অন্য কেউ হলে হয়তো কবে পালিয়ে যেত। কিন্তু জীবন পালাই পালাই মন নিয়েও পাঁচ মাস টিকে যায়। কারণ একটাই। লোকটা মাসের দশবারো তারিখ হলেই জীবনকে তার মাস মাইনের টাকা ধরিয়ে দিত। যক্ষের ধনের মত জীবন তার সেই কষ্টার্জিত টাকা শোবার বালিশের মধ্যে লুকিয়ে রাখত। মা বাবার কাছে পোস্টাপিস মারফত টাকা পাঠাবার কায়দা তখন তার জানা ছিল না। ভয় করত টাকাটা হয়ত পৌঁছাবে না ঠিকানা পর্যন্ত। পথেই মার পড়ে যাবে। তাই ভাবনায় ছিল আর সামান্য কিছু জমে গেলে বাসায় গিয়ে মায়ের হাতে দিয়ে আসবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হল না। যত সাবধানে গোপনে টাকাটা সে লুকিয়ে রাখুক, তা আসলে গোপন ছিল না। যাদের সঙ্গে তার সারাদিন কাটে তারা জানতো। কিছু টাকা জীবন এটা সেটা কিনে, খেয়ে খরচ করে ফেলেছিল। রাখা ছিল নীল রঙের একটা একশো টাকার নোট। এক সকালে দুধ বওয়ার কাজ শেষ করে দোকানে ফিরে এসে দেখে বালিশের মধ্যে থেকে টাকা উধাও হয়ে গেছে। তখন দোকানে ছিল দোকানদারের ছোট ছেলে। এত কষ্টের ধন চুরি চলে যাওয়ায় জীবনের আর মাথার ঠিক ছিল না। সে সরাসরি ছোট ছেলের দিকে আঙুল তুললো–তুমি নেছো। আর কেউ না, তুমি। যাওনের আগে আমি দেইখ্যা গেছি, হেয়ার পর ঘরে আর কেউ ছেলে না। আমার টাকা ফেরত দাও।
চুরি ততটা লজ্জার নয়, যতটা চোর বদনামে। মাথা গরম হয়ে গেল আখড়ায় কুস্তি লড়া ছোট পহেলবানের। “শালা হামারা খাতা হ্যায় হামারা পিতা হ্যায় আউর হামিকো চোরবোলতা হ্যায়।” জীবনকে সে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল বাস্তায়-যা শালে কুত্তা, ভাগ, নেহি তো মারকে তবিয়ত বিগাড় দেগা। ভেবেছিল জীবন, আশে পাশের মানুষ, বিশেষ করে দুপাঁচজন বাঙালী যারা আছে তারা ওর পাশে এসে দাঁড়াবে। কেউ অন্ততঃ বলবে, এটা অন্যায়। গরিব বেচারার টাকাটা দিয়ে দাও। কিন্তু তেমনটা ঘটলো না। দূরে দাঁড়িয়ে অনেকে জীবনের কান্না দেখে মজা করল। কেউ কষ্টও পেতে পারে। তবে সামনে এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করল না। আবার আর একবার পাঁচ ছয় মাসের নিষ্ফল প্রচেষ্টার পর কপর্দকশূন্য অবস্থায় পথে পড়ল জীবন।
এখন বেলা প্রায় তিনটে বাজে। পথঘাট একেবারে ফাঁকা। এমনিতে এ অঞ্চলের জনবসতি ততটা ঘিঞ্জি নয়। শহর কলকাতার ভিড় দেখা চোখে এখানকার ভিড় শিশু। ভগ্ন মনে একরাশ শূন্যতা নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে স্টেশনে আসে জীবন। কোথায় যাবে কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। এমন একটা মানুষের মুখ চোখে পড়ে না, যার কাছে গিয়ে কেঁদে পড়া যায়। বলা যায় নিজের দুঃখের সাতকাহন। আশা করা যায়, সে এমন একটা কাজ কথা উপদেশ দেবে যাতে জীবনের এই হাল ভাঙা পাল ছেঁড়া তরণীখানি একটু কুল ছোঁয়। একটু মাটি পায়। যে মাটিতে শিকড় চারিয়ে বেঁচে থাকে ছোট বনস্পতি।
