এখানে চা হয় বটে তবে তার আসল ব্যবসা দুধের। জাতে যাদব। লোকটা দোকান দোকানে দিয়ে অবশিষ্ট যা দুধ থাকে তা দিয়ে দুই পাতে। দইয়ে লস্যি হয়। এই দোকানে বলা মাত্র কাজ পেয়ে যায় জীবন। হ্যাঁ হ্যাঁ কামমে তো আমি চাহিয়ে।
লোকটার উৎসাহ দেখে জীবন বলে–মাইনা দিবেন?
জরুর জরুর কিউ নেহি দেগা!
কত দিবেন?
কিতনা লেগা?
না, আপনে কন কত দিবেন?
দোটাইম খানা এক টাইম নাস্তা আউর মহিনামে বিশ দেনে সে চলেগা?
চলেগা কি দৌড়েগা। মনে মনে ভাবে জীবন-কাজ যা হোক আর যেমনই হোক মাইনেটা মাসে মাসে পেলে আর কোন কথাই নেই। যদি কেউ তাকে ঠকাতে চায় এক মাসের বেশি ঠকাতে পারবে না তাহলে। আর কাউকে বিশ্বাস করতে মন চায় না। বিশ্বাস কথাটা যেন মরে পচে ফালতু হয়ে গেছে ওর অভিধানে। কুকুর তুল্য জীবন ওকে শিক্ষা দিয়েছে মানুষের সমাজে তার মত মানুষের জন্য কোন সমবেদনা সহানুভূতি দায় দরদ আর অবশিষ্ট নেই। সে এই সময় সমাজের কাছে অবাঞ্ছিত অনভিপ্রেত একজীব। তাকে যে যতটুকু পারবে সুযোগ পেলে ঠকাতেই থাকবে। তাই এখন সময়টা একটু অনুকূল বিবেচনায় সে নিজের দুর্বলতা গোপন রেখে শর্ত চাপায়-মাহিনা কিন্তু মাসে মাসে নিমু।
দরাজ গলায় গ্রাম দেশের যাত্রা দলের শকুনি মামার মত চেহারার রোগা ছুঁচলো কাঁচা পাকা মোটা গোঁফের মালিক লুঙ্গি ফতুয়া পড়া বিহারি দোকানদার বলে–লে লেনা মাহিনা মাহিনামে। ইসমে মেরাহি আচ্ছা হ্যায়। জাদা বোঝ নেহী পড়ে গা।
কাজে নিযুক্ত হল জীবন। কাজ বলতে দুধের ড্রাম মাথায় করে লোকটার পিছন পিছন হাঁটা। আড়াই মোন ধানের বস্তা বওয়া বাপের ছেলে কুড়ি কিলো ওজনে ঘায়েল হয় না। কিন্তু ঘায়েল হয়ে যায় দুপুরে রাতে খাবার পাতে বসে। গোয়ালা লোকটার দেশে বউ মেয়ে সব আছে। এখানে সে থাকে তার দুই ছেলেকে নিয়ে। ছেলে দুটো মোষ চড়াতে মোষ দুইতেই ওস্তাদ নয়, লাঠি চালানো কুস্তি এসবেও সমান দক্ষ। সারা শরাবভাট্টি অঞ্চলে তাদের সমকক্ষ পালোয়ান আর একজনও নেই। রোজ সকালে তারা নিয়ম করে বুকডন ডনবৈঠক মারে। আর বিকালে যায় কুস্তির আখরায়। ধোবিপাট খেয়ে থোবিপাট দিয়ে তারা যখন ঘরে ফিরে খেতে বসে প্রায় দিনই ভুলে যায় যে খাবার লোক একজন বেড়ে গেছে। যার জন্য কিছু ফেলে রাখার দরকার আছে। বিহারিরা বাঙালীদের মতো ভাতের ভক্ত নয়, ছাতু রুটি তাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু জীবনের ভাতের জন্য বড় প্রাণ আনচান করে। সে কষ্ট যদি বা ভোলা যায়, না খাওয়ার কষ্ট ভোলে কি করে! বিশেষতঃ যখন দুটাইম খেতে দেবার কড়ারে তাকে দিয়ে শহরময় বোঝা বওয়ানো হয়।
আরো একটা কারণে সে বড় কাতর হয়, সেটা কামাখ্যা দেবীর মন্দিরদর্শন করে ফেরত আসা তীর্থযাত্রীদের কথপোকথনে। কোথায় জাদু মন্তর বাপ! কোন কালে তা থাকলেও থাকতে পারে। এখন ওসব কিছু আর নেই টেই।
