সে যা হোক এখন জীবনের এক মুঠো খাদ্য দরকার। বাদবাকি ভাবনা তার পরে। এখনই শরীর ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছে। আজকেও কিছু খেতে না পেলে কাল আরো দুর্বল হয়ে যাবে। পরশু নিজেকে আর দুপায়ের উপর দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না। তারপরের দিন শুয়ে পড়তে হবে। এ সব জীবন জানে, তাই এখনই শরীর আরো বেশি অক্ষম হয়ে যাবার আগে যে করে হোক একটু কিছু খাবার ব্যবস্থা করতে হবে।
এখানে তার সহজ পথ কি? পথ একটাই কোন হোটেলে রেস্টুরেন্টে চা দোকানে যা সে পারে সেই থালাগেলাস ধোবার কাজে লেগে পড়া। মোট কথা এখন একটা কাজ চাই। যা হোক আর যেমন হোক দুটো খেতে পেলেই চলবে। যদি মাইনে ফাইনে না পাওয়া যায় সে আর কি করা যাবে। সে সেই আশায় বড় রাস্তা ধরে হেঁটে সামনে আগায়।
আপনে গো কামের লোক লাগবে?
রাস্তার বা পাশে এক পাঞ্জাবির বড় দোকান। চা মিষ্টি নোনতা শো কেসে সাজানো রকমারি খাবার। খদ্দের যেন উপছে পড়ছে। পাঁচ ছয় জন কর্মচারী ব্যস্ত সমস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। সেই দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দোকানদার ওকে ভিখারি ভেবে কুকুর খেদা দেয়, যা! ভাগ। নেহী তো বদনপে গরম পানী ডাল দেগা। তখন বলে জীবন, মুই ভিখারি না, কামের তলাশে আইছি। আগে এক মিষ্টির দোকানে কাম করেছি। বেবাক কাম জানি।
হিন্দিতে জানতে চায় মাথায় পাগড়ি মুখে দাড়ি হাতে বালা পড়া মধ্যম বয়সি দোকানদার–কোথায় কাজ করেছিস?
শিলিগুড়ি।
শিলিগুড়ি থেকে সোজা আসাম!
চব্বিশ ঘণ্টার ট্রেন যাত্রা করে এতপথ পাড়ি দিয়ে মিষ্টির দোকানে কাজ করতে আসায় দোকানদার বিস্মিত–শিলিগুড়িতে আর দোকান নেই?
ফালতু কথায় নষ্ট করবার মতো সময় আমার হাতে নাই। আপনে কাম দিলে কন। মাইনা ফাইনা লাগবে না, শুধু খাওয়া। নইলে আমি যাই।
এখানে তোক কে চেনে?
ক্যামনে চেনবে আইজই তো আইছি।
তাহলে কাজ হবে না। চুরি ফুরি করে পালালে তখন কি করব। যাও রাস্তা মাগো, আগে বাড়ো।
সময়টা সেই সময় যখন আসামের ভাগ্যাকাশে দেখা দিয়েছে একখণ্ড কালো মেঘ। যা অচিরেই বঙ্গাল খেদাও নামক এক সুপার সাইক্লোন হয়ে আছড়ে পড়বে আসামের সর্বত্র। ডিগবয় ডিব্ৰুগড় তিনসুকিয়া জোড়হাট গৌহাটি জুড়ে এক বিধ্বংসী তাণ্ডব চলবে প্রায় এক দশক ধরে। ঘর বাড়ি পুড়বে, দোকান লুঠপাট হবে, মানুষ মরবে। ইতিমধ্যেই তার কিছু কিছু লক্ষণ প্রকাশ হতে শুরু করেছে। কদিন আগে এখানে অহমিয়া আর বঙ্গালে তুমুল এক সংঘর্ষ হয়ে গেছে। পথে পথে এখনো পড়ে আছে ইটের টুকরো সোডার বোতলের ভাঙা কাঁচ। সেই পথ মাড়িয়ে বেঁচে থাকার এক আদিম অভীপ্সায় সামনে আগায় এক অনাহারী বালক।