পৃথিবীর কাছে জীবনের আর কোন আশা নেই, দাবি নেই। শুধু দুবেলা দুমুঠো অন্ন, এক টুকরো মোটা কাপড়, মাথার উপর একটু ছাউনি–সেটুকুই যে কৃপণ পৃথিবীর কাছে অনেক বড় দান। কিছুতেই সে মুঠি আলগা করতে রাজি নয়। বাবা বলত ক্ষুধা দিয়েছেন যিনি আহার জোগাবেন তিনি। কাঠের মধ্যে ঘুন পোকা থাকে ঈশ্বর তাকেও অভুক্ত রাখেন না। তাকে বলেছিল তার বাবা। তোতা রটনের মতো দুখ কষ্ট অভাব অনটনের সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে, বিনা অসুখে পেটের ব্যথায় কাটা ছাগলের মত ছটফট করতে করতে, অনাহারে মরে যাওয়া শিশু কন্যার মৃতদেহের সামনে বসে চোখের জল ফেলতে ফেলতে, নিবস্ত্র স্ত্রীর লজ্জা নিবারণের জন্য এক খণ্ড ন্যাকড়া জোগাড় করবার অক্ষমতায় হাহুতাশ করতে করতে, কোন বিশ্বাসে নিজের কাছে এসব বলেছিল তা এক জব্বর ধাঁধাঁ। জীবন যে ধাঁধার অর্থ আজো জানে না। কোথা সেই মঙ্গলময়ের মঙ্গল বাসনা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। সে কোনদিন কারো কাছে বলতে পারবে না, ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যই করে থাকেন।
কিছুক্ষণ গৌহাটি স্টেশন বসে কিছু সময় কাটিয়ে শেষে যে ট্রেনখানা তখন ছাড়ছে সেটায় উঠে বসে। কেন উঠে বসে কোথায় যাবে কেন যাবে তার কোন উত্তর জীবনের কাছে নেই।
এ ট্রেনে অসম্ভব ভিড়! কামরার মধ্যে গাদাগাদি মেরে গেছে যাত্রীতে। এত ভিড় ট্রেনে চেকার ওঠে না। কত ধাক্কা সহ্য করবে! একদিন দুদিন তো নয় রোজকার কর্ম। জীবন কোথাও বসার জায়গা পায় না। দরজার সামনে অনেকের সাথে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের পোষাক আষাক দেখে বোঝা যায় এরা মজুরশ্রেণীর লোক। কোথায় যেন কাজে চলেছে। হায় হতভাগা! জীবন যে আসামে এসেছিল এক বুক আশা নিয়ে, সেই আসাম থেকে একদল মানুষ চলেছে আলিপুর দুয়ার নামক এক স্থানে কাজের সন্ধানে।
এক সময় জীবন একটু বসার জায়গা পায়। সেখানেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে সে। দুতিন ঘণ্টা ট্রেন চলার পর ভিড় একটু কমলে শুয়েও পড়তে পারে। ধীরে ধীরে ঘুম এসে যায় তার। ভোর চারটেয় ট্রেন এসে থামে শিলিগুড়ি। কি ভেবে কে জানে, সেখানে নেমে পড়ে জীবন। অনেকগুলো মাস এখানে কেটেছে। সেই প্রাণের টানেই কি? কিন্তু তা বা কি করে হয়। শিলিগুড়ি তাকে যা দিয়েছে সে তো বিশ্বাসঘাতকতা। আস্থা হনন। তবু এখানে নামে। জীবনের বহু অকারণ অবিবেচক সিদ্ধান্তের এটা আর একটা।
