আমি যখন আসামে গিয়েছিলাম সেটা ১৯৬৮ সাল। তখনই সেখানে “বাঙাল খেদাও” আন্দোলনের অঙ্কুরোদগম হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝেই নানাস্থানে বিক্ষিপ্তভাবে আসামবাসী ও বাংলাভাষীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছিল। যা থেকে অনুমান করা কঠিন ছিল না যে একটা রক্তক্ষয়ী লড়াই আসন্ন। তখন, আর বোধ হয় আসামে থাকা যাবে না, এই আশঙ্কা করে আসামের জোরহাট নিবাসী এক বিত্তবান বাঙালী ভদ্রলোক কলকাতায় বাড়ি বানিয়ে চলে আসার কথা ভাবেন।
আগেই বলা হয়েছে যে, সেই সময়ে এখানে বহুলোকই একাধিক কলোনিতে একাধিক প্লট দখল করে রেখেছিল। তারা তাদের পছন্দ মতো একদুটো নিজের দখলে রেখে বাকিগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দিতে থাকে। আসামবাসী ভদ্রলোক দালাল মারফত যোগাযোগ করে ওই প্লটখানা কিনে নিয়ে এই বাড়িটার নির্মাণ করাচ্ছিলেন। পরে অবশ্য আসামের গণ্ডগোল থেমে যাওয়ায় আর তিনি আসাম ছেড়ে এই বাড়িতে বাস করতে আসেননি। ব্যাঙ্ককে ভাড়ায় দিয়ে দেন।
যেদিন আমি সেই বাসায় গেলাম তখন দুপুর বেলায় রান্না করছিলেন আমার মা। একটা হঁটের উনুনে বাঁশের টুকরো কাঠের কুচির জালে একটা কালো হাড়িতে ফুটছিল আটাগোলা। আটা জ্বাল হয়ে গেলে নুন দিয়ে বার্লির মত চুমুক দিয়ে খাবে বলে মায়ের কাছে বসেছিল আমার ভাই নিরু আর বোন অঞ্জু। বাবা তখন বাসায় ছিলেন না। পাশের রেশন দোকানের একটা চালের বস্তা নিয়ে নারকেল বাগান কলোনিতে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন পঞ্চাশ পয়সা মজুরির বিনিময়ে। যেদিন বাবার মজুরের কাজ হয়না ওই দোকানে গিয়ে বসে থাকেন। এতে এক আধটাকা হয়ে যায়। আমার ভাইবোন অধীর আগ্রহেইটের পাঁজা হেলান দিয়ে মায়ের রান্নাকরা দেখছিল। আটার মধ্যে ভেসে ভেসে উঠছিল ওদের কুড়িয়ে আনা কিছু সজির টুকরো। মা ভাইবোন সবারই চোখে মুখে বুকে পেটে শরীরের সর্বত্র জেগেছিল যেন যুগ যুগান্তের প্রবল ক্ষুধা।
আমাকে দেখে ভাইবোন প্রথমে চিনতে পারেনি। চিনেছিল মা। আর ভাইবোন যখন চিনল চক্ করে উঠল তাদের ছোট ঘোট দুজোড়া চোখ। বোনটা এসে জড়িয়ে ধরল আমাকে–দাদা এ্যাতোদিন আসোস নাই ক্যান! কই আছিলি? আমাগো জইন্য কী আনছোস?
