জীবনের এখন ঘুম পায়। সে দরজার ডান দিকে গামছা পেতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ থাকায় জীবন এখন দেখতে পাচ্ছে না এখানকার প্রকৃতি পরিবেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অকৃত্রিম সৌন্দর্য্য। সামনে কিছু পাতলা গাছ গাছালির ওপারে দাঁড়িয়ে আছে যুগযুগান্তরের ঘুমন্ত পাহাড়। যার ন্যাড়া মাথায় সূর্যের আলো পড়ে আয়নার মত ঠিকরে যাচ্ছে। সেই পাহাড়কে যেন কেউ কোন অদৃশ্য নদীর উপর বসিয়ে দিয়েছে। যে নদীতাকে ভাটার টানে ছোট নৌকার মতো মোহনার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রেন যত সামনে আগায় সে তত পিছনে ছোটে।
ট্রেনখানা কিছুক্ষণ চলার পর শুরু হয় আরো ঘন আরো গভীর বন। এক আদিম অনাবিল সবুজ অন্ধকার ঢেকে ফেলল এই অতিকায় যন্ত্রনখানাকে। শুধু জঙ্গলই নয় এরই সাথে রয়েছে ছোট খাটো পাহাড়। পাহাড় কেটে কোথাও কোথাও বানানো হয়েছে রেল যাত্রার লৌহ পথ। সেই পথে ঝমঝম বাজনা বাজিয়ে ছুটতে থাকে গৌহাটি মেল। আর জীবন চিন্তারহিত এক নির্বিকল্প সমাধিতে সমর্পিত হয়ে দরজার কাছে টানটান হয়ে শুয়ে থাকে। ঘুম নয় ওর যা আসে তা ঝিমুনি, তা যেন চোখ বুজে কোন পরিণতির জন্য প্রতীক্ষা।
যখন ওর ঝিমুনি কেটে গেল তখন বেলা একটু হেলে গেছে। দু’তিন ঘন্টা আগে পেটের এক সমুদ্র খিদের মধ্যে যে দেড়খানা রুটি পড়েছিল, তা কখন যেন গলে জল হয়ে গেছে। এখন আবার সেই পেট মোচড়ান শুরু হয়ে গেছে। আবার সেই চোখ কেমন ঘোলাটে হচ্ছে আর কান ঝা ঝাঁ করা ধরেছে। মানুষ তো অভ্যাসের দাস। আগে না খেতে খেতে সেটাই অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এখন সে অভ্যাস নিজের দোষে নষ্ট করে ফেলেছে জীবন। জিভের এখন লোভ বেড়ে গেছে। সে আর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারছে না।
হঠাৎ যেন জীবনের মনোকষ্টের কথা বুঝতে পেরে তার সামনে ঈশ্বরের প্রেরিত কোন মহান মানবের মত এসে দাঁড়াল একজন লোক। লোকটা মাঝবয়সী মাথায় কাঁচা পাকা চুল। মুখে মৃদু হাসি। দুটো চোখে যেন উপছে পড়ছে স্বর্গীয় মমত্ব। যা মানুষের সমাজে আজকে বড় দুর্লভ। গলায় তার গভীর আদর স্নেহ দরদ, এই বাচ্চা তুই কোথায় যাবি রে বাবা?
গ্রাম দেশের পাঠশালার মাষ্টার মশাইয়ের মত চেহারার এই লোকটার কথা শুনে, চোখ তুলে তাকাল জীবন। গলায় জোর ছিল না তার। রোগীর কাতরানোর মত জবাব দিল সে, এই টেরেন যেইখান যাবে, সেইখানে যামু আমি।
কোথায় যাবে এই ট্রেন তা জানিস?
মাথা নেড়ে জানায় জীবন, সে জানে। তারপর বলে আমি কামের তালাশে বাইর হইছি। যাইতে আছি আসাম। দেখি হেইখানে গিয়া যদি কোন কাম কাজ পাই।
কোথায় তোর বাড়ি?
