মোড়ের মাথায় গিজগিজ করছে কর্মপ্রত্যাশী মানুষ। মিস্তিরিরা আসছে বাবু লোকেরা আসছে, গরুর বাজারে যেমনভাবে লোক গরুর শিং দাঁত লেজ নাড়িয়ে দেখে গরু কেনে, সেইভাবে তারা এখান থেকে বাছাই করে মজুর কাজে নিয়ে যাচ্ছে। আমি এখানে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম এই মানুষ কেনাবেচা। এ-ও যেন সেই প্রাচীনকালের বাঁদিবান্দা বেচাকেনার বাজার। তফাত শুধু এই, সারা জীবনের জন্য নয়, এখানে মানুষটাকে কেনা হচ্ছে একদিনের জন্য। ক্রীতদাস পোর চাইতে এতে খরচ অনেক কম পড়ে।
।আমি এখানে কাজ পাবার জন্য আসিনি। আমি তো স্টেশনে মোট বই। এসেছিলাম বাঘাযতীন বাজারে মাছের ঝুড়ি নিয়ে। কিছু ছোট ব্যাপারী খরচা কম পড়ে বলে রিকশায় মাল না চাপিয়ে আমাদের দিয়ে বওয়ায়। ঝুড়ি ফেলে যাওয়ার সময় কী মনে করে যেন দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। তখনই হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়াল একজন লোক। মাথায় সরসের তেল চপচপে লম্বা চুল, খালি পা, গায়ে হাতওয়ালা সাদা গেঞ্জি, গলায় পৈতা। আমাকে বলে সে “এ্যাই কামে যাবি”? কাজ! কী কাজ? জানায় সে “বিয়া বাড়ির কাম।” জল ভরতে হবে, মশলা করতে হবে, পাতা গেলাস ধুতে হবে, এটো পাতা ফেলতে হবে। এর জন্য মজুরি পাওয়া যাবে সাড়ে তিন টাকা, আর তার সাথে বিয়ে বাড়ির উপাদেয় খাবার একপেট ঠেসে যতটা ধরে।
আমি সেই জনগোষ্ঠীর মানুষ যারা উপাদেয় তো দুরের কথা, পেট ভরেই খেতে পায় না। স্টেশনের কিছু গরিব গুরবো দীন দুঃখী মানুষ বিয়ের সিজনে ডাস্টবিনে ফেলা এটোপাতা–খুঁজে খাদ্য নিয়ে আসে। ওদের মুখে শুনি সেই সব খাদ্যদ্রব্যের নাম। যা আমার বাপ ঠাকুরদাও কোনদিন শোনেনি, চোখে দেখেনি। আমি কাজে গেলে তা চোখে দেখতে পারব। রাজি হয়ে যাই। যামু কামে।
আমি বর্ণব্যবস্থার সর্বনিম্ন ধাপে অবস্থানকারীনমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ। জল-অচল, অচ্ছুত, অস্পৃশ্য। উঁচু জাতের হেঁসেলে গিয়ে ঢুকলে সেটা অপরাধ। যে আমাকে কাজে নিয়ে যাবার জন্য এসেছে, তার নাম মেঘা দাস, জাতিতে জেলে। অনেক খুঁজে মেঘা এক গুরুদেবকে পেয়েছে যার শিষ্য হলে পৈতা পাওয়া যায়। মেঘা তার শিষ্য হয়ে উপবীত পেয়ে পেশাগত দিকে কিছু নির্ভরতা পেয়েছে। গলায় পৈতে থাকায় আর কেউ জাত জানতে চায় না।
বলে সে–কী নাম তোর? নাম শোনার পর বলে, কেউ জিগাইলে ওই নাম কবি না। জাইত কবি কাইস্থ, কাম কইরা পয়সা নিয়া চইল্যা তাইলে জাইত যাউক সোগা মারাইতে।
এই জগতের এ এক বিচ্ছিরি নিয়ম এক জনের খারাপ না হলে আর একজনের ভালো হয়না। এই জন্যে বলে কারও সর্বনাশ তো কারও পৌষমাস। জামাই এসেছে শ্বশুরবাড়ি, শাশুড়ির সে কী আনন্দ। ওদিকে প্রাণ গেল কঁচি পাঠাটার। লাখ খানেক ডিম পেটে নিয়ে মারা পড়ল বেচারা ইলিশ মাছ।