জন্ম মুহূর্তের এক অভিশাপ জর্জরিত মানুষ আমি, দুহাত ভরে শূন্যতা ছাড়া আর কী আনতে পারি! মাথা নাড়ি আমি কিছুই আনতে পারিনি। এই দেশ, সময়, মানুষ, খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে আমাকে। সবাই ঠকিয়েছে যার যেমন সাধ্য। মা কাতর গলায় জিজ্ঞাসা করে-এতগুলান বছর কই আছিলি? কোথায় যে ছিলাম মাকে তা কী করে বোঝাই! ছিলাম তোনরকে, নরক যন্ত্রণা ভোগ করার জন্যে। এই পৃথিবীর মধ্যে যে বজ্রকন্টকশাল্মলী নরক রয়েছে যেখানে কৃমিকীটের মত মানুষ মানুষকে খুবলে খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়, আমি সেই নরকের বাসিন্দা হয়েছিলাম। সেই কষ্টের কথা মাকে কী করে বলি! বলে হবেই বা কী? তাই কিছুই বলতে পারি না আমি। একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। গ্রীষ্মের রাগীবোদ আমার শরীর জুড়ে ছোবল মারতে থাকে। দরদর ঘামে গায়ের গেঞ্জি ভিজে ওঠে। ভিজে ওঠে আমার চোখের পাতাও।
এ সময়ে বাবা ফিরে আসেন, পাঁচ বছরে তার বয়স যেন পনের বছর বেড়ে গেছে, হাতের ছেঁড়া ময়লা গামছাটা দিয়ে মুখ চোখ মুছে যেন ভূত দেখছেন এমনভাবে আমাকে দ্যাখেন। তারপর গর্জে ওঠেন–”কী করতে আইলি! আমরা মরছি কীনা দ্যাখতে আইলি বুঝি? মরি নাই। আমরা। মরলে তহন আইস্যা পোড়াইয়া যাইস”। আমার মৌনতায় তিনি আরও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন–”পোলা জন্মাইলে বাপের বুকে হাতির বল হয়। ভাবে, পোলায় বড় হইলে আর আমার কষ্ট দুঃখ এত থাকবো না। পোলায় সে বোঝা কিছু হাল্কা করবো। কিন্তু পোড়া কপাল আমাগো। পোলায় যেই বড় হইছে, পাখনা গজাইয়া গেল তার। যেদিক মোন লয়, ওড়তে আছে। আমরা আছি না গেছি হেতে তার কিছু যায় আসে না।”
বাবার বাক্যের প্রতিটা শব্দের মধ্য দিয়ে ঝরে ঝরে পড়ছে তার জীবন যন্ত্রণার তীব্র গরল। যা সে পান করেছে সারাটা জীবন। যা তাকে দিয়েছে এই সমাজ সে তা-ই দিচ্ছে সন্তানকে। যার সঞ্চয়ে যা আছে সে তো তাই দিতে পারে, যা নেই তা দেবে কী করে? বাবার কথাগুলো যেন আমার বুকের পাঁজরে দাগ কেটে বসে যাচ্ছে। বাবার কী দোষ! গ্রামবাংলার সরলসোজা মানুষ। সে জানেনা ওই দেশকালে তার ছোট্ট ছেলেটা কতখানি অক্ষম–অসহায়। তার দুর্বল বাহুতে নিজের ন্যায্য পাওনাটুকু আদায় করে নেবার মত শক্তি সামর্থ এখনও আসেনি। তাই প্রতি দরজা থেকে ধাক্কা খেয়ে বঞ্চনা কুড়িয়ে ফিরে আসতে হয়।
যেভাবে মাথা নিচু করে ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, মাথা নিচু করে আবার ফিরে চললাম পথের দিকে। একদিন আমি সেচ্ছায় ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম, আজ ঘর আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। এখন মাথার উপরে মহাশূন্য ছাড়া আমার আর কিছুই নেই।
.
একদিন আমি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সেই বাঘাযতীন মোড়ে। যেখানে আমার অকালে বুড়ো হয়ে যাওয়া বাপ কাজ পাবার আশায় এসে বসে থাকতেন। এখন সেখানে সমস্ত তীর্থস্থানে যেমন ভিক্ষা পাবার আশায় ভিখিরিরা বসে থাকে, সামনে ঝুড়ি কোদাল নিয়ে বসে আছে শতশত মজুর শ্রেণির মানুষ। সবাই কাজ চায়। কাজের শেষে চায় মজুরী। তাদের পুত্রকন্যা খিদেয় কাঁদছে। তাদের জন্য চাল কিনে বাসায় ফিরতে হবে।
