দোকানদার সরল সোজা মানুষ। অনেক কটা শাড়ি বিক্রির লোভে সে আহ্লাদিত। তা ছাড়া যার ছেলে এখানে থাকছে তাকে অবিশ্বাস কীসের। সে লোকটাকে যেতে দেয়।
এ সব কথা জীবন সেলুনে থাকার জন্য শুনতে পায় নি। তাকে শোনাবার জন্য তো বলা হয়নি। শুনলে স্রেফ শব্দ, বাক্য থেকে নিহিত মর্মার্থকী বুঝতে পারত। যে বয়স মানব চরিত্রের এই অনাবিষ্কৃত রহস্য অনুধাবন করায় সে ক্ষমতা তার কি তখনো হয়েছে। সে বুঝতে অল্প কিছু সময় বাকি ছিলো। জীবন সেলুন থেকে বের হবার পর কাপড় দোকানদার ডাকে–এই ছেলে এখানে এসো বসো। তোমার বাবা এক্ষুণি আসবে। সেলুন অলাকেও বলে দেয় সে–একটু পরে এর বাবা এসে পয়সা দেবে। তার এই
জীবনের আর কি করার আছে অপেক্ষা করা ছাড়া? এক ঘন্টা দু’ঘন্টা করে সময় কেটে যায়। বিকেল ফুরিয়ে গিয়ে সন্ধ্যা ঘনায়। সে আর আসে না। সে ফেরেনা বলে দোকানদারও জীবনকে দোকান ছেড়ে নড়তে চড়তে দেয় না। বলে তোর বাপ না এলে তোকে ছাড়ব না। কোথায় কত দুরে বাড়ি তোদের? বাজারের চারদিকে খবর ছড়ায়। বহুলোক ভিড় করে জীবনকে ঘিরে। চলে জিজ্ঞাসাবাদ চলে চড় চাপড়। চোর চিটিংবাজের যা সাজা। এক প্রস্ত সাধারণ মারের পর তাকে চালান করা হয় বাজার কমিটির দপ্তরে। শুরু হয় অসাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ। সে যত বলে আমি লোকটাকে চিনি না, ট্রেনে আলাপ, কেউ সে কথা বিশ্বাস করে না। যত বিশ্বাস করে না তত “সত্য” জানবার চেষ্টায় নির্দয় হয়ে ওঠে কমিটির মানুষ। কার যেন একটা জোরালো ঘুষি এসে পড়ে জীবনের বুকে, বল তোর দলের লোক কোথায় গেছে? অনাহারে দুর্বল ক্লান্ত জীবনের ছোট্ট শরীর সে সজোর ঘুষির ধকল সহ্য করতে পারে না। মাটিতে আছড়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। জীবন তার এই অল্প পরিধির জীবনে অনেকবার মার খেয়েছে কিন্তু অজ্ঞান কখনো হয় নি। অজ্ঞান হবার একটা মস্ত সুবিধা যে তারপর মারলে আর কষ্ট হয় না।
যখন তার জ্ঞান ফেরে দেখে মাথা মুখ সব ভেজা।এ সব জ্ঞান ফেরাবার জন্য সাধারণ জনতার সাধারণ উপাচার। জীবন অজ্ঞান হবার পর শালা নাটক করছে ভেবে আর দু এক ঘা দেবার পরও যখন সে নড়ে না, তখন তারা চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়েছে। মরে ফরে গেলে মহা হ্যাপা হবে ভেবে দোকানদার জীবনের জ্ঞান ফেরার পর তাকে গরম দুধ খাইয়ে, নিজের অদৃষ্টকে যথেচ্ছা গালাগালি দিয়ে, যা ক্ষতি হয়েছে মেনে নিয়ে, আর না ক্ষতি হোক সেই কারণে ওকে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে ট্রেনে তুলে দেয়। সে ট্রেন গৌহাটি যাবে। যে ট্রেন বিকেল চারটেয় নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ছেড়ে রাত দশটায় এখানে পৌঁছেছে। মার খেয়ে যতটা কষ্ট হয়েছিল তার খানিকটা কমে গেল আসাম যাবার ট্রেনের কামরায় উঠে। ওরা বলাবলি করছিল পুলিশে দিয়ে দেবে, জেল খাটাবে। তা যখন করে নি সেটাকে জীবন নিজের পরম ভাগ্য বলে মন করল এখন। এই রাত আঁধারে ওরা মেরে রেল লাইনে শুইয়ে দিলেই বা তার কি করার ছিলো। তাও বলে ছিল ওরা। তোর দলের আর একজন কোথায় থাকে বলে দে। না হলে মেরে লাইনে শুইয়ে দেবো।
রাত দশটায় ট্রেনে উঠেছিল জীবন। একরাশ দুশ্চিন্তা আর এক পাহাড় শারীরিক কষ্ট নিয়ে সে এখন পায়খানা বাথরুমে যাবার গলির মধ্যে থুতু ধুলো বিড়ির টুকরো বাদাম খোলা লেবুর খোসা শাল পাতা, ছেঁড়া কাগজের টুকরো ইত্যাকার আবর্জনার মধ্যে শুয়ে পড়ে। যা ভাগ্যে আছে এর বাইরে সে আর কিছু ভাবতে পারে না। ভাবতে চায় ও না।
