হাবিলদারের কোয়াটার থেকে স্টেশনের দিকে আসবার পথের ডান দিকে এই লোকো ওয়ার্কশপ। এই ঠিকেদারের অধীনে আরো কুড়ি পঁচিশজন মজুরের সাথে মিলে রেল লাইন থেকে ছাই সরিয়ে নিয়ে গাদায় গিয়ে ফেলা এই হচ্ছে কাজ। মাইনে তার মাসে পঞ্চাশ টাকা। যেদিন বাজে না যাবে মাইনে কাটা। নো ওয়ার্ক, নো পে। মাসে পঞ্চাশ অর্থাৎ দিনে এক টাকা দশ আনা। এত কম মজুরিতে কাজের লোক পাবার কথা নয়। পেয়ে যায় কারণ কাজের শেষে সব মজুর এক ঝুড়ি করে পোড়া কয়লা নিয়ে যেতে পারে। দয়া পরবশ হয়ে হাবিলদার তার জন্য উনুন চাটু তাওয়া বারান্দায় রেখে গেছে। বলে গেছে ঠিকেদারকে, দু একটাকা চাইলে যেন দেয়। হাবিলদার এক সপ্তাহের জন্য গ্রামে চলে গেল। অক্ষত রয়ে গেল তার পুরুষাঙ্গটি।
সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যে ছটা অবধি কাজ। একজন বেলচায় করে ছাই দিয়ে ঝুড়ি ভরে তুলে দেয় জীবনের মাথায়। সে নিয়ে গিয়ে দূরে ফেলে আসে। সন্ধ্যায় কয়লার ঝুড়ি পাড়ার দিকে নিয়ে যায়। কয়লা কেনার লোক প্রচুর। কয়লা বেচে পয়সা নিয়ে বাজার করে। নিজে রান্না করে। নিজে খায়। জীবনে পেট ভরে খাবার, আনন্দে থাকার সুযোগ খুব কম আসে। ভবিষ্যৎ কোন রূপ নিয়ে আসছে তা কে জানে। সাতটা দিন যখন পাওয়া গেল তাকে উপভোগ করে নেওয়া যাক। এমনই ভাবে জীবন।
সাত নয়, দশ দিন পরে পারিবারিক সমস্যা মিটিয়ে ফিরে এল হাবিলদার। তবে একা নয় এবার সাথে এসেছে তার বউ, মেয়ে। তারা এখানেই থাকবে এখন থেকে।
কে যেন বলেছে জীবনটা একটা নাটক পৃথিবীটা একটা রঙ্গমঞ্চ। হাবিলদার এখন পশুত্বকে লুকিয়ে রেখে ভাজা মাছ উল্টে খেতে না জানা পরম নিষ্ঠাবান পতিধর্ম নির্বাহ শুরু করল। তবে জীবনের জীবন যাত্রার কোন পরিবর্তন ঘটল না। নিজের বাজার নিজে করে নিজে খাওয়া চালু থাকল। হাবিলদার ঘরনির রাতের রান্না শেষ হলে সেই উনুনে কয়লা ঢেলে নিজের দুবেলার রান্না সেরে নেয় জীবন। তারপর রাতটুকুর জন্য পড়ে থাকে বারান্দার এক কোণে।
একদিক ভোলা ছোট্ট বারান্দা। উত্তর প্রদেশ হিমালয়ের কাছে বলে শীত এখানে বাংলার চেয়ে আগে আসে। একটু একটু শীত পড়া শুরু হয়ে গেছে। ভোরের দিকে হাত পা কালা হয়ে যায়। সে যা হোক আর যেমন হোক তবু একটা আস্তানা তো। নিয়মমত তার একটা ভাড়া নিশ্চয় হয়। জীবনের ভাড়া দেবার ক্ষমতা নেই। তাই হাবিলদারের হিসেবি স্ত্রী ভাড়ার বদলে বাসন মাজানো রান্না চানের জল বওয়ালে কাপ ছোপানো এসব ঘরের কাজ বিনা দ্বিধায় করিয়ে নেয়।
