বিদায় নবাব বাদশা বাইজি নর্তকী আমীর ওমরাহ গলজ ঠুংরির স্বনামধন্য শহর লক্ষ্ণৌ। কত ইতিহাস ইতিকথা কত গল্প গাথা কিংবদন্তী ছড়িয়ে আছে তোমার পথে পথে ধুলিকণায়। ক্ষুধার্ত এক কিশোরের তার কিছুই শোনা হল না। দেখা হল না। চলে যেতে হবে এবার এখান থেকে।
মনের মধ্যে যখন বিল্টুদায়ের ঘন্টা বাজতে শুরু করেছে তখন সেই ঘন্টায় একটা নাড়া দিয়ে দেয় ঠিকেদার, তোমার অবস্থা বুঝে, সবদিক ভেবে দেখে বলছি, তোমার এখান থেকে চলে যাওয়াই উচিৎ হবে। তবে হ্যাঁ, যদি কানপুরে যাও, ওখানেও আমার ঠিকা নেওয়া আছে। সেখানে কাজে লাগিয়ে দিতে পারি। তাহলে আর তোমার পয়সা হাবিলদার নিয়ে নিতে পারবে না। যাবে?
রাতটা ঠিকেদারের বাড়ির নিচের তলায় একটা ঘরে কাটিয়ে সূর্য ওঠার আগেই রওনা দিল কানপুর। কানপুরের কাজ দেখা শোনা করা মুনশি এসেছিল পেমেন্ট নিয়ে যাবার জন্য। সকাল আটটার আগে পৌঁছে তাকে মজুর কাজে লাগাতে হবে। তাই তাড়াহুড়ো।
কানপুর লক্ষ্ণৌ থেকে খুব একটা দুর নয়। দেড় দুঘন্টায় পৌঁছে যাওয়া গেল লোকো শেডে। এটা খুবই ছোট কারখানা। কাজও কম মজুরও কম। কিন্তু সেখানেও কি টিকতে পারল জীবন। এতো সেই জীবন যার পায়ের তলের ভূমি পিচ্ছল। অনবরত পিছলে পিছলে যায়। সে ভূমিতে স্থির দাঁড়াবে কি করে?
এখানে রান্না করে খাবার কোনো সুবিধা নেই। খেতে হবে হোটেলে। পঞ্চাশ টাকা মাস মাইনের লোক সারা মাস হোটেলে খেলে হাতে আর পয়সা থাকে কই? দু বেলা, মাত্র দু বেলা তাও কি পেট ভরে খাওয়া যায়? চারটে রুটি যার দাম আট আনা সাথে দু আনার ডাল, রাতটা তো দশ আনায় চলে যায় কিন্তু দুপুর এক টাকায় চলে না। কম পক্ষে আটটা রুটি চার আনার তরকারি দরকার।
ইঞ্জিন থেকে যে ছাই ঢালা হয় তাতে আগুন থাকে। আগুন নেভাবার জন্য ঢালা হয় জল। সেই জলে ভেজা ছাই এক ঝুড়ির ওজন চল্লিশ পঞ্চাশ কিলোর কম নয়। সারা দিন ধরে সেই ঝুড়ি মাথায় করে বয়ে পেটে যেন আগুন জ্বলে। সেই আগুনে পাতলা আটটা দশটা রুটি দহন হতে কতক্ষণ। লক্ষ্ণৌয়ে যে পোড়া কলার উপরি রোজগার ছিল এখানে তা নেই। অন্য মজুরদের বাড়ির লোকরা তা আগে ভাগে বেছে নিয়ে চলে যায়। ঝুড়ি বওয়া থেকে ফুরসত মিললে তবে তো জীবন তা বাছাই করবে। তার আগেই তো সব হাওয়া।
লক্ষ্ণৌয়ের সহকর্মীরা বাচ্চা বলে জীবনকে কিছু রাহত দিত। কিন্তু কানপুরের সঙ্গীরা তেমন নয়। তারা উড়ে এসে জুড়ে বসা জীবনকে ঠিকেদারের চামচা ভেবে ঝুড়িতে যথেচ্ছো বোঝ চাপিয়ে তুলে দেয় তার মাথায়। ছাইয়ে ঢালা জল বেলচা করে তুলে দেয় ঝুড়িতে। সে জল চুঁইয়ে গায়ে মাথায় পড়ে জীবনের। ভিজে ভূত হয়ে যায়। কতদিন সে এই অত্যাচার সয়ে টিকতে পারে? যেন সেই পরীক্ষায় মেতে ওঠে সাত সহকর্মী মজুর ভাই।
