এখন কী হবে? অগত্যা আমার উপর দায়িত্ব দেওয়া হল উত্তর চব্বিশ পরগনার সেই কাজ সুসম্পন্ন করে আসবার। ভরসা ছিল নরেশ ঠাকুরের–আমি পারব। আমার সাথে যোগাড়ে হয়ে গেল বেতবেড়িয়া গ্রামের দুঃখে। বলে দিল নরেশ ঠাকুর, গিয়ে পার্টিকে বলবি আমার শরীর খুব খারাপ। হঠাৎকরে জ্বর এসে গেছে তাই যেতে পারিনি। কাজ শেষ করে আসার সময় চল্লিশ টাকা চেয়ে নিবি। দশ টাকা বায়না দিয়ে গেছে। এই মোট পঞ্চাশ।
আজ যাব বিকেলে, কাজ কাল, ফিরব পরশু সকালে। দুদিন হাফ একদিন ফুল, আমি ঠাকুর তাই মজুরি পাব ষোল টাকা। এবার আমি পনের টাকায় মাকে একখানা কাপড় কিনে দেব। মা সেই মশারির টুকরো জড়িয়ে কতদিন কাটিয়েছেন অন্ধকার ঘরের কোণে তা আমি জানি না। তাকে দিনের আলোয় আনবার জন্য কর্মকারের বউ একখানা বাতিল কাপড় বাবার হাত দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। তখন কর্মকার বাড়ি তৈরি হচ্ছিল। বাবা মজুরের কাজ করছিলেন। এখন সেখানাও ন্যাকড়া।
তখন বিকেল শেষ হয়ে সবে সন্ধ্যে নেমেছে। আমরা দুজন পৌঁছে গেছি সেই ঠিকানায়। সে সময়ে বাড়িটা সাজানো চলছে। গেটের সামনে কয়েকজন মজুর বাঁশের খুটি পুতছে। কাল এতে ফুলের গোছা বাঁধা হবে। একজন চার পাঁচ খানা হ্যাঁজাকে তেল ভরছে, ম্যান্টেল বাধছে। এ অঞ্চলে এখনও বিদ্যুৎ এসে পৌঁছয়নি। আর বাড়ির গোবরলেপা পরিষ্কার উঠোনে এক আমগাছের তলে ইজিচেয়ার পেতে বসে আছেন এই গৃহের বড়কর্তা। তার পরনে ভাঁজ করে লুঙ্গির মতো পরা একখানা দামি ধুতি। গায়ে কিছু নেই এবং হাতে একখানা তালপাতার পাখা। গলায় ধবধবে একগাছা পৈতা। তার সামনে মাটিতে শীতলপাটি বিছানো যার উপরে শায়িত সেই শিশু। যার কাল মুখেভাত। হাজার হাজার টাকা ব্যয়। সোনার বরণ সে শিশুর সারা শরীর সোনায় মোড়া। গলা হাত বাহু কোমর কোথাও খালি নেই। বড়ই ভাগ্যবান এই শিশু জন্ম নিয়েই দশভরি সোনার মালিক।
আমরা গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই আমাদের হাতে হাতা খুন্তি দেখে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি-নরেশ আসেনি? বলি আমি–তার শরীরটা। তিনি আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলেন–খুব খারাপ তাইনা? হঠাৎ করে আজ জ্বর এসে গেছে এই বলবি তো? একটু সময় চুপ করে থেকে জানতে চান তিনি-তোদের দুজনের মধ্যে ঠাকুর কে? আমি আঙুল তুলে দুঃখেকে দেখাই। সে দেখায় আমাকে। হুকুম দেন গৃহকর্তা-~ও দিকে তাকা। তাকাই সেই দিকে। একজন মজুর কুড়ুল দিয়ে কাঠ “চেলা” করছে। এই “চেলায়” কাল রান্না হবে। উনি সেই “চেলা” দেখিয়ে বলেন–কে রান্না করবি আমার জানার দরকার নেই। যদি রান্না খারাপ হয় ওর একখানা পিঠে পড়বে মনে থাকে যেন।