… ঝমঝম করে চলছে রাতের ট্রেন। এখন ট্রেনে সেই দিনের মত চেঁচামেচি নেই। এক আধঘন্টা নাগাড়ে চলবার পর কোথাও গিয়ে ট্রেন থামে। তখন একদল নেমে যায় আর একদল ওঠে। তাদের ছেড়ে যাওয়া স্থান দখল করে। জীবনের সে সব দিকে কোন খেয়াল দেবার দরকার পড়ে না। সে শুয়ে থাকে সেই অনারোগ্য রোগের রোগীর মত যাকে ডাক্তার বলে দিয়েছে কোন আশা নেই। ভগবানকে ডাকো, যা কিছু করার সেই করতে পারে। সবটা এখন তারই হাতে।
নিজের জন্য জীবনের যা যা করার ছিল সবটা সাধ্যমত করেছে। এর মধ্যে কোন ফাঁকি চালাকি নেই। আর তার করার মত কিছু নেই। এবার যা হবার তা হোক। তার আর কোন ভয় ভাবনা চঞ্চলতা উত্তেজনা কিছুই থাকে না। চুপচাপ কুকুর কুণ্ডলি পাকিয়ে মরার মতো পড়ে থাকে। লোকেরা তাকে ডিঙিয়ে পায়খানা বাথরুমে আসা যাওয়া করে। রাত বাড়ে।
টিকিট।
চোখ কচলে তাকায় জীবন শব্দ লক্ষ্য করে। সামনের আলো আঁধারিতে দণ্ডায়মান কালো কোট পড়া গুফো ষণ্ডা চেহারার এক চেকার। শুয়ে শুয়ে হাত নাড়ে জীবন–নেই।
উতার যা!
কোথায় কোন এক অন্ধকার স্টেশনে দাঁড়িয়েছে ট্রেন। বাধ্য ছেলের মত সেখানে নেমে পড়ে জীবন। দু’চার বগি পার হয়ে গিয়ে ফের একটা কামরায় উঠে আবার সেই একই ভাবে একই জায়গায় গিয়ে শয্যা নেয়। কিছুক্ষণ ট্রেন চলার পর আবার এক অন্য চেকারে তাকে নামিয়ে দেয়। যথারীতি জীবনও আর এক কামরায় গিয়ে ওঠে। এভাবেই সকাল হয়।
বেলা দশ কী এগারোটায় ট্রেন এসে পৌঁছাল সেই কাঙ্খিত ধাম। আসাম এর এক শহর গৌহাটিতে। এসময়ে প্লাটফর্ম বেশ কঁকাই। সামান্য কিছু লোক এদিক সেদিক ঘুরছে, জটলা করছে। স্টেশনের স্টলগুলোয় তেমন একটা খদ্দরের ভিড় নেই। সব যেন জাবর কাটছে এমন অলসতা ছেয়ে আছে। সেগুলোকে বৃত্ত করে একজন নীল প্যান্ট নীল জামা পড়া বুড়ো ঝাড়ুদার লাঠির ডগায় বাধা ঝাটা দিয়ে প্লাটফর্ম ঝাট দিচ্ছে। স্টেশনটা বেশ সাফসুতরো। পাগল মাতাল জুয়াড়ি ভিখারি দেখা যাচ্ছেনা এখানে। জীবন মন্থর পায়ে প্লাটফর্ম থেকে বাইরে খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়ায়। রোদ এখন বেশ কড়া হয়ে নামছে। সে রোদে যেন খা খা করছে চারদিক। দূরে দেখা যাচ্ছে আকাশের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সার সার ছোট বড় পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে সবুজ পত্রসার বৃক্ষ। কিন্তু এখন প্রকৃতির এসব দৃশ্যপট মুগ্ধ হয়ে দেখবার সময় নয়। এখন মাথার উপর যেমন সুর্য জ্বলছে পেটে জ্বলছে ক্ষুধার আগুন। জঠরাগ্নি নির্বাপণের জন্য এখন একটু খাদ্য দরকার। কিন্তু সে তো কেউ এমনি এমনি দেবে না। রাজা বলেছিলো, এখানে নাকি পথে ঘাটে পয়সার ছড়াছড়ি। স্টেশনের বাইরের জগতটা দেখে তার কথার উপর কেন কে জানে ভরসা থাকে না জীবনের।মনে কুডাক ডেকে ওঠে। এস্থানও কলকাতা নিউ জলপাইগুড়ি শিলিগুড়ির চেয়ে আলাদা কিছু নয়। পথ ঘাট ঘর বাড়ি দোকানপসার মানুষ জন সবই তো সেই এক রকম। মনে হয় জীবনের যে আশায় বুক বেঁধে সে বহু ক্লেশ সয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে সে আশা আশাই রয়ে যাবে। কোন সার্থকতার সংবাদ বহন করে আনবে এখনো তেমন প্রত্যয় হয় না।
