খানা বানানে আতা হ্যায়?
আতা হ্যায়। বলে জীবন, আমি সব রান্না পারি।
চল মেরা সাথ।
যার ক্যানসার রোগ হয় তার অন্যরোগ হবার দরকার নেই। যাকে পুলিশে ধরে ফেলেছে, চেকারে কি করবে! গেট ছেড়ে সরে দাঁড়ায় গেট কীপার দু’জন। জীবনের হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিয়ে একটা রিকশায় তোলে হাবিলদার। পঞ্চাশ পয়সা ভাড়া পথ পার হয়ে মিনিট কুড়ি বাদেশহরের শেষ সীমায়–যার ও পাশে মাঠ রেল লাইন সেখানে এক রেল কোয়াটারের সামনে এসে রিকশা থামে। হাবিলদার রিকশা থেকে নেমে পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খোলে। কোয়াটারে আর অন্য কোনও লোক থাকে কিনা তার কোন চিহ্ন নেই। আসবাব পত্র তেমন কিছু নেই ঘরে। দুঘরে দুটো দড়ির খাঁটিয়া। টাঙানো দড়িতে গামছা লুঙ্গি আর দু’তিনটে পুলিশের পোষাক। একটা টিনে কিছু আটা। মেঝেয় গড়াচ্ছে কটা আলু পেঁয়াজ। একটা শিশিতে সরসের তেল, কিছু মশলা। ঘরের এক কোণে কটা থালা। দুটো বালতি। আর বারান্দায় একটা কয়লার উনুন, যার সামনে কিছু কাঠ কুঁচো কয়লা। একটা বড় ড্রাম।
বলে হাবিলদার, “চুল্লা জ্বালানে আঁতা?”
“আঁতা।” বলে জীবন।
“তো চুল্লা জ্বালাকে আটা সান।”
হাবিলদার জামা প্যান্ট খুলে আণ্ডার ওয়ার পরা অবস্থায় একটা দড়ির খাঁটিয়ায় বসে পড়ে। হাত পা বুক সব লোমশ। বুকের এক পাশে উল্কিতে হনুমান আঁকা। গায়ে ঘাম। যা থেকে ছড়াচ্ছে। একটা বোটকা গন্ধ। যেমন গন্ধ বুড়ো পাঠার গায়ে থাকে। তাই
জীবন রান্না করতে জানে। গৌহাটিতে খুব বানিয়েছে। সে আটা মেখে রুটি বানায়। আলু চচ্চড়ি, আর রসুন ফোড়ন দিয়ে অড়হর ডাল রাঁধে।কটা রুটি কতটা ডাল রান্না হবে তা মেপে দেয় হাবিলদার। রান্না শেষ হবার পর জীবনকে বলে সে, “কাটোরামে থোরা তেল লে আ এবং সে বারান্দার এক পাশে হাত পা ছড়িয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে। তেল নিয়ে যাবার পর জীবনকে বলে–চল আব মালিশ লাগা।”
পেটে এক সমুদ্র খিদে। নাকে এসে ধাক্কা মারছে রসুন ডালের হত্যাকারী গন্ধ। পেটের শুকনো সমুদ্রে সাইক্লোন উঠছে উত্তাল হয়ে। এ বড় ভয়ংকর সময়। এ সময়ে অবাধ্য হওয়া চলে না। জীবন মালিশ শুরু করে দেয়। প্রথমে হাত তার পর পা তারপর পিঠ তারপর মাথা তারপর আর যা যা বাকি থাকে, সব হায়া বর্জন করে সর্বত্র ছোঁড়া হাতের নরম মালিশ গ্রহণ করে হাবিলদার। আ হা কি আরাম, কি আনন্দ। নরম আঙুল স্পর্শে শরীর যেন শিউরে উঠছিল। প্রায় দেড় দু’ঘন্টা ধরে প্রায় পঞ্চাশ গ্রাম তেল দিয়ে সারা শরীর মালিশ করানোয় এখন শরীরটা বেশ ঝরঝরে হয়ে গেছে হাবিলদারের। এবার চান করতে হবে। তাই জীবনকে এর পরের কাজটা বলে।