সন্ধ্যে গড়িয়ে গিয়ে রাত নামল। সে বড় ভয়ের রাত। চারিদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। মাঠের ঘাসের মধ্যে ঝিঁঝি পোকারা তান ধরেছে। সামনের পাটক্ষেতের মধ্যে সাপে ব্যাঙ ধরেছে। বড়ই করুণ স্বরে কো কো করে কাতরাচ্ছে মৃত্যুপথযাত্রী ছোট্ট জীবটা। যেখানে কাল রান্না হবে সেখানে আমরা দুটো উনুন বানিয়েছি। তারপরে এদের দেওয়া খাবার খেয়ে পাকশালেই শুয়ে পড়েছি। কিন্তু ঘুম আসছে না। আমার নিজের উপর আস্থা আছে। জানি, রান্না আমি ভালোই করব। এমন কিছু ঘটবে না। যে পিঠে চেলা কাঠ পড়ে। কিন্তু দুঃখের বুক কাঁপছে ভয়ে। সে আমার উপর ঠিক ভরসা রাখতে পারছেনা। রাত আর একটু ঘন আর একটু শুনশান, নিস্তব্ধ হয়ে যাবার পর আমাকে চুপিচুপি বলে সে–”চল এ্যাখোন আমরা পেলিয়ে চলে যাই।” আন্না বান্নার কথা কিছু বলা যায় নে। এই ভালো তো এই খারাপ। এরা লোক ভালো নয়। যেদি আন্নায় কোন দোষঘাট হয় বড় ঠ্যাঙাবে। আমি এটা জানি যে এখন পালিয়ে চলে যাওয়া খুবই খারাপ কাজ হবে। তখন এরা যাদবপুরে গিয়েও পিটিয়ে আসতে পারে। জন সমর্থন পাবে। বলা যায় না আমরা চলে গেলে রেগেমেগে আমাদের নামে একটা চুরির কেসও চাপিয়ে দিতে পারে সে কথাই বলি দুঃখেকে। সাহস দিই–ভয় পাইসনা দুঃখে দা, দেখবি আমি ভালোই রানমু।
আমার কথা সত্যি হয়েছিল। নিমন্ত্রিত লোকজন খেয়ে রান্নার খুব প্রশংসাও করেছিল। কিন্তু আমাদের সগুণ দোষে পরিণত হয়ে গেল যখন জাতি পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ল।
এই বাড়ির সেই জামাই যে যাদবপুরে থাকে, সে কোন সাধারণ লোক নয়। নামকরা এক মাস্তান। সে এতক্ষণ পাশের কলাবাগানে বসে পাঠার মেটুলি দিয়ে “বাংলা” খাচ্ছিল। একা নয়, সাথে শ্যালক ছিল। পানপর্ব শেষ করে এসে সে দুঃখেকে দেখেই চিনে ফেললো। এ্যাই, তুই সেদিন আমাদের পাড়ায় পানাপুকুর সাফ করেছিলি না? নরেশ তোকে পাঠিয়েছে রান্না করতে।
এটা তো সত্যি যে রান্নার কাজ সবদিন হবার নয়। কিন্তু পেটের খিদে যে সবদিনের। তাই দুঃখে অন্য কাজ যখন যা পায় করে। তা না করলে সংসার চলে না। আমিও তো স্টেশনে মোট বই। তাই দুঃখে একদিন করেছিল কোন এক পানা পুকুরের পানা তোলার কাজ। সেটাই দেখেছিল মাস্তান জামাই এবং তার মুখটা মনে করে রেখেছিল।
এবার সেই জামাই আর তার শ্যালক দুজনে চেপে ধরল আমাদের। বল তোদের কী নাম, কী জাত। জেরায় প্রকাশ হয়ে গেল–একজন দক্ষিণবঙ্গের কাওড়া আর একজন পূর্ববঙ্গের নমঃশুদ্র। দুটোই জল অচল–অচ্ছুত। এরপর দুই মদ্যপজাত লুকিয়ে বামুনের হেঁসেলে ঢোকার অপরাধে আমাদের ধরে নিয়ে গেল লোকচক্ষুর আড়ালে, কলা বাগানের মধ্যে। কান ধরে ওঠবস নাকে খত এই সব করালো আমাদের দিয়ে। এটা ওদের কাছে ছিল হয়ত একটা মজা পাবার বিষয়। কিন্তু আমাদের কাছে ছিল চরম অবমাননাকর একটা ঘটনা। যা কোনদিন ভুলে যাবার মত নয়।
