শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে চেপেছিলাম ঘোলা দোতলায় যাব বলে, ট্রেনের মধ্যেই দেখা হয়ে গেল একজন চেনা লোকের সাথে। সে ঘোলা দোতলার ক্যাম্পেই থাকে। তার মুখে খবর পেলাম আমার বাবা আর সেখানে থাকেন না। তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে যাদবপুরে এসে উঠেছেন। যাদবপুর কোন ছোট জায়গা নয়। বিশাল এই জনারণ্যে কোথায় আছে তারা, কী করে খুঁজে পাবো তাদের! তবু আশায় আশায় নেমে পড়ি ট্রেন থেকে যাদবপুর স্টেশনে। এখানে না নেমে আর যাবই বা কোথায়!
অনেকদিন এই শহরে বৃষ্টিপাত হয়নি। সারা শহর যেন সূর্যের দারুণ দহনে জ্বলে যাচ্ছে। সেই নিদারুণ প্রকৃতির রোষের সাথে পাল্লা দিয়ে সমান তালে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপও। পায়ে পায়ে সাতের দশক যে এগিয়ে আসছে। এই দশকেই তো তাজা বুকের গরম রক্ত দিয়ে লেখা হবে রাজনৈতিক ইতিহাসের সেই অধ্যায়। যা আগে মানুষ কখনও দেখেনি, আগে কখনও শোনেনি, আগে কখনও জানেনি।
আমি সেই ১৯৬৭ সালে শিলিগুড়িতে বসেই শুনেছিলাম নকশালবাড়ির নাম। যেখানে চিরকালের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে আদিবাসী, কৃষক, ক্ষেত মজুররা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, তারা জমিদার জোতদারদের ধানের গোলা দখল করে নিচ্ছে, দখল করে নিচ্ছে চাষের জমি, ক্ষেতের ফসল। তাদের এক কথা, লাঙল যার জমি তার। যে জমিতে কৃষকদের শ্রমে ঘামে ফসল ফলে, অথচ উৎপাদিত ফসলে কোন অধিকার থাকে না, সে আইন তারা মানবে না। কিন্তু শোষক শ্রেণি যাদের লেজুরবৃত্তিকারী রঙবেরঙের শাসক দল, পুলিশ মিলিটারি–তারা মানুষের এই দাবি মেনে নেবে কেন! তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরস্ত্র জনতার উপর। শিশু বৃদ্ধা মহিলা কাউকে রেয়াত করছেনা। ক্রমে বড় হচ্ছে লাশের পাহাড়। আর মানুষ সেই পাহাড় অতিক্রম করে সামিল হচ্ছে প্রতিরোধ আন্দোলনে।
সেই নকশালবাড়ির লাল আগুন এখন সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। তরাইয়ের ঘন জঙ্গলের মধ্যে বেজে ওঠা “বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ” এখন শোনা যাচ্ছে নানান দিকে, ক্ষেতে খামারে পাহাড়ে জঙ্গলে। কলকাতায় এসে দেখি, সারা শহর দখল করে নিয়েছে ওই নাম–নকশালবাড়ি।
.
