রাত শেষ হতে খুব বেশি বাকি ছিল না। সব রাতের শেষ আছে। এটা প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম। শুধু সেই রাত সেই অন্ধকার শেষ হয় না যা মানুষের নিজের প্রয়োজনে সৃষ্টি করে, পরিপুষ্ট করে। যেসব অন্ধকার মানুষ বুকের মধ্যে লালন করে। নিজের সৃষ্টি করা লালন করা অন্ধকারে বাস করতে করতে সেই মানুষই নিজে একদিন কালো কুৎসিত প্রেতাত্মার মতো অবয়ব শূন্য আদর্শ শূন্য এমন এক প্রাণী হয়ে যায়, যার আরাধ্য উপাস্য পূজ্য শুধু অন্ধকার অন্ধকার অন্ধকার। সেই অন্ধকারের জঠর থেকে জন্ম নেয় আরো অন্ধকারে। যা অনন্ত অসীম …।
প্রকৃতির অন্ধকার এখন একটা পাতলা চাদরের মতো বিছানো রয়েছে দিগন্ত জুড়ে। সেই চাদর সরিয়ে পুর্বাকাশে দেখা দিচ্ছে হালকা একটা বেগুনি রেখা। গাছ গাছালির ডালে ডালে খড় কুটোর বাসায় আড়মোড়া ভাঙছে পাখ পাখালির ঝক। কিচির মিচির শোনা যাচ্ছে তাদের গলায়। কত সুখী ওরা! ছোট্ট দুটো ডানা আছে। সেই ক্ষুদ্র কিন্তু স্বাধীন ডানায় সারা আকাশ দখল করে নেয়। যতদিন জীব জন্তু পাখিদের জীবনের দিকে লোভি মানুষের কালো হাতের ছায়া না পড়ে ওরা বড় সুখেই থাকে।
জীবন আনমনে রেল লাইন ধরে হাঁটে। কেন হাঁটে, চঞ্চল পা কিসের সন্ধানে ব্যাকুল, তা কি সে জানে? স্টেশনের আলোকিত অঞ্চলের বাইরে যে বিশাল অঞ্চল তার চোখে এখনও প্রভাতি ঘুমের আঠা লেগে আছে। রাতের আঁধার যত ফিকে হয়ে যাচ্ছে তত পরিদৃশ্য হচ্ছে হালকা ধোয়ার মতো সামান্য কুয়াশা। যা দুরের গাছপালা, পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে আছে। কি ভেবে যেন কিছুক্ষণ জনহীন সেই মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে জীবন। নিজেকে এখন তার জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলা সেই রাখাল বালকের মতো মনে হয়। যার সামনে কোনও পথের নিশানা নেই। মনে হয় চোরাবালিতে পা বসে যাওয়া সেই হরিণ শাবকের মত, যে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে। বুঝতে পারছে এরপর কি ঘটতে যাচ্ছে, কিন্তু পরিত্রাণের কোন পথই নেই।
বেলা তখন মাটি ছেড়ে এক হাত উপরে উঠেছে। সকাল বেলার সেই সোনালি রঙ ঝেড়ে ফেলে রোদ এখন রক্তচক্ষু। উবর খাবর মাটি মাঠ পাথর টিলা পাহাড় গাছ পালার ফাঁক থেকে তার তিরের ফলার মতো দৃষ্টি এসে বিদ্ধ করছে জীবনের চারপাশ। সেই সময় দেখতে পায় জীবন তার সামনের রেল লাইনের উপর এসে দাঁড়ায় ট্রেনের চেয়ে ছোট ট্রামের চেয়ে বড় তিন চার বগির একখানা অদ্ভুত যান। ইঞ্জিনখানাও সেইরকম ছোট। কিছু পরে দেখে জীবন সেই যানখানা যার নাম ন্যাড়ো গেজ, তাতে এসে চড়তে থাকে একদল সুবেশ সুন্দর বড় বড় মানুষ। লোকের কথোপকথন থেকে শুনে নেয় সে এই যানখানা যাবে দার্জিলিং।
