সেদিন সারা দিন সারা রাত আর কোন চেকার পুলিশ কারো সাথেই তার দেখা সাক্ষাৎ হলো না। নিঝঞ্ঝাটে অবশেষ শেষ হলে বাংলা থেকে বিহারের মধ্যে দিয়ে উত্তরপ্রদেশ পর্যন্ত পৌঁছাবার নিখরচার দীর্ঘ যাত্রা। ট্রেন এসে থামল লক্ষ্ণৌয়ের চার বাগ স্টেশনে। সময় তখন সকাল সাতটা। বাতাসে একটু শীত শীত ভাব। ট্রেন থেকে নেমে শতশত যাত্রীর সাথে মিশে যেন মিছিল করে গেটের দিকে আগাল জীবন। গেট পার হতে পারলেই পাওয়া যাবে স্বাধীনতা, ভয় থেকে মুক্তি। গেটের ও পারেই আছে উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লক্ষ্ণৌ শহরের মাটি, পথ মানুষ। লক্ষ্ণৌ সেই অতীত কালের নবাব বাদশা গজল ঠুংরি বাইজি নর্তকী প্রসাদ ইমারতের শহর। শরীরের অবস্থা বিশেষ সুবিধার নয়। একে আর দানাপানী না দিয়ে বেশি দূর টেনে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তাই কটা দিন এখানে থাকতে হবে জীবনের। কিছু খাবারের জোগাড় করতে হবে। তারপর আবার যাত্রা শুরু করবে।
গেটের দুদিকে দাঁড়িয়ে আছে কালো কোট পড়া দুজন চেকার। তারা একে একে যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা করে যেতে দিচ্ছে গেটের বাইরে। জীবনের টিকিট নেই। কিন্তু সে নিয়ে কোন ভাবনাও নাই তার। কি করবে চেকার! কী করারই ক্ষমতা আছে তার? হয় সে ধরবে নয় ধরবে না। ধরলে হয় জেলে দেবে নয় ছেড়ে দেবে। এদের যেটাই করার জীবনের তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি নাই। সে সহজ পায়ে সামনের দিকে আগায়।
কিন্তু সেদিকে আর যেতে পারল না। গেট তখনো কুড়ি পঁচিশ ফুট দুর। কর্কশ গম্ভীর এক গলার আওয়াজে পা থেমে গেল–এই রোখ, চেকার নয় তাকে ধরে ফেলেছে জি.আর.পিবিভাগের এক হাবিলদার। মাঝবয়েসী, মোটা গোঁফ মোটা শরীর চোখে কালো চশমা হাতে বেতের লাঠি খাকি হাফ প্যান্ট পায়ে বুট। তবে গায়ে সাদা জামা। লোকটাকে দেখে জীবনের বুনো শুয়োর উপমাটা মনে পড়ে যায়। পথ আগলে দাঁড়িয়ে ঘোঁত ঘোত করে বলে সে–কাহা যায়েগা?
বড় লালের দোকানে অনেক দিন থাকার কারণে হিন্দিটা বুঝতে ওর বিশেষ অসুবিধা হয় না। অসুবিধা হয় বলার বেলায়। জীবন তার বাঙাল টান যুক্ত হিন্দিতে হাবিলদারের কথার জবাবে বলে–ওই দিক যায়েগা। গেটের বাইরের দিক।
কাহা সে আয়া?
কলকাতা, অতদূর বলাটা কি ঠিক হবে! অতদুর থেকে বিনা টিকিটে এসেছে তা নিজেই স্বীকার করে নিলে জেল জরিমানাও তো সেই রকম হবে। তার চেয়ে একটু কম বলা যাক। দিন ছয় সাত যাতে জেল হয়। বলে জীবন, গোরখপুর থিকা আয়া।
গোরখপুর মানে লক্ষ্ণৌ থেকে কুড়ি বাইশ ঘণ্টার পথ। তাই শুনে হাবিলদার চমকে যায়। এ কাহা আয়া মালুম হ্যায়?
হাঁ হয়, এ লক্ষ্ণৌ।
কিউ আয়া?
