যখন সাঁতার কাটতে কাটতে হাত পা খিল ধরে আসছিল মনের মধ্যে মাথা চাড়া দিচ্ছিল ডুবে মরার নিদারুণ ভয়, তখনই কার যেন গলা শুনেছিল, যে গলা বিপদে আপদের সময় বারবার শুনেছে–সাহস হারাস না জীবন। মরার ভয়ে যেন মরে বসিস না। আশে পাশে কেউ কোথাও নেই, কারও কোনও সহায়তা পাবার আশা কোরো না। কেউ তোমাকে এই মাঠের মাঝখানে, দিঘির জলে বাঁচাতে আসবে না। বাঁচতে হলে নিজের চেষ্টায় বাঁচতে হবে। সেই চেষ্টা কর। কথায় বলে, ডুবন্ত মানুষ হাতের কাছে খড়কুটো যা পায় আঁকড়ে ধরে। জীবনের সামনে খড়কুটো ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল এক আঁটি শাপলা। যা সে জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। তখন সেই শাপলা ধরে জলের উপর শরীর ভাসিয়ে কিছুক্ষণ দম নেয় সে। তারপর আবার সাঁতরায় আবার দম নেয়। এভাবেই সেই লতাগুল্মর জঙ্গল থেকে এক সময় পাড়ে এসে পৌঁছায়। সেদিন সে মনে শপথ নিয়েছিল, এমন ভুল আর কোনদিন করবে না।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই একই ভুল আর একবার হয়ে গেছে। অন্ধকার এক দিক দিশা কুলহীন সমুদ্রের বরফ জল পড়ে গেছে সে। এখানে কেউ তার বন্ধু আপনজন বিপদতারণ নেই।
স্টেশনের উপর একজন লোক একটা কালো কম্বল জড়িয়ে সামনে একটা কয়লার উনুন নিয়ে বসে বসে আগুন সেঁকছে। তার কাছে গিয়ে জানতে চায় জীবন–এইখানে রাইতটা একটু কোথাও কাটানো যায় কিনা কন দেখি।
লোকটা মনে হয় স্টেশনস্থ খাবার দোকানের কর্মী। সে যে চোখে জীবনের দিকে তাকায় তাতে কোন কৌতূহল বিস্ময় বাৎসল্য আতিশয্য নেই। আছে বিরক্তি, ফালতু বাক্যালাপের অনিচ্ছুকতা।
বলে সে–কই হোটেল মে চলা যাও।
আমার কাছে তো টাকা নেই। আচ্ছা এইখানে কি ইস্টাশনে থাকা যায় না?
আগের চেয়েও বেশি বিরক্তি ঝরে লোকটার গলা থেকে–ইহা তো টেসনমে পুলিশ মচ্ছর তক রহনে নেহি দেতা, কেইসে রহো গে।
জীবন তার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হাত দুটো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটু উনুনে সেঁকে নেয়। তখন আবার বলে লোকটা–কাহা রহতা হ্যায়?
বেশি দূর বলা ঠিক হবে না ভেবে নিকটস্থ স্থানের নাম নেয় জীবন। শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ির বর্ধমান রোড, সেইখানে আমাগো বাড়ি।
তো ইহা ক্যা করনে আয়া?
কামের তালাশে আইছি।
কাম! লোকটা ঠোঁট ওল্টায়। এ কাম কাঁহা। এহাকে লোক কাম কী তালাশমে নিচে যাতা হ্যায় আউর তুম নিচেসে উপর আয়া!
লোকটার কথায় জীবনের মনের মধ্যে কল্পনায় গড়ে তোলা কুবের মহলের স্বর্ণসৌধটা চুর চুর হয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে ধুলো হয়ে যায়। পাহাড়কে লোগ খুদ ভুখ পিয়াস গরিবীমে মর রহা। দূর সে পাহাড়কো বহুত সুন্দর দিখতা হ্যায়। নজদিক আনেসে মালুম পড়তা হ্যায় কিতনা খাই গড়া হ্যায়।
হতাশায় বলে জীবন–তাইলে হাম এখন কি করো?