এক মাস টেকে জীবন। তবে তার জন্য সহকর্মীদের ব্যবহারই একমাত্র দায়ী নয়। শীতও বেশ কিছু দায়ী। প্রকৃতির নিয়মানুসারে সে তখন বেশ জাঁকিয়ে নেমেছে। উত্তর প্রদেশকে ভালোমত কাঁপিয়ে প্রতিবছরের মত শীতেদুদশজনকে মেরে বাংলার দিকে যাবে। লক্ষ্ণৌয়ের মত কানপুরে জীবনের থাকার কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেই। তেমন কোন বিষয় ঠিকেদারের হাজার রকম চিন্তা করা মাথায় আসে নি। বড় মানুষের বড় ভাবনা থাকে। সেখানে এত তুচ্ছ জিনিস স্থান পায় না। প্রথম প্রথম দিন কয়েক কারখানায় একটা চালায় রাত কাটাতে খুব একটা অসুবিধা হয় নি। শীত বাড়ার সাথে সাথে অসুবিধা ঘটল। চারদিক ভোলা সে স্থান আর শীতের দাপটে বাসের উপযুক্ত রইল না।
তাই কাজ ছেড়ে আবার হাঁটা দেয় জীবন। তবে এবার আর তার আর্থিক ক্ষতি বিশেষ একটা হয়নি। পারিশ্রমিকের সবটা পেয়ে গিয়েছিলো। এবং তা খরচও হয়ে গিয়েছিলো সবটা।
***
০৩. পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে বাইরে বাইরে
মা বাবা ভাইবোন আত্মীয় পরিজন সবাইকে ছেড়ে এসেছি প্রায় পাঁচ বছর। পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ালাম যার মধ্যে দুবছর। দিনের পর দিন কিছু খাওয়া জোটেনি, চান হয়নি, ঘুম হয়নি। কখনও বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণের অপরাধে চেকারে ধরে নিয়ে গেছে, কখনও রেল পুলিশ চোর বলে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে দিয়েছে। এক দুবার দুর্ঘটনায় পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি। খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে একদিন একটা পাউরুটি চুরি করে নিয়েছিলাম এক দোকান থেকে। প্রখর রোদের তাপে ঝলসে গেছে শরীর, বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে কোথাও কোন ছাউনি না পেয়ে। শীতের কামড়ে কেঁপেছি আর কেঁদেছিসারারাত। এভাবেই চিনেছিহৃদয়হীন পৃথিবীটাকে। কে যেন বলে গেছেন পৃথিবীটা গোল। এর যেখান থেকে যাত্রা শুরু করা যাক অনবরত চলতে থাকলে একদিন সেইখানে এসে যাত্রা শেষ হবে যেখান থেকে একদিন শুরু করা হয়েছিল। আমিও তো এই নিয়মের অধীন। তাই একদিন স্পর্শ পেলাম পায়ের পাতায়–চেনা মাটির। গায়ে এসে লাগল সেই চেনা ফুরফুরে হাওয়া। কানে এসে বাজল আমরি বাংলা ভাষা।
.
আমি যেদিন কলকাতায় ফিরে এলাম সেটা ছিল ১৯৬৯ সালের গ্রীষ্মকালের সকাল। হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে শিয়ালদহ পর্যন্ত পায়ে হেঁটে আসতে হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে এই পথটুকুর ট্রামভাড়া ছিল আট নয়া পয়সা, বাসভাড়া দশ নয়া পয়সা। পাঁচ বছরের চেষ্টার পরেও আমার পকেটে ওইটুকু পয়সাও ছিল না। যেদিন গিয়েছিলাম তখনও ছিল খালি হাত, যখন ফিরলাম তখনও তাই।
