ট্রেন চলছে আর চলছে। কখনো ইঞ্জিন সামনে টানে কখনো পিছনের দিকে ঠেলে পাহাড় চড়ছে। কখনো দেখা যায় রেল লাইন মাথার উপরে কখনো সোজা পায়ের নিচে। এই ঘুরপাক খাওয়া পথের নাম লুপ। সুকনা থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত নাকি আঠারোটা লুপ আছে। দুরন্ত দামাল নেপালি ছেলেগুলোর এই পথের বাঁক মোচর সব নখ দর্পণে। ওরা এক একটা বাঁকে এসে চলন্ত ট্রেন থেকেজিপচলা পথের উপর নেমে পড়ে। প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে চা জল খেয়ে গোছাখানেক ফুল ছিঁড়ে পাহাড়ি চড়াই বেয়ে হেঁটে এসে আর এক বাঁকে বসে থাকে। যেখানে মানুষ পৌঁছে যাবার বিশ মিনিট বাদে পৌঁছাচ্ছে ট্রেন। আবার ওরা ট্রেনে উঠে শুরু করে দেয় হুল্লোড়। যার নাম যৌবন জল তরঙ্গ। কয়েক ঘণ্টা ওরা এসব করার পর কোন এক স্টেশনে যেন নেমে যায়। কে একজন বলে এ স্টেশনের নাম ঘুম। সেখানে ট্রেনের ক্রশিং হল। যে ট্রেন দার্জিলিং থেকে শিলিগুড়ি যাচ্ছে ওরা সব সেই ট্রেনে গিয়ে উঠল। এবার ওরা হুল্লোড় করতে করতে নিচে নামবে।
এখন মনে হয় বেলা একটা হবে। ইঞ্জিনে এখানে জল ভরা হল। যাত্রীদের সুযোগ দেওয়া হল দুপুরের ভোজন সেরে নেবার। তারপর মন্থর পায়ে আবার রওনা দিল ট্রেন। এখন শীত আগের চেয়ে ঢের বেড়ে গেছে। জীবনের ছোট্ট গামছা গেঞ্জিতে সে শীত বাধা মানতে চাইছে না। এ ট্রেনে ওর মতো উদোম যাত্রী আর কেউ নেই। সব প্যান্ট কোর্ট টুপি মাফলারে ঢাকা। কিছু যাত্রী এমন আছে দেখে বোঝা যায় তারা গরিব কেননা তাদের প্যান্ট কোট মলিন ছেঁড়াকোরা। কিন্তু সে যেমনই হোক শীত তো মানছে। জীবনের তো তাও নেই।
এরপর বেশ কয়েকঘণ্টা ট্রেন চলে অনেকগুলো স্টেশনে পিছনে ফেলে ট্রেন পৌঁছাল কার্শিয়াং। তখন ঘড়ির কাঁটায় সময় মনে হয় পাঁচটা হবে। উঁচু একটা পাহাড়ের মাথায় জোরালো সার্চলাইটের মতো জ্বলছে বিল্টুদায়ী সূর্য। আর পনেরো কুড়ি মিনিটের মধ্যে সে পাহাড়ের আড়ালে চলে যাবে। সমতলের ঢের আগে এখানে দিবাবসান ঘটবে।
ট্রেনের অধিকাংশ যাত্রী এখানে নেমে গেছে। কামরায় আর সাত আট জন অবশিষ্ট মাত্র। সেই নিয়ে আবার চলা শুরু করল ট্রেন। জীবন এখন একটা বসার জায়গা পেয়ে হাঁটু মুড়ে ছোট হয়ে বসে পড়ে। এখানে হাওয়া একটু কম তাই শীতও কম। কিছুক্ষণ পরে উঁচু নিচু পৰ্বত শ্রেণীর মাথায় মাথায় যেখানে যেখানে লোকালয় আছে জ্বলে ওঠা আলোকমালা দেখতে পায়। পাহাড়ি নৈঃশব্দতার মধ্য দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনখানাকে তখন মনে হয় যেন নক্ষত্র রাজ্যের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলা কোন মহাকাশ যান। জীবন বসেছে ট্রেনের ডানদিকে। ওর ডানদিকে গভীর গিরি খাদ, মাথা উঁচু পাইন দেবদারুর বন। তার ও পাশে আকাশের গায়ে ঘুমন্ত পাহাড় পর্বত গিরিশৃঙ্গ।