বাড়ি নাই আমাগো। বাপ মা ক্যাম্পে থাকে।
ঘনিষ্ট হয়ে দয়াবান লোকটা জীবনের কাছ থেকে একে একে তার সব কথা জেনে নেয়। গাঠের পয়সা খরচ করে জীবনকে চা পাউরুটি মিশন খাওয়ায়।
মানুষ জীবন তার ছোট জীবনে অনেক দেখছে। কিন্তু এমন মানবিক ব্যবহার আর দেখে নি। কেউ তার সাথে এত দরদ ভরা আত্মীয় ভাষায় কথা বলে নি। তার নোংরা পোষাক অপরিচর্চা অনাকর্ষক চেহারা, তার দুরবস্থা সর্বদাই মানুষের ঘৃণা কখনো কখনো নামমাত্র অনুকম্পা জুটিয়েছে। কিন্তু এই গ্রাম্য শিক্ষক গোছের লোকটা যেন একটু অন্য ধরনের। সে যেন জীবনকে, তার অসহনিয় অবস্থাকে সম্যক উপলব্ধি করে সেই কর্তব্য করছেন যা প্রকৃত পক্ষে একজন দরদী মানুষই করতে পারে। তাই জীবন কৃতার্থ বোধ করে।
লোকটা কি এক বেদনায় কিছুক্ষণ মৌন হয়ে থাকেন। শেষে আবার বলেন–কাল থেকে কিছু খাসনি। আহারে! সামনের স্টেশনে আমি নামব। চল তুই আমার বাড়ি। কটা দিন আমার বাড়ি থেকে খেয়ে তারপর যদি আসাম যেতে চাস তো যাস। পথ খরচার কটা টাকা সে না হয় বাবার মত আমার কাছ থেকে নিয়ে নিবি। লোকটার কথায় প্রলোভন ছিল, সম্মোহন ছিল, দরদ ছিল যা এড়াতে পারে না জীবন। পরে স্টেশনে ট্রেন থামলে সে তার পিছন পিছন হেঁটে যায়। হেঁটে যায় জীবন আর এক অভিজ্ঞার দিকে। জীবন তো নিত্য নতুন এক যাত্রার মধ্য দিয়ে বিশ্ব জগতটাকে চিনে নেবার আর এক নাম। হোঁচট ঠোকরে ক্ষত বিক্ষত হয়ে পথে পথে রক্ত ছড়িয়ে যাবার নাম।
স্টেশনটা খুব বড় নয়, তবে একেবারে ছোটও বলা যাবে না। প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে দক্ষিণমুখো ইট বিছানো রাস্তা। রাস্তার পাশে বেশ কিছু গাছ গাছালিতে ঘেরা ছায়াদার পরিবেশ। সেখানে বৈকালিন বাজারের আয়োজন। স্থানীয় চাষীরা তাদের ক্ষেত্রের নানাবিধ ফসল নিয়ে এসেছে বেচতে। সে সব ছাড়িয়ে সামনে আগালে কিছু জামা কাপড় শাড়ি সায়ার দোকান। দরিদ্র অঞ্চলের দরিদ্র দোকান। দোকানদারও তত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির জাত ব্যবসায়ী শ্রেণির নয়।
দোকানে ঢুকে লোকটা দোকানদারকে বলে, ভাল দেখে শাড়ি দেখাও তো দুটো নেবো। আর আমার এই ছেলেটার জন্য একটা প্যান্ট একটা জামা। দামী জামা প্যান্ট জীবনের অঙ্গে কখনো ওঠেনি। জামা প্যান্টের রঙ দেখে দাম শুনে সে আনন্দে আপ্লুত হয়ে ওঠে। কিন্তু হাতে নেবার আগেই বলে লোকটা, তুই এক কাজ কর, আগে চুলটা কেটে নে। আমি ততক্ষণে তোর মায়ের জন্য শাড়ি দেখি।
সেলুন রাস্তার ও পাশে। জীবনকে সেখানে বসিয়ে দিয়ে এসে ফের শাড়ি বাছাই করে লোকটা। দাম নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই। ভালো জিনিসের তো ভাল দাম হবেই। চিন্তা একটাই, বউয়ের পছন্দ হবে কিনা। অনেক বেছে অনেক ভেবে শেষে বলে সে–এক কাজ করো ভাই, যদি কোন অসুবিধা না হয় গোটা চার পাঁচ শাড়ি আমাকে দিয়ে দাও। এই তো পাশেই আমার বাড়ি, যেতে পাঁচ মিনিট আসতে পাঁচ মিনিট। দু-তিনটে যা বউ পছন্দ করবে রেখে দেব। ছেলেটার চুল কাটা হয়ে গেলে এখানে বসতে বোলো।
