ঘোলাদোলতলায় থাকতে একবার জীবন একটা ভাঙা ছাতার শিক কুড়িয়ে পেয়ে তাকে পাথরে ঘষে ধার দিয়ে একটা বাঁশের লাঠির মাথায় বেঁধে মাছ মারা কোচ বানিয়েছিল। এর আগে সে কোনদিন কোচ বানায়নি, মাছও মারে নি। সে বিষয়ে বলতে গেলে কোন অভিজ্ঞতাই ছিলো না। শুধু তার এক দু’বার দেখাছিল কেমন করে লোকে ওটা বানায় ও মাছ মারে। সে শিক্ষা অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে সাইকেল চালাতে দেখা বা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে সাঁতার শেখার মতো শিক্ষা। তাই কোচ নিয়ে সারা দিন খালপাড় ধানক্ষেত ঘুরে বেড়িয়েও কোন ফল হল না। একটা মাছও গেঁথে তুলতে পারল না কোচে। মনের দুঃখ মনে চেপে ঘরে ফেরার সময় এ কোচ দিয়ে আর কি হবে’ ভেবে রাগে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল ধান ক্ষেতের দিকে। কিন্তু তখনই ঘটে গিয়েছিল এই আশ্চর্য ঘটনা। শত চেষ্টায় যা সে পারেনি, বিনা চেষ্টায় তাই ঘটেছিল। একটা শোল মাছের বাচ্চার পিঠে গেঁথে গিয়েছিল কোচের চোখা সিক। সে মাছের বাচ্চার বয়স চার পাঁচ দিনের বেশি নয়, লম্বা ইঞ্চি দেড়েক মাত্র। মনে হয় ঈশ্বর তার ভাগ্যে ওই রকমই মুক্তি নির্ধারিত করে রেখেছিল বলেই ওভাবে মারা পড়ল নাহলে তার মৃত্যুর আর কোনও ব্যাখ্যা হয় না।
.
আকাশের দিকে মুখ করে তীর ছুঁড়লে তা শিকারের গায়ে গিয়ে বেঁধে, অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়লে তা সঠিক স্থানে গিয়ে পড়ে, সে সব কখন? যখন কপাল ভালো থাকে। সবার নয় কারো কারো এভাবে কপাল ফিরেছে। জীবন এসব গভীর ভাবে ভেবে বুঝে অথবা কিছুই না ভেবে না বুঝে উঠে পড়ে লক্ষ্ণৌ মেলের তৃতীয় শ্রেণীর চামকাটা ভিড় কামরায়। শুরু হয় জীবনের খালি পেটে শুন্য ট্যাকে আড়াইদিন ব্যাপী আপাতঃ দৃষ্টিতে অনর্থক উদ্দেশ্যহীন আশা আশ্বাস ছাড়া এক দীর্ঘ রেল যাত্রা। চান নেই খাওয়া নেই ঘুম নেই শুধু চলা আর চলা। দিনের বেলা ট্রেনে তেমন একটা ভিড় থাকে না। রাত যত বাড়তে থাকে তত ভিড় গাদা মেরে যায়। কোন এক স্টেশনে যেন ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মে জল খেতে গিয়ে ভিড়ের কারণে কামরায় আর উঠতে পারল না। জীবন একা নয় তার মত অনেকেই পা রাখার জায়গা পায়নি কোথাও। তখন সবাই মিলে প্রাণ হাতে করে গিয়ে বসেছিল দুটো কামরাকে পরস্পরের সাথে জুড়ে রাখা লোহার শিকলের উপর। কয়লাচালিত ইঞ্জিন থেকে ভকভক ধোঁয়ার সাথে গরম কয়লার কুচি, আগুনের ফুলকি উড়ে উড়ে এসে পড়ছিল মুখে মাথায় চুলে। ধুলো মাখা জট বাধা চুলে সে কুচি আটকে যাচ্ছিল। পোড়াচ্ছিল চামড়া! উপায় ছিল না পোড়া থেকে নিস্তারের। হাত দিয়ে আগুন আটকাতে গেলে সার্কাসের তারের মত শিকল থেকে নিচের রেল লাইনের উপর পড়ে যাবার ভয় ছিল।
এই দীর্ঘ যাত্রা পথে একবার টিকিট চেকারের সামনে পড়ে জীবন। বেলা তখন নয় কী দশটা। দাড়িওলা বৃদ্ধ এক চেকার কোথায় কোন স্টেশন থেকে যেন উঠে পড়ে ট্রেনের কামরায়। একদিক থেকে টিকিট পরীক্ষা করতে করতে এসে যায় জীবনের সামনে। তারপর হাত বাড়ায়–টিকিট। এই প্রশ্নের একটাই জবাব জানা আছে জীবনের–নেই। তখন চেকার লোকটি নরম গলায় জানতে যায়–কাহা যায়ে গা?
