রাত আটটাতেই ফিরে এসেছে হাবিলদার। জীবনকে দেখে একটু হাসি খেলে যায় তার মুখে আছিস! তালা খুলে ঘর থেকে আবার আটা ডাল আলু বের করে দেয় সে, খানা বানা। ও বেলার মত এ বেলাও রুটি ডাল আলু চচ্চরি বানায় জীবন। হাবিলদার নিজে হাতে খাবার নিয়ে যায়। যা সে রেখে দেয়, খায় জীবন। ততক্ষণে দশটা সাড়ে দশটা বেজে গেছে। একটা হাবিলদারের দেওয়া চাদর পেতে বারান্দায় শুয়ে পড়ে। ঘরের মধ্যে শুয়ে পড়ে হাবিলদার। শুয়ে পড়ে কিন্তু তার ঘুম আসে না। তারই ঘরের বারান্দায় তারই কবজায় এই রাত আঁধারে শুয়ে আছে একটা ষোল সতের বছরের তরতাজা ‘লোণ্ডা’। তাহলে কেমন করে তার ঘুম আসবে। বেশ কিছুক্ষণ উস পাশ করে দরজা খুলে বারান্দায় আসে। কোথায় কোন গাছের ডালে বাধা পাখির বাসায় ঘুমন্ত পাখি ছানার উপর ছোঃ মেরেছে আর কোন এক রাতচরা শিকারী পাখি। ভয়ে দুঃখে পাখি মা ডানা ঝাঁপটাচ্ছে, কর্কশ চিৎকারে কাঁদছে। রাত্রির নৈশব্দতা ছিঁড়ে তার কান্না কাতর আর্তনাদ ছড়িয়ে যাচ্ছে চারধারে।
সে রাত বড় বিভৎস কালো কদাকার রাত। পৃথিবী মনে হয় তার আবর্তন গতি পথ বদলে ফেলেছিল। বিবর্তন হাটা দিয়ে ছিল উল্টো মুখো। প্রকৃতির সব নিয়ম নীতি, বহু কষ্টে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা মানব সভ্যতা, কৃষ্টি সংস্কৃতি সব বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। মানুষ হয়ে ওঠার গর্ব করা এক জানোয়ার পৌঁছে গিয়েছিল সেই ভূমিকায় যা দেখে জানোয়ারও ঘৃণায় থুতু ফেলে।
হাবিলদার জীবনকে দেখে। তাকে ঘিরে আছে ঘন অন্ধকার। অন্ধকার যা আলোর বিপরীতে অবস্থান করে। আলো মানে দীপ্তি প্রভা জ্যোতি কিরণ। আলো মানে সূর্য আলো মানে সত্য। আর অন্ধকারের অর্থ শুধু অন্ধকার। ঘন কালো নিস্তব্ধ। সে অন্ধকারের গর্ভগৃহে বাস করে পাপ অন্যায় অবিচার ব্যাভিচার অত্যাচার। যে অন্ধকার ঢেকে রাখতে পারে শয়তানদের আসল অবয়ব। বড়ই সুবর্ণ সুযোগ এখন। হাবিলদার এক ক্ষুধার্ত হায়নার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে নধর হরিণ শাবক তুল্য নিরাশ্রয় নিঃসহায় জীবনের উপর। সে বাধা দিতে পারে না, শরীরে তত শক্তি নেই। চিৎকার করতে পারে না, কারণ গলার উপর একটা সবল হাত। সাথে ধমক, মাত চিল্লানা। নেহী তো গলা ঘোট দুঙ্গা। বাধ্য হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে হাবিলদারের গলগল করে ঢেলে দেওয়া আঠালো অপমান অনাচার অত্যাচার মাখে শরীর ময়। শিবপুরের মেসে, কার্শিয়াংয়ের ট্রেনের কামরায় নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিল জীবন। কিন্তু এখন যাদের হাতে দেশের আইন শৃঙ্খলা নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষার ভার, সেই রক্ষকের তমঃপ্রবৃত্তি থেকে সে নিজেকে বাঁচাতে পারল না। মানব ধর্ম থেকে, পুরুষ ধর্ম থেকে, পুলিশ ধর্ম থেকে বিচ্যুত এক পাষণ্ড ধর্ষণ করল তাকে। তার আত্মা স্বাভিমান অস্মিতাকে।