আমরা যে বাড়ি রান্নার কাজে গিয়েছিলাম আয়োজন ছিল চারশো জনের। রান্নাবান্না যখন শেষ হঠাৎই শহর কাঁপিয়ে নেমেছিল কালবৈশাখির ঝড়-জল। বড় বড় গাছের ডাল ভেঙে পড়েছিল মড়মড় করে রাস্তার ওপরে। বিকট শব্দে বাজ পড়ছিল চারধারে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছিল বিদ্যুৎ ও পরিবহণ ব্যবস্থা। অবশ্য ঘন্টা দেড়েক পরে সেই ঝড় জল থেমেও গিয়েছিল। কিন্তু তখনকার বিক্রমগড়ের পথঘাট এমন ঝা চকচকে তো ছিল না। ইট বিছানো সে রাস্তায় ছিল বড় বড় গর্ত। আর এ রাস্তায় তখন একমাত্র রিকশা ছাড়া অন্য কোন বাহনও ঢুকত না। এখন সেই সব গর্তে জল জমে গেছে। অন্ধকারে চোখ চলে না। চাকা ভাঙার ভয়ে বেশি ভাড়া দিলেও রিকশা আসতে চাইছে না। এই অবস্থায় নিমন্ত্রিত আত্মীয় স্বজন যারা দূরে থাকে–আসে কী করে। তা ছাড়া এই অঞ্চলে এখন রাত নামলেই বোমা গুলি চলা শুরু হয়ে যায়। রাত গম্ভীর হয়ে গেলে তারা ফিরে যাবে কী করে। ফলে চারশো নিমন্ত্রিতের মধ্যে মাত্র দুই আড়াই শ এসেছে। এখন বেঁচে যাওয়া এত খাবার দাবারের কী উপায় হবে?
অন্যান্য মজুরের তুলনায় রান্নার কাজের মজুরদের দ্বিগুণ সময় বেশি খাটতে হয়। সকাল থেকে রাত দুপুর। কিন্তু এর জন্যে মজুরি মেলে না। তার বদলে মেলে দুবেলা খাবার। এরা দুপুরের খাবারটা খেয়ে নেয়। রাতের খাবার না খেয়ে পোটলা বেধে বাসায় নিয়ে যায়। গরিব পরিবারের মানুষ এরফলে একটু সুস্বাদু খাদ্যের স্বাদ পায়। সেদিন নিয়মমত সবাই যখন গামছার উপর কলাপাতা পেতে যে যার মজুরির খাদ্যে নেবে বলে প্রস্তুত, দুঃখী গৃহকর্তা একটা হাতা ঠকাস করে আমাদের সামনে ফেলে দিলেন–কী আর দেব, যার যা লাগে নিয়ে যাও? এসব আর কী হবে, সব তত ফেলা যাবে। যা পারো নিয়ে কমাও।
আমরা পাঁচ ছয়জন ছিলাম। যার গামছায় যতটা ধরে বেধে নিয়েছিলাম মাংস আর ভাত। শুধু আমাদের যে মাথা সেই নরেশ ঠাকুর কোন খাবার নেয়নি। খেয়েছিল দই আর মিষ্টি।
সেদিন রাত দুপুরে বাসায় ফিরে এসেছিলাম আমি। ঘুমন্ত মা বাবা ভাইবোন সবাইকে ডেকে তুলে বসিয়ে ছিলাম সরুচালের ভাত আর পাঠার মাংসের সামনে। বড় তৃপ্তি করে সেদিন খেয়েছিল সবাই আমার জীবনের প্রথম রোজগারের অন্ন।…..আমাদের দেশ মুনি ঋষিদের দেশ, তারা বলে গেছেন লোভ লালসাকে পরিত্যাগ করতে, কারণ লোভে পাপ হয়, পাপ করলে নরক গমন ঘটে, নরকে অশেষ যন্ত্রণা অপমান। কিন্তু মানুষ কবে আর মহাপুরুষদের কথা মেনে চলেছে। আমিও তো মানুষই। আমার লোভ হয়ে গেল, সুস্বাদু খাদ্যের লোভ। নেশা হয়ে গেল, রান্নার কাজে যাবার নেশা। যে আমাদের আসল রাধুনি ছিল তার নাম নরেশ ঠাকুর। সে বাল্যকালে মায়ের সাথে বর্ধমান থেকে কলকাতায় এসেছিল। তারপর আর কোনদিন বর্ধমানে যায়নি। লোকে তার মায়ের নামে সেখানে নাকি যাতা বলে। সে সব কথা শুনতে চায়নি।
