এমন আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না জীবন। ভয়ে, আত্মরক্ষার তাড়নায়, ঘৃণায় ক্রোধে তার ডান পাটা ছুটে গেল। সেটা যেখানে গিয়ে লাগল দুর্ভাগ্যবশতঃ সেখানেই লোকটার অণ্ডকোষ ঝুলছিল। পুরুষশরীরের এটা এমন এক দুর্বলতম স্থান যেখানে লাথি তো অনেক বড়ো জিনিস, সামান্য টোকা পড়লেও অতিবড় পালোয়ান বাপ বলে শুয়ে পড়ে। ছিটকে পড়ল লোকটা। তার গলা থেকে তখন যে আওয়াজ বের হল তাকে কাতরানো, আর্তনাদ গোঙানী যা হোক একটার সাথে তুলনা করা যায়। সেই আওয়াজ না জীবনের ভারাক্রান্ত কান্না কে জানে, কি শুনে যেন প্লাটফর্মের পাশের জিপ স্ট্যান্ডে থেকে দুজন লোক ছুটে এল। কোন পাশের দরজা খোলা থাকে তা তারা মনে হয় জানে। সেই দরজা দিয়ে সোজা ট্রেনের কামরায় ঢুকে পড়ল। মাতাল লোকটা ওদের হয়তো চেনে, পরিচয় জানে। সে চেনা হয়তো সুখদায়ক কোন ঘটনার মধ্য দিয়ে হয়নি। সে-ক্যা শালে! ফির সে? মাত্র এইটুকু শুনে শরীরের কষ্ট শরীরে বয়ে ছুটে পালাল।
এরা সব জিপ গাড়ির চালক। যে পালিয়েছে এবং যারা দাঁড়িয়ে আছে তিনজনই হিন্দিভাষী। নাক ছোট চোখ গোল চেহারাও নেপালিদের মতো ফর্সা নয়। একজন জীবনের দিকে তাকিয়ে পালিশহীন গলায় বলে, কৌন হ্যায় রে তু?
জীবন এখনো যথেষ্ট ভীত। সেই ভীতি জড়ানো, ক্ষুধায় আধবোজা গলায় সে তার এখানে আসার কার্যকারণ সংক্ষেপে বলে দেয়। দুজনার মধ্যে যার চেহারা একটু লম্বা, বয়েস ত্রিশ বত্রিশ সে খসখসে গলায় যেন আদেশ করে, চল।
কোথায়?
মেরে সাথ।
কেন?
নেহী তো জার মে মর জায়েগা।
জিপ চালক লোকটা জীবনকে নিয়ে গিয়ে তার জিপের পিছনের সিটে শুইয়ে দেয়। গায়ে দেবার জন্য দেয় একটা ছেঁড়া কোট। বলে, সুবে হোতে হি বাপস চলা যা। এহা কুছ নেহী মিলনে বালা। একদম ফালতু আয়া। তারপর সামনের সিটে শুয়ে পড়ে। পাহাড় অঞ্চলে বাস করা মানুষ। এখন তো শীত এমন কিছু নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ভোস ভেঁস করে নাক ডাকা শুরু হল। কিন্তু জীবনের ঘুম আসে না। অজানা পরিবেশের অনিশ্চিত অবস্থা। পেটের খিদে, তার উপর হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনার মনের উপর চাপ, ওকে ঘুমাতে দেয় না। এপাশ ওপাশ করে রাত কেটে যায়।
তখন সূর্য উঠেছে উঁচু পাহাড়টার মাথায়। বৃষ্টি ধোয়া সবুজ চা বাগানে দেবদারু পাইন সেগুণ গাছের ডালে পাতায় প্রভাতী রোদ হাসছে কিশোরী মেয়ের মত। মানুষজন অল্প স্বল্প ইতিমধ্যে বেড়িয়ে পড়েছে পথে। দোকান বাজার খুলে গেছে। দিনশুরু হয়ে গেছে ছোট্ট পার্বত্য শহর কার্শিয়াংয়ে। জিপ চালক ঘুম থেকে উঠে জীবনকে নিয়ে যায় এক দোকানে। পনেরো পয়সায় এক কাপ চা দশ পয়সায় দুই স্লাইজ রুটি কিনে দেয়। বলে খা লে–আউর আভি টেরেন ছুটনে বালা হ্যায়। উসমে বইঠকে বাপস চলা যা। ফির কোভি নেহি আনা।
এক গলা কৃতজ্ঞতায় ডুবে যায় জীবন জিপ চালকের বদান্যতায়। এই প্রথম, এর আগে আর কেউ কোনওদিন প্রতিদানের আশা না রেখে তার জন্য এক পয়সাও খরচ করেনি। বলে সে–যো আপনে বলা ওহি করে গা। ফিরত যায়ে গা!
