প্লাটফর্ম একদম ফাঁকা। এটা অফ সিজন। এ সময়ে ভ্রমণার্থী মানুষেরা এখানে আসা তেমন একটা পছন্দ করে না। তাছাড়া আজ বৃষ্টিটা একটু বেশি হচ্ছে। সবটা মিলিয়ে সঠিক সময়ের অনেক আগে, বলা চলে প্রায় সূর্য ডোবার সাথে সাথে মানুষজন, যারা পথে ছিল সবকে সব ঘরে ফিরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এক পা দু-পা করে হেঁটে জীবন একটু সামনের দিকে যেখানে জিপ স্ট্যান্ড সেদিকে চলে গিয়েছিল। গোটা কয়েক জিপ যেখানে দাঁড় করানো যার উপর বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। কিন্তু কোনও লোকজন দেখা গেল না। আছে হয়তো জিপের ড্রাইভাররা জিপের মধ্যে বসে শুয়ে। অকারণে কেন বৃষ্টিতে ভিজবে!
সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ট্রেনের দিকে তাকাতেই বুকটা কেঁপে যায় জীবনের। একজন রেলের কর্মচারী রেল কেবিন থেকে বেড়িয়ে এসে ট্রেনের প্রতিটা কামরায় লক লাগিয়ে দিচ্ছে। চাবি তার কাছে থাকছে। যা ঘুরিয়ে সে কাল দরজা খুলে দিলে যাত্রীরা উঠতে নামতে পারবে। কিন্তু জীবন এখন কী করবে! কোথায় বসে কাটাবে হিম তুহিন ভয়াবহ রাত! ট্রেনের কামরায় স্থান পেলে তবু একটা কথা ছিল। খোলা প্লাটফর্মে থাকতে হলে যা ঘটবে, সে কথা ভেবে বুকের কি দোষ সেতো কেঁপে যাবেই। কোন মানুষের এমন বুকের পাটা, যে মৃত্যু ভয়ে কাঁপে না।
আর কি! হয়ে গেল হিসেব নিকেশ। এই রাত জীবনের শেষ রাত। জমে বরফ হয়ে মরে পড়ে থাকার রাত। তার আর এমন কি বিলম্ব। এক ঘণ্টা দু-ঘণ্টা তিন-ঘন্টা। নশ্বর এই কায়াটা কতক্ষণ সইতে পারবে এমন বাঘের মত হাড় কাঁপানো শীতের কামড়!
বৃষ্টি ঝরা রাত, সাথে সাথে হাড় হিম করা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। কোথাও কোন মাথা গোঁজার ঠাই নেই। এই অবস্থায় বাঁচবার কোন পথ কি থাকে! মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি, ফাঁসির দড়ি গলায় চেপে বসার পরেও একবার প্রাণপণে শেষ নিঃশ্বাস টানে। যদি এক সেকেন্ডও বেঁচে থাকা যায়। বেঁচে থাকার এই আকুতি, অদম্য অভীপ্সা, মরণান্তিক প্রয়াস–এর নাম জীবন সংগ্রাম। হার জিত বড় কথা নয়, বড় কথা মরার আগে না মরা। শেষ নিঃশ্বাস পড়ার আগের নিঃশ্বাস পড়া পর্যন্ত লড়ে যাওয়া, ভীষণ ভাবে বেঁচে থাকা।
কান পাতে জীবন, যেন অন্ধকার সমুদ্রের ওপার আকাশ ছোঁয়া দুর্গম পর্বতের কোন এক গুহা থেকে মেঘে ঢাকা নভোমণ্ডলের ওপাশের কোনও নাম না জানা নক্ষত্র থেকে ভেসে আসে সেই মৃত্যুঞ্জয় মহামন্ত্র, চরৈবেতি চরৈবেতি চরৈবেতি। জীবন এগিয়ে চল। এগিয়ে চল জীবন। মরার আগে মরে বসিস না। ডোবার আগে হাল ছাড়িস না। বড় পরিচিত, প্রিয় এই কণ্ঠস্বর। এ রব নাদ শব্দ ধ্বনি জীবনের বড়ই চেনা।