কতক্ষণ চলে ছিল পায়ুদেশে সেই রবার পিষ্টকের ওঠা নামা। কত কষ্ট হয়েছিল জীবনের। ক ফোঁটা রক্ত ঝরে ছিল শরীর থেকে। সারা জীবন যত কষ্ট যত অপমান সয়েছে জীবন সে তুলনায় এ আর কতটুকু। কিন্তু মনে হয় জীবনের আজকের এই ঘটনা, এই গ্লানি অসম্মান, এর চেয়ে বড় আগে আর কিছু ঘটে নি। পরেও ঘটবে না। এই ঘটনা, যদি সে বেঁচে থাকে, সারা জীবন মনন চিন্তনকে প্রভাবিত করে দেবে। মানুষ আর তার মানসিকতা সম্বন্ধে অন্য কিছু ভাবতে শেখাবে।
ধর্ষণ এমন একটা বিভৎস ক্রিয়া যা শোনা মাত্র যে কোন সাধারণ মানুষ বিচলিত হয়ে ওঠে। ধর্ষণ এমন একটা পাশবিক ঘটনা, যা যার উপর তা ঘটে যায়, নিজের কাছে সমাজের কাছে তার মান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। জীবন তখন মৃত্যুর চেয়ে ভারী, কষ্টদায়ক হয়ে যায়। প্রচলিত ধারণায় ধর্ষণ ব্যাপারটা সব সময় সংঘটিত হয় কামুক পুরুষ দ্বারা কোন দুর্বল অসুরক্ষিত মহিলার উপর।কিন্তু মহিলা দ্বারা পুরুষ, মহিলা দ্বারা মহিলা, পুরুষ দ্বারা পুরুষ ধর্ষণের ঘটনা সাধারণের ধারণায় তত পরিষ্কার উদ্বেগ উদ্রেককারী কোন বিরাট বিষয় নয়। এ সব বিশ্বাস করে নিতেও তাদের কষ্ট হবে। কিন্তু সত্য ঘটনা হচ্ছে সমকামী বিকৃতকামী দ্বারা সমাজে এসব ঘটনা অনবরত ঘটে চলেছে। মানুষ তো তুচ্ছ, মানুষ কুকুর গরুকেও রেহাই দেয় না।
মনে আছে জীবনের এমন একটা ঘটনার কথা। যা সংঘটিত হয়েছিল শিবপুর পুলিশ লাইনে। ফুটবল খেলা, প্যারেড করা ফাঁকা মাঠে রাত আটটা নটার সময়ে এক যুবতী কুকুর দেখে কাম মোহিত হয়ে একজন তাকে ধর্ষণ করে দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা গোপন থাকে নি। কেউ একজন দেখে সেটা প্রকাশ করে দেয়। সেটা বহুদিন মানুষের কাছে একটা আলোচনার বিষয় হয়েছিল মাত্র তার বেশি আর কিছু নয়।
যদি কোন পুরুষ দ্বারা কোন মহিলা ধর্ষিত হয় ধর্ষকের প্রতি মানুষ ফেটে পড়ে ক্রোধে, আর ধর্ষিতার প্রতি সহানুভূতিতে। কিন্তু যদি কোন বালক বা কিশোর ধর্ষিত হয়, তার ভাগ্যে জোটে সামাজিক উপহাস। কেউ উপহাসের পাত্র হতে চায় না। তাই অধিকাংশ ঘটনা থেকে যায় অপ্রকাশিত গোপন গুপ্ত। জীবনও আশা করছে না কারও কোন সাহায্য সহানুভূতি পাবার। এ বড় বিপন্ন সময়। এ সময়ে কে কার? কে যাবে এক ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা আজব এক জীবের জন্য পুলিশ হাবিলদারের বিরুদ্ধে পুলিশ বিভাগে নালিশ জানিয়ে পুলিশের ক্রোধের কারণ হতে? কেন যাবে?