কিউ মানে কেন। কেন জীবন গোরক্ষপুর থেকে লক্ষৌ এসেছে তা জানতে চায় হাবিলদার। বুঝতে চায় কোনও অপকর্ম করে পালিয়েছে কিনা। কিন্তু এখন জীবন কি বলে। কি বলে পুলিশ লোকটাকে বিশ্বাস করাবে সে সত্য বলেছে। সদা সত্য কথা বলিবে। সতমেব জয়তে। এ সব কথা বলতে বা শুনতে যতটা মধুর হোক আসলে তা মোটেই মধুর নয়। বাস্তব সত্য এই যে, সব সময় সত্য কথা চলে না। সময় বিশেষে সত্যটাই চরম মিথ্যা হয়ে যায়। সেটা জীবন এই ছোট্টবয়েসে হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছ। যদি সে বিনোদ সাহাকে কলকাতার কথা না বলে নিউ জলপাইগুড়ি বা আশেপাশের কোন ঠিকানা বলতে পারতো তবে কী ওরকম নির্ভয়ে টাকাগুলো মেরে দেবার সাহস পেতো?
তবে সে যা হোক, এখন এই চরম সন্ধিক্ষণে হাবিলদারকে যদি বলে জীবন–আমি খুব গরিব তাই বিশ্বের বৃহত্তমের তালিকায় নাম থাকা শহর কলকাতা থেকে লক্ষ্ণৌ শহরের এক দোকানে কাজ করতে এসেছি–সেটা আর যার কাছে হোক বা না হোক দিন রাত চোর ছ্যাচোর ধরা এক পুলিশের কাছে সত্য হবে না। তাই বাধ্য হয়ে জীবন এখন একটা সত্যকে বিনির্মাণ করে। সব কিছুর মতো সত্যকেও নির্মাণ ও প্রাণ দান করা যায়। রবারের মতো বিস্তার সংকোচনও করা চলে। সেই জন্যই তো একজন পুরুলেছেন–রায়ে জন্মভূমি অযযাধ্যার চেয়ে কবির মনোভূমি অনেক বড়।কবি হোক বা কথকতার উপস্থাপনাটাই হচ্ছে আসল জিনিস। তার রচনাকৃত কৌশলে মিথ্যাটা সত্যি সত্যিটা মহা সত্যি হয়ে যায়।
চোখে এক ফোঁটা জল এনে বলে জীবন, “হামলোক রিফুজি। পূর্ব পাকিস্তানে যে রায়ট হইলো তাই তে আমরা ঘরবাড়ি, জমি জাগা গোলা ভরা ধান পুকুর ভরা মাছ বেবাক ফালাইয়া এই পারে পরাণ লইয়া পালাইয়া আইছি। সরকার আমাগো থাকতে দিছিলো ক্যাম্পে। সেইখান থিকা টেরেনে কইরা নিয়া যাইতে আছিলো দণ্ডকারণ্য। বাপ মায় ভাই বইন তাগো লগে আমিও যাইতে আছিলাম। পথে এক ইস্টাশনে টেরেন থামলে মায় আমারে কয়, খোকা এটু খাবার জল নিয়া আয়। মার কথায় আমি গেছি জল আনতে। এদিকে টেরেন ছাইড়া দেছে। আমি আর উঠতে পারলাম না। মায় বাপ ভাই বোন সব হারাইয়া গেল।”
হাতের চেটোয় চোখ মুছে বলে জীবন–”হাম তো নেহি জানতে হ্যায় দণ্ডাকারণ্য কোন দিকে। একজন বলা হ্যায়, সেটা নাকি লক্ষৌয়ের কাছে। সেই শুইনা মায় বাপরে খোঁজতে হাম হিয়াপর আয়া। আপনি কি কইতে পারেন দণ্ডকারণ্য কোথায়?”
মাথা নাড়ে হাবিলদার। সে জানে না। দুশ্চিন্তায় কালো হয় জীবনের কাঁদো কাঁদো মুখ, “আপনি জানেন না কেউ জানেনা, তাইলে আমি তাগো কেমন খুইজা পামু। এখন আমি বিদ্যাশ বিভুয়ে কি করমু। কি খাইয়া বাচমু! আচ্ছা আপনেরে দেইখ্যা তো ভালো মানুষ বইল্যা মোনে হয়। আমার এটা উপকার কইরা দিবেন। কোনো জাগায় আমারে এটা কামে লাগাইয়া দিবেন। আমি খুব কাম করতে পারি।