জীবন যেখানে যাবে বলে ট্রেনে চেপেছে সে নামটা তো জানে। কিন্তু এখন সে নাম না বলে শুধু বলে–যায়েগা বহুতদূর। বৃদ্ধ চেকার কানে একটু কম শোনে। ট্রেনের আওয়াজ তা ছাড়া জীবনের না খাওয়া গলায় ফ্যাঁস ফ্যাসে আওয়াজে অন্য কিছু শোনে–ক্যা বোলা? কাহা যায়ে গা? গোরক্ষপুর? গোরক্ষপুর বহুদূর।
লোকটাকে দেখে মনে হয় জীবনের এর একটু দয়া মায়া থাকলেও থাকতে পারে। নিজের কষ্টের কথা একে বলে একটু সাহায্য ভিক্ষা করা যেতে পারে। অনেকগুলো দিন পেটে কিছু পড়েনি। খিদেয় শরীর কাহিল। একে বললে এ নিশ্চয় তাকে দিন কয়েকের জন্য জেলে নিয়ে যেতে পারবে। বলে গেছে রাজা জেলখানায় খাবার পাওয়া যায়। কিছু খেতে হলে এখন জেলে যাওয়াটা জরুরি। লক্ষ্ণৌ এখনো কত পথ তা কে জানে। আর গেলেই যে কেউ খাবারের থালা এগিয়ে দেবে তাও তো নয়। যদি এখানে খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যায় দু’চারদিন বিশ্রাম নিয়ে ফের যাত্রা শুরু করায় খুব একটা ক্ষতির কিছু নেই।
সে একটু এগিয়ে যাওয়া চেকারের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে–আমার টিকিট নাই। মানে হাম বেটিকিট।
ঘাড় ঘুরিয়ে জীবনকে দেখে বলে চেকার–ও তো পহেলে বোল দিয়া ক্যা! ফির ক্যা?
হাম এহি বোলতা হ্যায় যে আপনি কী আমাকে ধরে নিয়ে যাইতে পারতা হ্যায়।
কিউ?
এতক্ষণের বৃদ্ধ নরম চেহারার চেকার লোকটার চোখ লাল চেহারা রাগী রাগী হয়ে ওঠে। সেই রাগ গলায় ঢেলে বলে সে–যাঃ ওই কোণায় গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক। ধরে নিয়ে যাব! শালা যাদের ক্ষমতা আছে টিকিট কাটার তারাই কাটে না। তাদের ধরতে পারি না, একা কী করব। সাথ ফোর্স দিক। তা তত দেবে না। মরব নাকি ডিউটি করতে গিয়ে? তুই তো বেচারা গরিব। দেখলেই বোঝা যায়, খাওয়া জোটে না। তোকে ধরে কি হবে। ধরব না! যা বস গিয়ে ওদিকে।
জীবনের সবিনয় নিবেদনে নরম লোকটা রেগে তো গেছে কিন্তু এমন রাগ নয় যাতে জীবনের লাভ হয়। পরের স্টেশনে চেকার নেমে যাবার আগে জীবনকে আশ্বস্ত করে যায়–মেরা ডিউটি গোরক্ষপুর তক। যা বেটা কোই ডর নেহী।