বেলা তখন দুটো আড়াইটে। যে ট্রেনখানা কাল এখান থেকে চলে গিয়েছিল, আজ এখন ফিরে এসেছে। সেই ট্রেনে চেপে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে এক ব্যর্থ বিষণ্ণ পরাভূত মানব সন্তান। যার নাম জীবন। ফিরে এল দার্জিলিং থেকে শিলিগুড়িতে। পাহাড় থেকে সমতলে, আকাশ ছোঁয়া উচ্চতা থেকে, কল্পনায় গড়ে তোলা স্বর্ণপুরী থেকে, বাস্তবতার কঠিন ধরাতলে। সেই চেনা আকাশ মাটি মানুষের মাঝে। এখানকার আবহাওয়া এখনো শরীরের পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠবার সময় কালের ঋতুচক্রে আবর্তিত হয় নি। বাতাসের সেই সূঁচ ফোঁটানো তীক্ষ্ণ কামড় অনুপস্থিত। রাতও এখানকার কম অন্ধকার কম ভীতিকারক। ফলে, দশ বারো ঘণ্টা এখানে আরো বিনা কারণে কাটিয়ে দিতে জীবনের কোন অসুবিধা হল না। কোন আশায় এখানে পড়েছিল, মনের অতলে আঁতিপাতি করে তার বিশ্বাসযোগ্য, বাস্তবতাসম্মত, যুক্তিগ্রাহ্য কোন উত্তর খুঁজে কোনওদিন পাবে না। এর একটাই কারণ ছিল তা হচ্ছে মনঃস্থির করে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না জীবন। এইসময় তার পক্ষে যা করার ছিল সবচেয়ে সহজ পথ তা হল আর একটা কোনও দোকানের সামনে গিয়ে কাজে রাখার আবেদন জানানো। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে মনের মধ্যে কাটার মত খচ খচ বিঁধছিল একটা ভয় সন্দেহ অবিশ্বাস। সেও যদি গাধার মতো খাঁটিয়ে নিয়ে মজুরি না দেয়। মজুরির যে খুব দরকার। সেই কারণে কোন মনঃস্থির করতে না পেরে স্টেশনের আশে পাশে পাক খেতে খেতে কেটে যায় সারাদিন এবং প্রায় সারা রাত।
রাত যখন প্রায় শেষতখনই শিলিগুড়ি স্টেশনে এসে ঢুকল লক্ষ্ণৌ মেল। এসেছে সেই জীবনের ফেলে আসা জাদু নগরী আসামের গৌহাটি থেকে। তখন মনে মনে ভাবে জীবন, লক্ষ্ণৌ মানে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ মানে দিল্লী, ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লী। দেশের মাথা মাথা লোকের বাস সেখানে। একবার সেখানে গিয়ে দেখলে খুব একটা খারাপ হয় না। খারাপ হবার মতো তার আর আছে বা কি! চরম-চরমতম খারাপ যাকে ঘিরে আছে তার আর নতুন খারাপ থেকে ভয় পাবার কিছু নাই। তবে যদি কোন অঘটন ঘটে, যদি তিলার্ধ পরিমাণ কোন ভালো শুভ মঙ্গল বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার মতো তার ভাগ্যে জুটে যায়। এতকালের গতানুগতিক নিরস নির্মম জীবনযাত্রায় একটা কিছু পরিবর্তন এলেও আসতে পারে। অন্ততঃ তেমন একটা আশা করে এক দান জুয়া খেলায় অন্যায় বা ভুল কিছু হবে না।
