এক সময় সকাল হয়। হাবিলদারের কোয়াটার পশ্চিম মুখো। তার উঠোনে রোদ একটু বিলম্বে আসে। ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল জীবন। ঘুম থেকে উঠে দেখে হাবিলদার নেই। সে তার রোজকার রুটিন মর্নিং ওয়াকে গেছে। যে ওয়াক সারবার সময়ে জীবন তার সামনে পড়ে যায়।
জীবনের এখন নিজেকে ভীষণ ঘৃণা হয়। কান্না পায় তার। নিজেকে যেন অশুচি অপবিত্র নোংরা নদৰ্মার মতো মনে হয়। যে নর্দমায় লোকে প্রস্রাব করে। মনে হয় যেন তার সারা শরীর বেয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে সাদা সাদা পোকা। জ্যান্ত জীবনকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যেমন ভাবে লাশ গাদায় পড়ে থাকা বেওয়ারিশ লাশ খায়। মনে হয় যেন পাঁচিলের ও পারের সব মানুষ জেনে গেছে তার চূড়ান্ত হেনস্তার কথা। গেট খুলে বাইরে গেলেই সব চোখ কুঁচকে মুখ বাকিয়ে ব্যঙ্গ করে হেসে উঠবে–পোদু, ওই দ্যাখ যাচ্ছে, শালা একটা পোদু। হাবিলদার ওর পোদ মেরেছে।
শরীর জ্বলে যায় জীবনের। মনের মধ্যে মাথা নাড়ায় পোষ না মানা একটা বুনো মোষ। চোখা সিং দিয়ে গেঁথে দিতে চায় হারামী হাবিলদারটাকে। রক্তের লোহিত কণিকায় সেই পার্ক সার্কাস রাতের তুফান টের পায়। হাতটা নিস পিস করে তার। যে হাত শুঁকলে এখনো রক্তের ঘ্রাণ পায়। মানুষের রক্তের ঘ্রাণ।
ক্রোধ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। কিন্তু জীবন এত অন্ধ হয় নি যে তার বর্তমান অবস্থা অবস্থান বিস্মৃত হয়ে যায়। পরিণতি দেখতে না পায়।
আশি পঁচাশি কিলো ওজনের, ছয় ফুটের চেয়ে কিছু বেশি, মারপিট শেখা শরীর চর্চা করা সরকারি চাকুরে, যার সামনে পিছনে পাহাড়ের মত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মহাশক্তিধর ভারত রাষ্ট্রের তাবত আইন কানুন বিচার ব্যবস্থা। সব তাকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করবে। অন্য দিকে জন্ম জনিত কারণে অপরাধী দুঃস্থ দুর্বল এক সহায়হীন কিশোর। কি তার ক্ষমতা রাষ্ট্রীক এবং সামাজিক সুরক্ষা বর্ম ভেদ করে অপরাধীর কাছে পর্যন্ত পৌঁছায় এবং তার অপরাধের যোগ্য শাস্তি দেয়?
ইণ্ডিয়ান পেনাল কোড নামে, একখানা পুস্তকে লেখা আছে, যদি কোন পুরুষ দ্বারা কোন নারী ধর্ষিত হয়, ধর্ষণ প্রমাণিত হলে ধর্ষকের সর্বোচ্চ সাত বছর কারাবাস হতে পারে। আর যদি কোন পুরুষ কোন বালক বা কিশোরকে ধর্ষণ করে তার সাজা যাবজ্জীবন জেল। এ দেশে প্রতি চুয়ান্ন মিনিটে এক জন নারী ধর্ষিত হয়। অত না হলেও বালক কিশোর ধর্ষণের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। নারী ধর্ষকদের কালে ভদ্রে এক আধজনার সাজার কথা শোনা গেলেও বালক কিশোর এমন কি পশু ধর্ষক এক জনেরও কোন সাজা হয়েছে এমন কোন উদাহরণ নেই।
তাই এখন জীবন যতই মাথা খুড়ুক তার কোন ন্যায় বিচার হবে না। কে করবে সেই বিচার? যার গরু ধান খায় তার কাছে ক্ষেতের মালিক ন্যায় কি করে পাবে? কেউ কি পেয়েছে?
