ট্রেন যেখানে দণ্ডায়মান সেখানে কোনও প্লাটফর্ম নেই। চারদিক খোলা মাঠ। মাথার উপর সুনীল আকাশ। আকাশে ডানা মেলা এক ঝাক পরিযায়ী পাখি। হিমালয় পার হয়ে কোথায় কোন দূর দেশ থেকে ওরা উড়ে আসছে। তিন চার মাস এখানে কাটিয়ে ফেব্রুয়ারীর দিকে ওরা আবার ফিরে যাবে। এটা অক্টোবর, আর কয়েকদিন পরে হিন্দুধর্মের শাস্ত্রমতে দেবী দুর্গা এই হিমালয় থেকে পুত্র কন্যাসহ সমতলে পূজা নিতে আসবে। এখনই বাতাসে খুব সামান্য শীত শীত ভাব। যেন সেই ভাবের সাথে মিশে আছে পূজো পূজো গন্ধ। তাতে অবশ্য জীবনের কিছু যায় আসে না। ওর তো পেট বোঝাই আগুন, দহন। সে আগুনে দহনে সব উৎসব ছাই হয়ে গিয়ে যা পড়ে আছে। তার রূপ বড়ই কদাকার। সেখানে কোন প্রফুল্লতা স্থায়ী হয় না।
এতক্ষণ ইঞ্জিন থেকে গর্ভবতী রমণীর মতো আলস্যময়, একটা মন্থর ধোঁয়া চিমনি বেয়ে আকাশের দিকে উঠছিল। এবার তার আলস্য কেটে গেল। বয়লারের কয়লা মারার ফলে ভলকে ভলকে সাদা ধোয়া উঠে আকাশ ঢেকে দিল। দুবার কুকু করে সিটি বাজাল। বোঝা গেল দৌড় শুরু হবার জন্য সে প্রস্তুত হয়েছে।
জীবনও প্রস্তুত। স্টার্ট হলো ইঞ্জিন। সো সো ছ্যাক ছ্যাক করে সে তার চাকা গড়ানো লিভারের উপর বাষ্পের চাপ দিয়ে শুরু করল সামনের দিকে যাত্রা। এক দুই তিন চার। চার পাক চাকা ঘোরার পর কালো কোর্ট পড়া চার চেকার পিছনে ফিরল। ওরা স্টেশনের কেবিনে যাবে। আর অপেক্ষার দরকার নেই। জীবন ছুটল ট্রেনের দিকে। ট্রেন তখন একটু বেগবান হয়ে গেছে। সে তুলনায় জীবনের শরীর একটু বেসামাল, পা একটু নড়বড়ে, হাত শক্তিহীন। তবু কোন মতে ধরে ফেলল দরজার হাতল। যাত্রীরা ওর রকম সকম দেখে আঁতকে উঠল। বিপদাশঙ্কায় কেঁপে চোখ বন্ধ করল কেউ কেউ। গেল, গেল বুঝি। কিন্তু গেল না। না প্রাণ, না হাত পা। সে উঠে পড়ল সাধারণ কামরায়। দাঁড়িয়ে পড়ল দরজার সামনে। দু’এক জন যাত্রী যাদের আশঙ্কা হচ্ছিল কোন দুর্ঘটনা ঘটলে ট্রেন থেমে যাবে। যাত্রায় বিলম্ব ঘটবে। তারা ওকে দুচারটে সাধারণ খিচুনি দেবার পর মনোনিবেশ করল প্রকৃতির দৃশ্যপট দেখার দিকে।
শিলিগুড়ি থেকে ট্রেন ছেড়ে প্রথমে যে স্টেশনে এসে থামল তার নাম সুকনা। এখান থেকেই ট্রেন পাহাড়ে চড়া শুরু করল। পাহাড়ের গায়ে নানা ধরনের বৃক্ষের ঘনগভীর জঙ্গল। তবে সে সব একটু দুর দুরে। এই সময় থেকে একটু শীত শীত করতে শুরু করল জীবনের। ট্রেনের যাত্রীদের দেখা গেল গায়ে শাল সোয়েটার কোর্ট চাপাচ্ছে। জীবনের কাছে গামছা গেঞ্জি ছাড়া আর কিছু নেই। সেগুলোই সে গায়ে জড়িয়ে নেয়।
এরপর ট্রেন যত সামনে আগায় শীত বেড়ে চলে। কিন্তু তখন শীতের কামড়ে জীবন ততটা কাতর হয় না। সে অবাক হয়ে প্রকৃতির অনুপম সৃষ্টি ছোট বড় মাঝারি পর্বতশ্রেণীর শৈলচূড়া দেখতে থাকে। যেন কেউ একখানা ঢেউ খেলানো বিশাল সবুজ চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছে সব কিছু। সে চাদরের উপর নানা রকম ফুলের কেয়ারি করা। দুরে দেখা যাচ্ছে একপাল ভেড়া চড়ছে। সবুজের উপর ঘিয়ে রঙের জীবনগুলো ফুটে আছে আর এক সৌন্দৰ্য্য হয়ে।
