নরেশ ঠাকুরের মাসি কিভাবে কেমন করে যেন পৌঁছে গিয়েছিল শেঠ বাগান লেনে। এখানে এক “হাইকোর্টের উকিল” তার ‘বাধাবাবু” হয়ে যায়। উকিল সাহেবের বউ বাচ্চা ছিল না। সে তার সমস্ত রোজগার দিয়ে মাসির নামে বেশ বড় একটা বাড়ি কিনে দেয়। তিনতলা এই বাড়িটায় নিজেদের ব্যবহারের জন্য দু তিনখানা কামরা রেখে বাকি ঘরগুলো দিনচুক্তিতে ভাড়া চলত। মাসির নিজের কোন সন্তান ছিল না। তাই তিনি তার ছোটবোন এবং তার দুই শিশু পুত্রকে এখানে এনে রাখেন। এসব গল্প নরেশ ঠাকুর নিজে আমাকে বলেছিল। আমাকে খুব ভালোবাসত বিশ্বাস করত। তবে তার মা এই পেশা গ্রহণ করেছিল কিনা তা কোনদিন বলেনি। সে নিজে থেকে যা বলেছে তার বাইরে অন্যকিছু আমার জানবার আগ্রহও ছিল না।
মেশো আগেই মারা গিয়েছিলেন, মাসি মারা যাবার সময়ে নরেশ ঠাকুর এবং তার দাদার নামে উইল করে বাড়িটা লিখে দিয়ে যান। এই বাড়িতে কমপক্ষে কুড়ি বাইশটি মেয়ে থাকে। তারা যে ভাড়া দেয়, একটু হিসেব করে চললে পুলিশ এবং পাড়ার মাস্তান, রাজনেতা সবাইকে দিয়েথুয়ে দুভাইয়ের সংসার চলে যাবার কথা। কিন্তু নরেশ ঠাকুরের দাদার খরচ ছিল হিসেব ছাড়া। মদ জুয়া বাইরের মেয়ে মানুষ সব নেশাই ছিল ষোল আনা। সে নিয়ে দুই ভাইয়ে ঝগড়া বচসা। এরপর শুরু হল দু ভাইয়ে পুরো বাড়িটা একা দখল নেবার চেষ্টা। চলল মামলা মোকদ্দমা। মামলার খরচা যোগাড় করা হোত সুদে টাকা ধার করে। শেষে একদিন বাড়িটাই চলে গেল দেনাদারের গর্ভে। দুই ভাই সপরিবারে নেমে এল পথে।
নরেশ ঠাকুরের তখন স্ত্রী মারা গেছে দুই ছেলে দুই মেয়ে রেখে। এরপর আর কী–এখানে দু দিন ওখানে দু মাস এইভাবে পথে পথে, ভাড়া বাসায়, ফুটপাতে দিন কাটানো। লেখাপড়া বিশেষ জানে না, কোন হাতের কাজও শেখেনি, শরীরও কোন শ্রমদায়ক কাজের উপযুক্ত হয়ে গড়ে ওঠার অবকাশ পায়নি। এখন বাঁচবে কীভাবে। কিছুদিন পরে একে একে ছেলেমেয়ে সবাই তাকে ফেলে চলে যায়।
যখন আমার সঙ্গে নরেশ ঠাকুরের পরিচয় হয়, তখন খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তার বড় ছেলে গনেশটকির কাছে এক প্লাস্টিক কারখানার কাজ করে। বিয়ে করেছে। দুটো বাচ্চা সহ পাতি পুকুরে ঘর ভাড়ায় থাকে। বড় মেয়ে যে ব্যাগের কারখানায় কাজ করত সেই কারখানার সুপার ভাইজারই তাকে বিয়ে করেছে। তারও দুটো বাচ্চা, মা মাসির অতীতে তাকে ধাওয়া করেনি। সে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে আছে। ছোট মেয়ে মা মাসির পদানুসরণ করে পৌঁছে গেছে রাইচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের এক কক্ষে। সেখানেই কামায় ও খায়। আর ছোট ছেলে এসে গেছে সেই শেঠ বাগান লেনে। সে এখন এই গলির এক গুণ্ডা। তোলা তোলে, মদ খায়, মারপিট করে, জেলে যায়।