খোঁজার মত খুঁজলে নাকি খড়ের গাদায় হারিয়ে যাওয়া সঁচও খুঁজে পাওয়া যায়। তবে তার জন্য কত দিন মাস বছর লাগে তার কোন হিসাব কেউ বলে যায়নি। আমি এই মহানগরে কোথায় আর খুঁজবো আমার প্রিয়জনদের। চিনি শুধু বাঘাযতীন মোড়, যেখানে আমার বাবা ঝুড়ি কোদাল নিয়ে বসে থাকতেন সেখানে গিয়ে দাঁড়াই। যদি বাবার দেখা মেলে। কিন্তু দেখা মেলে না। তিনি আর ওখানে যান না। যখন যাদবপুরে নেমে ছিলাম এই শহরে আশ্রয় পাবার মতো আমার কোন স্থান ছিল না। সেদিন আমার আশ্রয় হয়েছিল এই রেল স্টেশন। আজও আমার আবাস আশ্রয় ঠিকানা হল সে-ই। আর কোন চা দোকান হোটেলে গিয়ে কাজ নেবার মত মনের ইচ্ছা ছিল না। বড়ও তো হয়ে গেছি একটু। এখন আমি প্রাপ্ত বয়স্ক-যুবক। এখন আমি স্টেশনে মোট বই। ভারী মোট। আর রাত হলে ওভার ব্রিজের সিঁড়ির উপর শুয়ে ঘুমাই।
একদিন ভোর বেলায় ক্যানিং ট্রেনের যাত্রী এক মাছ ব্যাপারীর মাছের চাকন পাল বাজারে পৌঁছে দিয়ে পঞ্চাশ পয়সা মজুরি নিয়ে ফেরবার সময় লেভেল ক্রশিংয়ের কাছে দেখা হয়ে গেল আমার দিদিমার সাথে। শুনলাম তিনি এক বাড়িতে কাজ করেন। রান্না, বাসন মাজা, ঘর মোছা, কাপড় কাঁচা। এর জন্য দু বেলা খাওয়া আর মাসে বারোটা টাকা বেতন মেলে। দিদিমার কাছে খবর পাই, পরিবারের সবাই এখন কোথায় থাকে। আমার মা দুই বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করেন। দু বাড়ির মাইনে মিলিয়ে ষোলটাকা হয়। মেজভাই চিত্ত এক চা দোকানে গেলাস ধোয় সে পায় মাসে দশটাকা। বাবার শরীরটা এখন আগের তুলনায় একটু ভাল। তিনি কার কাছ থেকে যেন জেনে নিয়েছেন খাবার সোডা খেলে পেট ব্যথা কমে যায়। এখন পেট চিনচিন করে উঠলেই একমুঠো সোড়া জল দিয়ে গিলে নেন। সাথে সাথে উপশম। তিনি এখন সেই আগের মত জনমজুর খাটতে পারছেন। যদিও খাটবার ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। তবে এখন আর বাঘাযতীন মোড়ে যেতে হয় না। যেখানে থাকেন, সেখানকার পাড়াতেই কাজ পেয়ে যান।
কোথায় থাকেন। থাকেন শ্যামা কলোনিতে। এখন যেখানে সুকান্ত সেতু তখন সেখানে একটা খাল ছিল। ঠিক তার উল্টোদিকে। শ্যামা কলোনিতে ঢোকবার মুখে বা দিকে যে বিশাল বিল্ডিং, এখানে তখন বিল্ডিং ছিল না। ছিল একটা ফাঁকা মাঠ। আর জায়গাটি দখল করে রাখার প্রমাণ স্বরূপ মাঠের এককোণে একখানা ছোট দরমার ঘর। না পায়খানা বাথরুম, না জলের কল শুধু মাত্র একখানা ঘর। এই প্লটখানা যিনি দখল করে রেখেছেন, অন্য এক কলোনিতেও তার প্লট দখল করা আছে। ফলে এখানেথাকতে পারল ন্য। থাকেন সেখানে। দাম বাড়লে, পরে তিনি এই প্লটখানা বিক্রি করে দেবেন। শ্যামা কলোনির উল্টোদিকে রামকৃষ্ণ উপনিবেশ, যেখানে কুলদা কর্মকার নামে এক ভদ্রলোক থাকেন। তিনি বাবাকে এই ঘরে থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
এই প্লটের পূর্বদিকে যে প্লট, যেটায় এখন একটা ব্যাঙ্ক সেই প্লটে তখন বাড়িটার থেমে থেমে নির্মাণ কার্য চলছিল। বাবার কাজ ছিল এই প্লটে থেকে সেই প্লটের ইট, বালি পাথর সিমেন্ট বাঁশকাঠ সব পাহারা দিয়ে রাখা। এর জন্য তাকে মাসে পনের টাকা দেওয়া হতো।
