশ্রদ্ধা আর অবশিষ্ট নেই। কোথাও কোন কাজে যেতে মনের সায় পাইনা। রান্নার কাজে যাবার কথা বললে রাগে সারা শরীর যেন জ্বলতে থাকে। তাই কাজ কর্ম ছেড়ে চুপচাপ ঘরে বসে থাকি।
.
আমার মেজভাই চিত্তর পায়ের উপর গরম জলের কেটলি উল্টে পড়ে গেছে। তাই বাসায় চলে এসেছে সে। পায়ের ফোস্কা সেরে যাবার পর সে একটা অন্য কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। যে মালিক এমন বিপদের সময় শুধুমাত্র ফোস্কার উপর বার্নল লাগিয়ে দায় মুক্ত হয়ে যায়, কোন খোঁজ নেয় না তার কাছে কাজ করার ইচ্ছা নেই আমার ভাই চিত্তর। সে তাই তখন বাসায় বসেছিল।
আমরা শ্যামাকলোনি নামের যে পাড়ায় থাকি, রাজা সুবোধ মল্লিক রোড় পার হয়ে তার এপাশের কলোনির নাম রামকৃষ্ণ উপনিবেশ। সেখানে থাকে অনিল, বিলু আর বাসক-নামগুলো আসল নয় একটু বদলে দিলাম। এরাতিনবন্ধু। অনিলেরা চারপাঁচ ভাই। তাদের যাদবপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে বড়কাপড়ের দোকান।বিলু আর বাসক সুলেখা কালির কারখানার কর্মী। এবং এক রাজনৈতিক দলের সদস্য। পূর্বদিকে রামকৃষ্ণ উপনিবেশ, পশ্চিমদিকে টিবি হাসপাতাল। এর মাঝখান থেকে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে সোজা চলে গেছে যে বড় জল নিকাশি নালা, বাসকের মা এই নালায় জমা জলে ডজন খানেক হাঁস পোষে। একদিন ওরা তিনবন্ধু এসে ধরে নিয়ে গেল আমার ভাই চিত্তকে। তাদের অভিযোগ যে সে নাকি হাঁস চুরি করেছে। আমার ভাই চুরি করেছে সেটা কেউ দেখেনি। তবে কে একজন তাকে ওই নোংরা জল নিকাশি নালার কাছে সন্ধ্যে বেলায় ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে। তারপরই হাঁস নিখোঁজ। এতেই প্রমাণিত সে ছাড়া আর কেউ নেয়নি নিখোঁজ হয়ে যাওয়া হাঁসটা।
আমরা যে বাসায় থাকি তাতে কোন পায়খানা নেই। ফলে পায়খানা পেলে আমাদের ওই নালার পাশের ঢোলকমলির জঙ্গলেই যেতে হয়। সাপ আছে জোক আছে বিছে আছে জেনেও আমরা নিরুপায়। এবং আমাদের সবচেয়ে পছন্দের সময় সন্ধ্যার সূর্য ডোবার পরে আর সকালে সূর্য ওঠার আগে। সন্ধ্যার সময় আমার ভাই সেখানে হয়ত গিয়েছিল। তাই শুধু মাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তারা ওকে ধরে নিয়ে গেল। এখানে আমাদের আপনজন কেউ নেই। আমরা এখানকার লোকও নই। এখানে থাকি একজনের অনুগ্রহ আর একজনের বাসায়। আমরা শিক্ষাদীক্ষাহীন–গরিব মানুষ। জাতিতেও নিচু। আমাদের হয়ে এখানে কে কথা বলবে। কেন বলবে? বললে একমাত্র বলতে পারতেন প্রণব চক্রবর্তী, আমার প্রণব দা। কেন কে জানে তিনি ধারে কাছে আসেননি। সেটা কী অনিল তারই সংগঠনের ছেলে বলে? আমি জানি না!
যারা আমার ভাইকে নিয়ে গেছে তাদের যুক্তি অতি চমৎকার–এত বছরে এখানে কারও কোনও কিছু চুরি যায়নি। আমরা আসার পরই হাঁস গেল। এর মানে একটাই–আমরাই চোর। এবং সেই সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎকাল নিয়েও উৎকণ্ঠা, আজ হাঁস চুরি করেছে কাল কার দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে সব মাল হাতিয়ে নেবে তার কি ঠিক। অতএব আজই এমন শিক্ষা দিতে হবে, যেন চুরির নাম ভুলে যায়। সেই শিক্ষা দেবার জন্য শুরু হয়ে গেল বেধরক মার।
আমার বাবা তখনও কাজ থেকে ফেরেননি। সারাদিনের কঠিন পরিশ্রমের পর বাসায় ফিরে ক্রন্দনরতা মায়ের মুখে সবকথা শুনে আর বিশ্রাম নিতে পারলেন না, পাগলের মত ছুটে গেলেন তিনি। হাত জোর করে কেঁদে ফেললেন বাবুদের দয়ার দরজায় “–বাবুগো অরে আপনেরা আর মাইরেন না। পোলায় আমার সারাদিন কিছু খায় নাই। আর মারলে মইরা যাইব।” বাবার স্বীকারোক্তির মধ্যেই তারা মারবার স্বপক্ষে জোরালো যুক্তি খুঁজে পেয়ে গেল। মানুষ চুরি করে কেন? করে স্বভাবে আর না হয় অভাবে। সারাদিন খায়নি, একেবারে সোজা অংক–সেই জন্যই হাঁস চুরি করেছে। হয় ওটা বিক্রি করে চালটাল কিনে আনবে বা এনেছে, নয় কেটে খেয়ে নিয়েছে বা খাবে। ঠিক কী করেছে সেটা যতক্ষণ না বলছে মার চলছে মার চলবে।
বাপের সামনে ছেলেকে মারা হলে কোন বাপের পক্ষেই তা সহ্য করা কঠিন। আর একপ্রস্থ মার শুরু হতেই বাবা গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আমার ভাইয়ের বুকের উপর। দুর্বল শরীরের আড়াল দিয়ে রক্ষা করতে চেষ্টা করলেন সারাদিনের অভুক্ত পুত্রকে বিভৎস অত্যাচার থেকে। তার তখন ঠোঁট কেটে নাক ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে। সারা শরীর পথের ধুলোয় লতপত। এই মারকুটে ছেলেদের প্রধান অনিল সাহা। সে বাবাকে টেনে তুলল চিত্তর বুকের উপর থেকে। পল্লীমঙ্গল সমিতির ব্যায়ামাগারে ব্যায়াম করা বলশালী হাতে বাবাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল পাকা রাস্তার উপর–যাও সরে যাও এখান থেকে নাহলে তোমাকেও বানানো হবে। সব চোর কাহাকা।