একটু একটু করে জীবনের কিশোর চৈতন্য বাস্তবতার কঠোর আঘাতে অলীক উড়ান থেকে যথার্থতার ধরাতলে নেমে আসে। চারদিকে তাকায়। স্টেশন থেকে এই শরাবভাট্টির চৌমাথা পর্যন্ত। চারপাশে অসংখ্য অনাহার অভাবজনিত নত নজ মানুষ। তথাকথিত জাদুর দেশে বাস করেও যাদের আজো সেই জাদুকাঠির সন্ধান জানা হয় নি, যা জানলে জীবন সুন্দর হয় সম্পন্ন হয়। পেট পিঠের সাথে সেঁটে যাওয়া, বুকের হাড় দাঁত বের করে ভেংচি কাটা সেইসব মানুষের স্বপ্নহারা দুচোখ জুড়ে শুধু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কালো ছায়ার নাচন। মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা কথা বলেছে রাজা। কোথায় এখানে পথে পথে পড়ে থাকা সেই তামার টুকরো, যাকে পয়সা বলে! যা দিয়ে পেটের ভাত পরনের ন্যাতা পাওয়া যায়? নেই, এখানেও ওসব নেই। নেই বলেই এখানেও মানুষ অভাবে আছে। অনাহারে আছে।
তবে আর আসামে থেকে কি হবে! চিনির বলদ যেমন সারা জন্ম চিনির বোঝা বয় কিন্তু এক দানা চিনি খেতে পায় না। বড় দুধের ড্রাম মাথায় করে বওয়া জীবন জানেনা দুধের স্বাদ কেমন। যে মানুষ কিলো কিলো দুধের যোগানদার সে নিজেই এক ফোঁটা দুধ মুখে তোলেনা, আর জীবন তো সাধারণ এক চাকর মাত্র। কেন তার পেছনে হিসেবি মালিক অপচয় করবে সেই দ্রব্য যা দামে বিক্রি হবে।
মানুষের সমাজে এক বিচিত্র নিয়ম আছে। যে ময়রা মিষ্টান্ন তৈয়ারি করে সেমিষ্টি খায় না।সে ছোটে তেল মশলা ঝাল কোন খাবারের দিকে। যে দোকানদার তেলেভাজা ভাজে, সে বড় আয়েশ করে মুড়কি বাদাম ছাপা খায়, তেলেভাজা মুখে তুলতে রাজি হয় না। সেই নিয়মে কিনা কে জানে। এই দুধওলা কোনদিন দুধ খায় না। সে সন্ধ্যে হলে ছোটে দেশী মদের দোকানে। আর মদ খেয়ে একটু নেশা হয়ে গেলে সে কবে কোন কালে একবার কলকাতা গিয়ে কিছু কাল ছিল তখন বাঙালিরা তার সাথে কি দুর্ব্যবহার করেছে সেই কথা তার মনে পড়ে যায়। আর তখন অকারণেই জীবনকে স্রেফ বাঙালী হবার অপরাধে যাচ্ছেতাই গালাগাল দেয়। বাঙালী নামক এই জাতটার যে এতদোষ তা আগে জীবন জানত না। এই জাতটার মেয়েদের সতীত্ব বলে কোন জিনিস নেই। তাগড়া পুরুষ পেলেই নাকি তার কাছে শুয়ে পড়ে। খাদ্যাখাদ্য বিষয়ে কোন বাছ বিচার নেই। মাছ তা সে যে কয়মাসের পচা হোক, খেয়ে নেয়। এমনিতে দুর্বল, কিন্তু ঝগড়া কোন্দল পেলে নাওয়া খাওয়া ভুলে তাতে মেতে থাকে। আর মিথ্যা ছাড়া সত্যি কোন দিন বলে না। যার খায় তার দেয় না। এমন যে দুধ, তার দাম পর্যন্ত মেরে দেয়। প্রায় রোজই এত বাঙলী নিন্দা শুনতে শুনতে কান যেন ঝালাপালা হয়ে যায় জীবনের।