এখন জীবনের এসব দৃশ্যে মুগ্ধ হবার সময় নেই। সে ভাবছে আর কতক্ষণ পরে ট্রেন দার্জিলিং পৌঁছাবে। সেখানে এরপর কি ঘটবে। কি বিস্ময় বিপদ ঘটনা দুর্ঘটনা অপেক্ষা করে আছে তার জন্যে। এখনই শীতকামড়ে শরীর কাতর। রাত যত বাড়বে শীতও বাড়বে। কোথাও একটু মাথা গোঁজার গরম জায়গা না পেলে তখন কি হবে! এখন আবার মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। এ সেই সমতলের আষাঢ়স্য ধারা নয়। এ উড়ে চলা পরিব্রাজক মেঘ। যা উড়তে উড়তে কোথাও থেমে গিয়ে ঝির ঝির করে খানিকক্ষণ ঝরে যায়। তাই এই বোদ তো এই বৃষ্টি। পাহাড় জুড়ে এমন লুকোচুরি খেলা চলতেই থাকে এই সময়টায়। জলের ছিটে গায়ে পড়তে মনে হল যেন সুচের মত লোমকুপ থেকে চামড়া ভেদ করে হাড়ে গিয়ে বিধছে। এত ঠাণ্ডা। সরাসরি পর্বতের মাথায় জমে থাকা বরফ জল হয়ে নামছে বোধ হয়।
রাত তখন আটটা কি সাড়ে আটটা ঝিরি ঝিরি বরফ জলে ভিজতে ভিজতে ট্রেন এসে পৌঁছাল দার্জিলিং স্টেশনে। একেবারে সুনসান চারধার। এক গণ্ডা পৌষ মাঘ যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে এখানকার সব তাপ উত্তাপ প্রাণের স্পন্দন ঠাণ্ডা করে দিচ্ছে। চারদিকে ছেয়ে আছে কেমন একটা গা ছমছমে অচেনা অন্ধকার। যে কজন যাত্রী ট্রেন থেকে নেমেছে সবাই কুলির মাথায়, না, কুলিরা এখানে মাথায় মাল বয় না, বয় দড়ির ঝোলায়, পিঠে। সেভাবে মালপত্র নিয়ে চলে যায় ভিজতে ভিজতে যে যার গন্তব্যে। জীবন ট্রেন থেকে নিচে নেমে চারপাশ দেখে বড় মুষড়ে পড়ে। কেমন যেন বুকের মধ্যে একটা ভয়ের অস্তিত্ব টের পায়। মনে হয় তার কোথায় কি যেন একটা হিসেবে ভুল হয়ে গেছে।
বাঁকুড়ায় থাকতে একবার জীবন একা হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলো বিষ্ণুপুর। লালবাঁধ আর রাণীবাঁধ নামে ওখানে দুটো বিশাল দিঘি আছে। প্রজাদের জল কষ্ট নিবারণের জন্য মল্লরাজারা এ দিঘির খনন করিয়েছিলেন। এখন পরিচর্যার অভাবে যার জল পানের অযোগ্য হয়ে গেছে। লাল বাঁধের তীরে পৌঁছে দেখেছিল জীবন দিঘির মাঝখানে প্রচুর শাপলা ফুল ফুটে আছে। শাপলা এমন এক জলজ উদ্ভিদ যা সেদ্ধ করে খেলে খিদে মেটে। খিদের কারণে আগপাছ বিচার না করেই সেই ভরদুপুরে দিঘির পাড়ে প্যান্ট খুলে রেখে নেমে পড়েছিল জলে। সেদিন কোন বিশ্বাসে কোন সাহসে জনহীন মনুষ্যহীন লালবাঁধের জলে একা নেমে পড়েছিল জীবন কে জানে। সাঁতরে মাঝখানে চলেও গিয়েছিল। বেশ কিছু শাপলা তুলেও ফেলেছিল। কিন্তু শাপলা নিয়ে ফেরবার সময় বুঝতে পারল এভাবে একা একা আসাটা একদম ঠিক হয়নি। যেভাবে তোক সে এসে তো পড়েছে কিন্তু ফেরার পথে জলজ উদ্ভিদেরা বিছিয়ে দিয়েছে অজস্র লতা পাতার বাধা। সাঁতার কাটতে গেলে যা পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। কোনভাবে যদি এক সাথে দু পা লতায় পেঁচিয়ে যায় আর বাঁচার কোন উপায় থাকবে না। এমনিতে দিঘির গভীরতা খুব বেশি নয়। তবে এত কমও নয় যে একটা বাচ্চাকে ডুবিয়ে মারতে পারবে না।