পাহাড়ি রাস্তায় ট্রেন সোজা চলতে পারে না। তাকে পাহাড়ের গায়ে পাক খেয়ে খেয়ে উপরে উঠতে হয়। কত কঠিন পরিশ্রমে বিশ্বকর্মার বরপুত্ররা এ পথের নির্মাণ করেছে ভেবে অবাক হয় জীবন। চেষ্টা করলে মানুষ কত কি না করতে পারে। যারা পাহাড় ফাটিয়ে ছেনি হাতুড়ি চালিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এমন অনবদ্য শিল্প সৃষ্টি করেছে, কে তাদের কথা জানে? কে জানে
তারাও সব একদিন এক বস্তা ধান মাথায় একা তোলা গরিব দাসের দশা প্রাপ্ত হয়েছে কিনা!
অতিকায় এক কেন্নোর মত টিকিস টিকিস করে ট্রেনখানা যে পাহাড়ের গা বেয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উপরে উঠছে তার একদিকে গভীর খাঁই। সেদিকে একবার ট্রেন হেলে গেলে গড়িয়ে কোথায় গিয়ে পড়বে তা কে জানে! অন্য দিকে পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে একেবারে ট্রেনের প্রায় গা ঘেসে। সেই পাহাড়ের গায়ে ফুটে আছে লাল সাদা হলুদ নীল নানারঙের অজস্র জংলা ফুল। যা দেখে মনে হয় কেউ যেন সেসব সুন্দর ভাবে লাগিয়ে রেখে গেছে। কোন এক স্টেশন থেকে যেন পাঁচ ছয়জন জীবনের বয়েসী নেপালি ছেলে উঠেছে ট্রেনে। তারাও সব ভিড় করে রয়েছে দরজার কাছে। প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর সেই সব তরুণরা হাত বাড়িয়ে গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছে। তারপর পথ চলা কোন তরুণী যুবতী দেখলে ছুঁড়ে দিচ্ছে তার দিকে। যাদের দিকে ছুঁড়ছে তারাও সব হাত নেড়ে হেসে ছুঁড়ে দিচ্ছে ভালোবাসার প্রত্যুত্তর। যে একটু বেশি সাহসী সে ছুঁড়ছে উড়ন্ত চুম্বন।
যে পথে রেল চলেছে তারই সাথে সাথে পাশে পাশে কখনো বা শঙ্খ লাগা সাপের মত জড়িয়ে পেঁচিয়ে চলেছে একটা পিচ ঢালা পথ। যে পথে যাত্রী নিয়ে আসা যাওয়া করছে প্রচুর জিপ গাড়ি। খুশির জোয়ারে গা ভাসিয়ে জিপের আরোহীরাও মেতে উঠেছে সীমিত উশৃঙ্খলতায়। স্থান কালের কারণে বৈসাদৃশ্য লাগছে না কারোরই। ট্রেনের প্রায় সব যাত্রী আনন্দে হাসছে হা হা করে। মনে হয় সারা পৃথিবীতে একমাত্র হাসি এবং কান্নার যে ভাষা তা বিনা অনুবাদে সবাই বুঝে নিতে সক্ষম। জন থেকে জনে জনে সংক্রামিত হয়ে যাচ্ছে সেইহাসিখুশি আনন্দ আহাদের মলয় মদিরতা। এই আনন্দে মূর্তিমান নিরানন্দ একমাত্র জীবন নামের এক না কিশোর না যুবক না জীবিত না মৃত মানুষ। সে তার ছোট্ট গামছায় শরীর ঢেকে শীত বাতাসের ছোবল খেয়ে একপাশে সরে থেকে সুখী মানুষ দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