সকাল বেলায় ঝকঝকে রোদে এখান থেকে পাহাড়ের মাথায় আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শহরে দেশলাই বাক্সের মতো দালান কোঠা ঘর বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে। যেন এক সবুজ নিথর সমুদ্রের মধ্যে নোঙর ফেলা ছোট ছোট খেলনা রাংতার নৌকা। যা রোদের আলোয় ঝিকমিক ঝিকমিক করছে।
সকাল দেখলে বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে। এটা পুরাতন প্রবাদ। জীবনও তা জানে। আজকের দিনটাও যে তার জন্য কোন শুভবার্তা নিয়ে আসেনি, তার আভাস পাওয়া হয়ে গেছে। সেই এক বুক নিরাশা বঞ্চনা এক পেট বুভুক্ষা নিয়ে পথে পথে ঘোরা। এর যখন কোন ব্যাত্যয় নেই তখন ঘুরতে ঘুরতে দার্জিলিং চলে গেলে ক্ষতি কি! কে যেন দার্জিলিংকে অলকাপুরী বলেছে। অলকাপুরী মানে ধন দেবতা কুবেরের পুরী। যে রাস্তায় ছাইয়ের ট্রাক, বালি, চালের ট্রাক যায়, উড়ে ঝরে একটু আধটু রাস্তায় পড়ে। ক্ষুদ্র মানুষ জীবন তার চাহিদাও ক্ষুদ্র। কুবেরের নগর থেকে কুড়িয়ে খুটে কিছু কি এমন পেতে পারে না যে সেই ছোট্ট চাহিদাটুকু মিটে যায়? সেটা পরখ করতে হলে সেই নগরে না গিয়ে উপায় নেই।
যাবে জীবন! ভালো কিছু হবার আশা যখন নেই সব চেয়ে খারাপ যা হতে পারে তা যখন জানা, শিলিগুড়িতে পড়ে মরার চেয়ে দার্জিলিং গিয়ে মরায় কি এমন ক্ষতি! তাতে অন্ততঃ মরার আগে মনে সান্ত্বনা থাকবে, আঙুর ফল টক জেনেও লাফালাফি করেছিলাম, নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকিনি।
সামনে ইঞ্জিন, তার পরের কামরা মালপত্রের, তার পরে ফার্স্ট ক্লাস, তার পিছনে সেকেন্ড ক্লাস এবং সবার পিছনে গার্ড সাহেবের কামরা। ছোট্ট ট্রেন এবং লোকজনের ভিড়ও খুব কম। যারা শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যায় বেশির ভাগ লোক ট্রেনের চেয়ে জিপ বেশি পছন্দ করে। বিশেষ করে জিপের সামনের সিট। পিছন থেকে তার ভাড়াও কিছু বেশি। জিপ ট্রেনের চেয়ে সময় নেয় কম আর দেয় নৈসর্গকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবার রোমাঞ্চ। কিন্তু জিপে বিনা ভাড়ায় যাওয়া যাবে না। ট্রেনে তা যায়। শুধু যে তিন চারজন চেকার ট্রেন ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ওদের চোখ এড়িয়ে কামরায় চড়তে পারলেই হল।
জীবনের কাছে কোন পয়সা কড়ি নেই। কিন্তু ট্রেনে তো চাপতেই হবে। সেইঞ্জিনের সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে কখন ট্রেন ছাড়বে। এই ট্রেন ধীরে ধীরে চলে। চলন্ত ট্রেনে ওর পক্ষে উঠে পড়া খুব কঠিন কাজ নয়। চেকার পিছনে ফেলে ট্রেন সামান্য সামনে এগিয়ে এলে সেই কাজটা সম্পন্ন করবে। সেটা করতে পারলেই দার্জিলিং যাত্রার প্রথম ধাপ পার হওয়া যাবে।