ক্যা করেগা?মর। মরনেকে লিয়ে তো আয়া। কথা তার শেষ। লোকটা উনুন নিয়ে সামনের দোকানে ঢুকে দরজা বন্ধ করে নেয়। কে কোথাকার একটা উটকো লোক তার জন্য সে কেন মাথা ব্যথা করবে। বর্তমান সময় বড়ই আত্মকেন্দ্রিক। এত সময় কার আছে যে, এক অচেনা আপদের বিষয়ে দুর্ভাবনায় ডুববে। কিন্তু জীবন এখন কি করবে? কী করবে জীবন? যেমন বলল লোকটা, মরে যাবে?
মরে তো যাবেই। সে চাক বা না চাক। শীত যেরকম হামলে পড়েছে সারারাত যদি সে শরীর ছোবলায় প্রাণ দেহ ছেড়ে পালাবে। কোনভাবে তাকে আটকে রাখা যাবে না দেহের চোর কুঠরির মধ্যে। ভাগ্যের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে জীবন যখন অনাগত ভব্যিতের জন্য একরকম প্রায় প্রস্তুত তখনই ট্রেনের হুইসেল তীক্ষ্ণভাবে বৃষ্টি ভেজা রাতের বাতাস কাঁপিয়ে বেজে উঠল। কি ব্যাপার? ট্রেনের চাকাও যে পিছন দিকে গড়াতে শুরু করেছে একটু একটু করে। কেউ বলেনি তবু বুঝতে পারল, ট্রেন এবার ফিরে যাবে। এ সময়ে জীবনের বোধ বুদ্ধিতে যা এল তাই করল সে। আবার উঠে পড়ল ট্রেনে।ফিরে যাবে। ফিরেই যাবে জীবন। না ফিরে গিয়ে আর তার কি বা করার আছে। অলকাপুরী তার জন্য কোন শুভ সংবাদ নিয়ে অপেক্ষা করে নি।
বলতে গেলে প্রায় ফাঁকা ট্রেন ঘণ্টা দেড়েক চলার পর পৌঁছে গেল কার্শিয়াং। যাবার বেলা এর ডবল সময় লেগেছিল। সেটা চড়াই, এটা উতরাই। জগতের সব জিনিসের ক্ষেত্রে এটাই নিয়ম। উঠতে লাগে বহু সময় বহু কষ্ট বহু দৃঢ়তা কিন্তু নামতে হলে কোন প্রয়াসই লাগে না। একটা অপপ্রয়াসই যথেষ্ট।
রাত তখন দশ কি সাড়ে দশটা। শীতার্ত রাতের পাহাড়ি স্টেশন কার্শিয়াংয়ে এসে সেই যে ট্রেন থামল, একেবারেই থেমেই গেল। নট নড়ন চড়ন। কামরাগুলো প্লাটফর্মে ফেলে ড্রাইভার গার্ড উধাও হল। আজকের মত তাদের ডিউটি শেষ। ট্রেন চলার ইতি আজকের মত। আবার চলবে কাল। সকাল সাতটায়। কার্শিয়াং দার্জিলিংয়ের চেয়ে উঁচুতে। ফলে সেখানে শীতও বেশি বৃষ্টিও বেশি। জীবনের ক্ষেত্রে এ যেন গরম কড়াই থেকে রক্ষা পেতে আগুনে ঝাপানোর সামিল হল। কি আর করে জীবন, ট্রেন থেকে প্লাটফর্মে নেমে চারদিকে কাতর চোখে তাকায় সে। যদি কোথাও কোন আশার আলোর সন্ধান মেলে, যদি পাওয়া যায় প্রাণ বাঁচানো প্রাণের উত্তাপ নেই। চারদিকে অন্ধকার। লোডশেডিং নয়। এমনিতে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে তবে সে আলোয় এত উজ্জ্বলতা নেই যাতে জীবন আলোকিত হয়। মনে হয় পরিবেশ বিরূপ নয়, ভয়ংকর বিরূপ।