এগিয়ে যায় জীবন। প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে নেমে ট্রেনের অপর পার্শ্বে গিয়ে চারদিক দেখে নেয়। চোখে একেবারে তার আজ রাতচারা শিকারী জন্তুর চাউনি। না কেউ তাকে দেখছে না। এসময়ে যে কোনও দুষ্কর্ম করা যায়। সে ট্রেনের কাছে গিয়ে একটা দরজার গায়ে ধাক্কা দেয়। যা ভেবেছে ঠিক তাই, খুলে যায় দরজা। রেলের কর্মচারী, সব সরকারি কর্মচারীর যা স্বভাব ধর্ম তার বাইরে যেতে পারেনি। প্ল্যাটফর্মের দিকের ট্রেনের দরজা কটায় লক করে পিছনেরগুলো খোলা রেখে অর্ধেক শ্রম বাঁচিয়ে নিয়েছে।
জীবন খোলা দরজা দিয়ে কামরার মধ্যে উঠে বুকের সঙ্গে হাঁটু ঠেকিয়ে গোল হয়ে একটা বেঞ্চিতে শুয়ে পড়ে। বাইরে থেকে এখানে বেশ ঠাণ্ডা বেশ খানিকটা খুব স্বাভাবিক কারণেই কম। মনে হয় জীবনের, কষ্ট হবে, তবে এভাবে এই রাতটা কাটিয়ে দেওয়া কঠিন হবে না। অন্ততঃ মরণকে ফাঁকি দিয়ে এ যাত্রা বেঁচে থাকা গেল।
রাত তখন কত হবে তা কে জানে, সারা পাহাড় জুড়ে ছেয়ে গিয়েছিল কোন মায়াবী জাদুকরের জাদুকাঠির নির্দেশে নেমে আসা মায়া ঘুমে। পাহাড়, গাছপালা, ঘর-বাড়ি, পথ-ঘাট, যানবাহন সব ডুবে গিয়েছিল সুপ্তির অতল গহ্বরে। কোথাও কোনও প্রাণের সাড়া ছিল না। শুধু দমকা বাতাস আর বৃষ্টির জল ঝরার মৃদু আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ ছিল না কোথাও। লাইট পোস্ট আর প্ল্যাটফর্মের শেডে ঝোলানো আলোগুলো জ্বলছিল কোনও ক্লান্ত দৈত্যের সহস্র লোচনের মত ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে। কিছু আলো চুঁইয়ে রেল কামরার জালিকাটা জানালা দিয়ে জীবনের চারপাশেও এসে পড়েছিল। তবে তাতে কামরার অন্ধকার দূর হয়নি। কিছু পাতলা হয়ে গিয়েছিল মাত্র। একসময় কামরার মধ্যে একটা অস্বাভাবিক শব্দ হল। একটু ঘুম ঘুম এসেছিল জীবনের। সেই শব্দে চোখ খুলে গেল তার। টের পেল সারা কামরাটা চোলাই মদের কটু গন্ধে ভরে গেছে। চোখে পড়ল, আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে কান মাথা মুখ ঢাকা হাঁটু পর্যন্ত কোট পড়া একজন মাতাল মানুষ। তার পা টলছে আর গলা দিয়ে বার হচ্ছে গর গর ইঁদুর ধরার আগে বিড়ালের স্বর।
কি করে সে টের পেয়েছে যে, এই দুর্যোগময় রাতে ট্রেনের কামরায় একটি অরক্ষিত অভিভাবকহীন দুঃস্থ বালক আছে তা কে জানে! সে তার টলোমলো পায়ে এগিয়ে এল জীবনের দিকে। গামছা সরিয়ে মুখ দেখল, একে নেশা তায় কামরায় অপ্রতুল আলোয় দাড়ি গোঁফ শূন্য জীবনের কিশোর মুখটা কোন যুবতীর বলে ভ্রম হল। এই আততায়ী অন্ধকারে যাকে ধর্ষণ করলে রক্ষা করার কেউ নেই। সে তার মাতাল মানসিকতায় টালমাটাল পায়ে এগিয়ে এসে জীবনের প্যান্টের বোতামে হাত দেয়। তর সয় না তার, বোম খোলায় দেরি হলে টেনে ছিঁড়েই ফেলবে।