“রাস্তামে নিকালকে সোজা বায়ে তরফ যানা। সামনে কুঁয়া মিলেগা। উহাসে পানী লা।” কুয়া থেকে বালতি ভরে জল এনে একটা ড্রামে ভরে জীবন। তিনবারে আনা ছয় বালতি জলে ড্রাম ভর্তি হয়ে যায়। তখন সেই জলে অনেকক্ষণ ধরে চান করে চুল আঁচড়ে খেতে বসে হাবিলদার। আটা সে মেপে দিয়েছিল। কটা রুটি হয়েছে তা তার জানা। চারটে নিজে খেয়ে দুটো জীবনের জন্য রেখে মুখ হাত ধুয়ে খাঁটিয়ায় গিয়ে বসে খইনি ডলে। খইনি মুখে রেখে থুতু ফেলে বলে জীবনকে–যা নাহাকে রুটি খালে। জলদি কর।
জল কিছুটা ড্রামে ছিলো। সেটুকু গায়ে ঢেলে রুটি ডাল আলু চচ্চড়ি যতটুকু তারজন্য রাখা হয়েছিল খেয়ে বাসন পত্র সব মেজে ধুয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দেয় জীবন। তখন বড় দুটো পেতলের তালা দরজায় লাগিয়ে পোষাক পড়ে ডিউটিতে চলে যায় হাবিলদার। বলে যায়–বারান্দায় বসে থাকিস। আমি আটটার মধ্যে এসে পড়ব।
বেশ কয়েকদিন চান খাওয়া ঘুম কিছুই ছিল না। আজ চান করে যা হোক একটু পেটে দেওয়ার শরীর এলিয়ে আসে জীবনের। বারান্দায় ঝাট দিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সে এমন ঘুম কোথা দিয়ে যে সারা দিন কেটে যায় টেরই পায় না। ঘুম ভাঙে সন্ধেবেলায় বাচ্চাদের কিচির মিচির শব্দে। এই জায়গাটা রেলের। তার কর্মচারীদের থাকার জন্য পঞ্চাশ ষাটটা কোয়াটার বানিয়ে রেখেছে রেল কোম্পানী। একটা ছোট মাঠের চারপাশ ঘিরে এ সব কোয়াটার। যার সামনে ছয় সাত ফুট উঁচু প্রাচীর। প্রাচীরের গেটে লোহার দরজা। এখন সব কোয়াটারের সব লোহার দরজা খুলে মাঠে নেমে এসেছে বাচ্চারা। ঘুম থেকে উঠে হাবিলদারের দরজার সামনে বসে বাচ্চাদের হাসি খেলা হুল্লোড় দেখে মনটা ভরে ওঠে জীবনের। ভরে ওঠে বেদনার অশ্রু জলে। তারও একটা বাল্যকাল ছিল। কথা ছিল তারও এমনি খেলায় মেতে ওঠার, হেসে ওঠার। কিন্তু তা পারেনি। তার হাসি আনন্দ খেলা কাদের যেন চক্রান্তে চুরি হয়ে গিয়েছিল। এই সব শিশুদের বাপ দাদা কেউ না কেউ সরকারি কর্মচারী। সরকার দায়িত্ব নিয়েছে তাদের অন্নবস্ত্র সুখসুবিধার।তাই তাদের সন্তানরা হেসে খেলে খেয়ে মেখে বড় হচ্ছে। সরকারি কর্মচারী মানে সরকারের পোষ্য পুত্র। বেতন পাবে ঘুষও খাবে, ইচ্ছা না হলে কাজও করার দরকার নেই। বড় সুখের চাকরি, বড় সুখের জীবন। তাদের শিশুরাও সুখের রোজগারে সুখে মানুষ হচ্ছে। ওরা হাসবে না তো কারা হাসবে।
বাচ্চাদের খেলা শেষ হয়। দূরের এক মসজিদ থেকে মাইক মারফত ভেসে আসে আজানের সুর। সেই পবিত্র প্রদোষকালের পিছন পিছন এসে যায় অমাবস্যার আলকাতরা কালো ভয়ানক নিশিতপ্রিয় পিশাচরাত।