নরেশ ঠাকুরের সাথে আমি তার ছেলেমেয়ের কাছে অনেকবার গেছি। ছোট ছেলে–যার ডাক নাম বুড়ো সে আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। বুড়োর সাথে গিয়ে পতিতা পল্লীতে মুখে রং মেখে পথের দিকে তাকিয়ে থাকা দুঃখী মেয়েদের যেসব জীবন কাহিনী জানতে পেরেছিলাম তারপর তাদের আর অনেকের মত ঘৃণা করতে পারিনি।
নরেশ ঠাকুর আমাকে ছেলের মতো ভালবাসত। বিশ্বাস করত, তার একলা জীবনের বিপদ বিঘ্নে আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াব। কিন্তু সে আমি পারিনি। আমি তখন নিজের বিপন্ন জীবন নিয়ে কোথায় না কোথায় পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। সেই সময় সে কী এক রোগে বিনা চিকিৎসায় রামকৃষ্ণ পল্লী মঙ্গল সমিতির বারান্দায় শুয়ে মরে যায় ও নিক্ষিপ্ত হয় বেওয়ারিস লাশ গাদায়।
সে অনেক পরের কথা। এখন আগের কথা বলি। আমার তখন রান্নার কাজে যাওয়ার ছয় সাত মাস হয়ে গেছে। সবদিন তো আর এ কাজ হয় না–মাসে দু চারবার। তবে যখনই কাজে যাই কড়াইয়ের আশেপাশে থাকি আর মন দিয়ে কাজটা শিখি। এ আমার দায়। একটা কিছু করে তো সারা জীবন খেতে হবে। দায়ে পড়ে নরেশ ঠাকুরও এইকাজ শিখেছে। তাইবেঁচে আছে। আমাকেও বাঁচতে হবে।
একদিন উত্তর চব্বিশ পরগণার এক জায়গা থেকে অন্নপ্রাশনের একটা কাজ এল। তিনশো লোকের আয়োজন। কাজটা ধরে নিল নরেশ ঠাকুর। কিছু অগ্রিম পেয়ে গেল। এর নাম বায়না। এসব কাজের এই নিয়ম। এতে দু পক্ষ দুপক্ষের কাছে বাধাপড়া থাকে।
তখনকার দিনে আজকালের মত এত ক্যাটারিং ব্যবসার রমরমা ছিল না। তখন গৃহকর্তা নিজে বাজার হাট করে, রান্নার লোক দিয়ে রাধিয়ে, নিজের আস্থাভাজন লোক দ্বারা পরিবেশন করিয়ে অতিথি অভ্যাগতদের ভুরিভোজন করাতেন।
আমি যে বাড়ির কথা বলতে যাচ্ছি সেই গৃহকর্তার বড় মেয়ের বিবাহ হয়েছে এই যাদবপুরে। মেয়ের বৌভাতে এসে নরেশ ঠাকুরের হাতের রান্না খেয়ে সেইদিনই তিনি মনঃস্থির করে বসেন, নাতির অন্নপ্রাশনে কলকাতার এই ঠাকুরকে দিয়ে রান্না করিয়ে সবাইকে খাইয়ে তাক লাগিয়ে দেবেন। তাই এই বায়না। পারিশ্রমিক বেশ ভালো রকম পাবার লোভে নরেশ ঠাকুর তখন কাজটা তো নিয়ে বসেছিল, কদিন পরে যে ওই একই তারিখে তার একটা বড় কাজ এসে যাবে তা কে জানত। সেটা অন্য অপর কেউ নয়, যে ডেকরেটর্স থেকে বারোমাস কাজ মেলে সেই ডেকরেটর্স মালিকের বাড়ির কাজ। বলে দিয়েছেন মালিক, আমার বাড়ির কাজ তোমাকেই করতে হবে নরেশ। আজেবাজে দুচারটে লোক পাঠিয়ে দেবে, তারা পাতে দেওয়া যায় না এমন রান্না করবে সে কিন্তু হবে না। তাহলে তোমার আমার সব সম্পর্ক শেষ, এই বলে দিলাম।