একটাই কাজ পারে জীবন। সেটা নিজের প্রতি ঘটা অপরাধের নিজে বিচার করে তার সাজা দেওয়া। রাতে হাবিলদার ঘুমিয়ে পড়লে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়া। খড়ের গাদায় সঁচ খুঁজলে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। কিন্তু বিশাল এই দেশের কোটি কোটি জনগণের মধ্যে থেকে নাম পরিচয় হীন এক বালককে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। মনে যে আগুন এখন জ্বলছে জীবনের, তাতে হাবিলদারকে পুড়িয়ে মারা তার পক্ষে কোন কঠিন কাজ নয়। তবে কঠিন সেটা করার জন্য দশ বিশ লিটার পেট্রোল বা কেরোসিন সংগ্রহ করা। এটা খড়ের ঘরতো নয় যে ফুলকিতে জতুগৃহ হয়ে যাবে।
তাহলে কি করা হবে। ছেড়ে দেওয়া হবে বদমাইশটাকে। এতবড় অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে? ভাবতে ভাবতে একটা পথ পেয়ে যায় জীবন। সেটা সস্তা নির্ভরযোগ্য এবং মোক্ষম। বারান্দার এক দিকে একটা তাক। যার উপর রাখা একটা ছোট আয়না যার পাশে একটা রেজার গোটা কয়েক নতুন ব্লেড। খুবই সাধারণ উপকরণ। এখানে হাবিলদার চান করে, মাথা আঁচড়ায়। দাড়ি কামায়। এখানকার একটা ধারালো ব্লেড জীবনের কাজে লাগতে পারে। মাত্র একটা পোঁচ পুরুষাঙ্গের গোড়ায়। একটা মাত্র পোঁচ।
জীবন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। কাল রাতের ঘটনা যা মনের উপর এতক্ষণ জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছিল তা নেমে যায়। যেন কিছু ঘটে নি। যা ঘটেছে তা এমন কিছু নয়। একটা আগাম প্রস্তুতির অভাব জনিত ভুল বোঝাবুঝি মাত্র। কিছুক্ষণ পরে হাবিলদার ফিরে আসে। সহজভাবে জীবন যা কাল করেছে সেই সব কাজ সম্পন্ন করে। উনুন ধরায় আটা মাখে রুটি বানায় চানের জল বয়ে আনে তেল মালিশ করে হাবিলদারের সারা অঙ্গে। কাল তেল মাখা হাত যেখানে যেতে থমকে যাচ্ছিল আজ অবলীলায় পৌঁছে যায়। হাবিলদার তৃপ্ত হয়। এই তো চাই। লৌণ্ডা ঠিক লাইনে এসে গেছে। লৌণ্ডা হিন্দিতে বহুল প্রচলিত একটা শব্দ। যার বাংলা অর্থ পোE। যার কাজ পায়ু মৈথুন করানো।
খুশি মনে হাবিলদার খেয়ে দেয়ে চলে যায়। আর জীবন একটা ব্লেড নিয়ে প্রতিক্ষায় বসে থাকে মধ্যরাতের।
ডান আর বা, সঠিক আর বেঠিক বলে কোন কিছু হয় না। যদি কেউ পর পর দুবার বা দিকে ঘোরে নিজের অজান্তে তার একটা ডান দিকের যাত্রা হয়ে যায়। ভাগ্য ভালো ছিল তাই সেদিন হাবিলদারের একটা সঠিক যাত্রা হয়ে গেল। স্টেশনস্থ জি.আর.পি. অফিসে গ্রামের বাড়ি থেকে খবর এসে পৌঁছাল, জলদি ঘর আ যা বেটা। সে ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা ছিল না হাবিলদারের। কারণ তার ছোট ভাই মেরে তার বাবার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। পুলিশের লোক, মারপিট খুন দাঙ্গায় খুব একটা বিচলিত হয় না। তবে এখানে ব্যাপারটা পারিবারিক বলে একটু যা কষ্টদায়ক হয়ে গেছে। তখুনি সে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা হয়ে যায়। তবে যাবার আগে জীবনকে রেলের ইঞ্জিন মেরামতির কারখানায় একটা কাজে লাগিয়ে রেখে যায়।