এইভাবে কেটে যায় এক মাস। এসে যায় বেতন পাবার দিন। মজুরদের সবার মনে উল্লাস। জীবনও ভাসছে আনন্দের জোয়ারে। আর কিছুক্ষণ পরে হাতে পাবে নগদ পঞ্চাশ টাকা। এতটাকা। সে, এমন কি তার বাপ ও এক সাথে কোনদিন হাতে ধরে দেখে নি। গামছাটা ছিঁড়ে ফর্দাফাই হয়ে গেছে। একটা নতুন গামছা কিনবে। অনেক দিন ভাত খায় নি। ভাত রান্নার কোন হাড়ি নেই। হোটেলে গিয়ে আজ ভাত খাবে। চারবাগের স্টেশনের কাছে একটা বাঙালী হোটেল আছে। বড় আশা বুকে নিয়ে বসে থাকে জীবন।
ঠিক চারটের সময় মাইনে দেওয়া শুরু হয়। একে একে সবার ডাক আসে। সবাই টাকা পেয়ে যায়। শুধু একা জীবনের ডাক আসে না। বিস্মিত জীবন ঠিকাদারকে বলে–কই সায়েব আমাকে তো টাকা দিলেন না।
ফরসা গোল মুখ মুসলমান ঠিকাদার। দেখে মনে হয় নবাব বাদশার রক্ত শরীরে আছে। শহরের মাঝখানে বিশাল বাড়ি। দু তিনটে বউ, সর্ব কনিষ্ঠ বউটার বয়েস নাকি বাইশ। বছর খানেক আগে বিয়ে করেছে।
বলে সে–তোমার টাকা তো তোমার হাতে দেওয়া যাবে না। হাবিলদার বারণ করে দিয়ে গেছে। তুমি তার বাসায় থাকো খাও। তোমার সাথে তার কি কথাবার্তা হিসাব নিকাশ আমি তো কিছুই জানি না। সে তোমাকে কাজে লাগিয়ে গেছে। বলতে গেলে তুমি তারই কাজ করছে। যা বলার তাকে বোলো।
বলে জীবন–তার বাসায় খাই সে খাবার আমি নিজে কিনে আনি, থাকি একটু তার জন্য বাসার সব কাজ করিয়ে নেয়। আপনারা যে কয়লা দ্যান মাঝে মাঝে তারও এক দু ঝুড়ি দিয়ে দিই।
সে তো আমি বলতে পারব না। তোমার আর তার ব্যাপার। আমি কোন ঝামেলায় জড়াতে চাইনা।
ইঁদুর কলে পড়ে গেছে জীবন। তাকে বিনাশ করার জন্য যেন বিশ্বজোড়া ফঁদ পাতা রয়েছে, অদৃশ্য সেই মাকড়শার জাল কেটে কোনভাবে বের হতে পারছে না। কেউ তাকে ত্রাণ দিতে অবতার হয়ে আসবে না। এখন কি করে সে? কি করে জীবন নামের এক হতভাগ্য?
বোঝে সে, এখানে কাজ করতে হলে থাকার জন্য হাবিলদারের বাসায় না গিয়ে কোন উপায় নেই। আর গেলেই তার মালিশ জল ভোলা বাসন মাজা, সব কাজ সিন্ধবাদের বোঝার মত ঘাড়ে চেপে বসবে। তার পর মাস গেলে নিজের মেহনতের মজুরিও হাতে পাবে না। হাবিলদারের মত নরাধমের কাছে কোন দয়া কৃপা পাবার আশা করা মানে মুখের স্বর্গে বাস। দেখে মনে হয় এই সব পাষণ্ডতে পৃথিবীটা ভরে গেছে। যারা গলা টিপে ধরে আছে জীবনদের মতো জীবনের।
বলে ঠিকেদার, আমি বুঝি না তেমন নয়। তুমি গরিব ঘরের ছেলে। দুটো পয়সার জন্য খাটতে এসেছ। কিন্তু আমার কিছু করার উপায় নেই। হাত পা বাধা। জলে বাস করে কি কুমীরের সাথে বিবাদ করে পারা যায়। তুমি তো জানো কাজের মজুরি বাবদ মজুররা কিছু পোড়া কয়লা নিয়ে যায়। সত্যি কথা বলতে কি, সেটা আইনসম্মত নয়। আইন হচ্ছে ওয়ার্কসপের ধুলোও নাইরে যাবে না। যদি আমি হাবিলদারের কথা না মানি, সে রেগে যাবে। আর তখন কয়লা নিয়ে যেতে দেবে না। সব বাজেয়াপ্ত করে নেবে। আগে কয়েকবার এমন হয়েছে। তাহলে মজুররা সব না খেয়ে মরবে। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে আমার কি হবে বলো।