কাজ একটা চাই। আসামে যখন পৌঁছানো গেছে কটা দিন এখানে থাকার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। তারপর খুঁজতে হবে কামরূপ কামাক্ষার সেই মন্দির। যার চারদিকে নাকি ঘিরে আছে ফণীমনসার দুর্ভেদ্য জঙ্গল। যে জঙ্গল পার হওয়া মানুষের পক্ষে অতীব কঠিন। সেই মন্দিরকে নাকি পাহারা দেয় সুন্দরী সুসজ্জিত প্রমিলা বাহিনী। যারা যাদু মন্ত্র জানে। তারা নাকি নাগালের মধ্যে কোন পুরুষ লোককে পেলেই মন্ত্র শক্তিতে ভেড়া বানিয়ে রাখে। এত বাধা বিপত্তি ঠেলে যদি কোন সাহসী মানুষ সেখানে পৌঁছে যেতে পারে আর কোনভাবে শিখে নিতে পারে কিছু মন্ত্র, তখন সারা পৃথিবী তার হাতের মুঠোয় চলে আসে। এ সব গল্প ছোট বেলা থেকে বহুবার শুনেছে জীবন। এই জীবনের আর কি দাম? কুকুরের মুখ থেকে খাবার কেড়ে খেয়ে কুকুর গোত্র তো হয়েই গেছে। এখন যদি তাকে কেউ ভেড়া বানিয়ে দেয় তো দিক না। ভেড়া এমন কী খারাপ জীব। ভেড়ারা আর যাই হোক না খেয়ে তো থাকে না।
রাস্তা ধরে এই সব ভাবে আর সামনের দিকে হাঁটে এবং কোন হোটেল রেস্টুরেন্ট মিষ্টির দোকান দেখলে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। জানতে চায়, আপনের দোকানে কামে লোক লাগবে?
আমি বড় দুঃখী গো বাবু। বড় গরিব। কেউ আমাকে রাখো না কোনও কাজে। আমার বাবা এক বস্তা ধান একা মাথায় তুলে দুক্রোশ পথ বয়ে নিয়ে যেতে পারত। সেই বাপের ছেলে আমি। খুব খাটতে পারি। আগে যেখানে কাজ করেছি আমার পরিশ্রম দেখে সবাই ধন্য ধন্য করেছে। নেবে আমাকে কেউ?
কে নেবে। কেন নেবে? সময় বড় সংক্রামক বড় সন্দেহজনক। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। কে জানে যদি সুযোগ পেলে সব কিছু ফাঁকা করে পালিয়ে যায়। যারা সৎ যারা সাবধানী তারা অচেনা অজানা লোক বিষয়ে বড় ভীত। জানতে চায়, কে তোমাকে চেনে! কে গ্যারান্টি নেবে তোমার সতোর!
নেই তেমন কেউ জীবনের জন্য সারা আসামে, শুধু আসাম কেন সারা ভারতে সারা পৃথিবীতে নেই। কেউ বলবে না, একে আমি পরিপূর্ণভাবে চিনি, কেবল চিনি না, এর সততা সম্বন্ধে একশো ভাগ নিঃসন্দেহ।
তাই সৎ সাবধান ভীত লোকেরা এমন উটকো লোককে কাজে রাখবে না। তবু হাল ছাড়তে পারে না জীবন। হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বিদেশের পথে বসে পড়ায় সমস্যার কোন সমাধান হবে না। সেটুকু বোঝে সে। তাই স্রেফ আশা আঁকড়ে আবার সামনে আগায়।
সূর্য যখন ঠিক মাথার উপর। তার শরীর গলে গলে যেন আগুন হয়ে নিচে নামছে। সে আগুনে জীবনের সারা দেহ জ্বলে যাচ্ছে। আগুন তো জীবনের পেটেও। নাড়ি ভুড়িগুলো যেন আগুনে পোড়া অজগরের মত মোচরাচ্ছে। আর যেন দেহটা দুপায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। যেন এখনই গোড়া কাটা গাছের মতো লুটিয়ে পড়বে। সেই শরীরটাকে শামুকের খোলের মতো টেনে এনে দাঁড় করায় ভাঙা চোরা একটা দোকানের সামনে। এটা এক বিহারির চা দোকান।
