এই গণিতের কারণে জীবন এখন একটা ফালতু মানুষ। তাকে কেন কেউ কিছু দেবে! তাই জীবনকে, তার মত হাজার হাজার মানুষকে, না খেয়ে থাকতে হবে।
জীবন এখন শোয়া থেকে উঠে বসে। উঠে বসতে বাধ্য হয়। এক থেমে যাওয়া ট্রেনের এক ব্যস্তযাত্রীর পায়ের বুটে তার হাতের আঙুল চেপে যাবার জন্য। তাকিয়ে দেখে সূর্য মাটি ছেড়ে আট দশ ফুট উপরে উঠে গেছে। যা এক বড় গাছের আড়ালে আছে বলে ব্রিজের উপর বিশেষ রোদ ফেলতে পারে নি। তখনই জীবন এক জনের কাছে জানতে চায়–ওইটা কোন গাড়ি? যাইবো কই? চলে যেতে যেতে বলে যায় সে, গৌহাটি মেল।
গৌহাটি মেল! থেমে থাকা ওই ট্রেনখানা সেই ট্রেন যে আসাম যাচ্ছে! জীবন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে চারিদিকে তাকায়। আছে, একটা সুযোগ আছে। ট্রেন ছাড়ার সাথে সাথে দৌড়ে সামনের ওই ফাঁকা কামরায় উঠে পড়ায় কোন অসুবিধা হবেনা। চেকার পুলিশ সব প্লাটফর্মের উপর। একবার চলন্ত ট্রেনে উঠে গেলে ওরা আর কি করবে? যেই মত ভাবা, সেই মতো কাজ। একটু পরেই গার্ড সাহেব তার হাতের নীল পতাকা উড়িয়ে মুখের বাঁশি বাজিয়ে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল গাড়ি ছাড়ার। ড্রাইভার ইঞ্জিনের হুইসেল বাজিয়ে হুকুম মতো গাড়িকে চালাবার প্রস্তুতি নিল। জীবন ছুটে গিয়ে উঠে পড়ল একটা কামরায়। গাড়ির চলা শুরু হল। তখন সে তার সেই নিজস্ব স্থান উল্টোদিকের দরজায় গিয়ে বসে পড়ল। এ ট্রেন বড় অহংকারী। ছোটখাটো স্টেশনে থামে না। প্রায় আধঘন্টা চলার পর যেখানে থামে, সেসব জমজমাট স্টেশন, জংশন।
এভাবে প্রায় দুই তিন ঘন্টা চলবার পরে পৌঁছাল এক জংশনে। এখানে ইঞ্জিন জল ভরছে বা ইঞ্জিন বদল হচ্ছে সেই কারণে ট্রেন ছাড়তে বৈশ বিলম্ব হচ্ছে। বেলা এখন দশটা কি সাড়ে দশটা। এটা লোকেদের টিফিনের সময়। জীবন উল্টো দিকের দরজায় বাইরের দিকে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। হঠাৎ তার চোখ গেল সামনের জানলার দিকে। জানলা থেকে একটা মোটা লোমশ হাত বাইরে বের হল। সে হাতে শাল পাতার একটা ঠোঙা। হাতটা বড় অবহেলায় সেই ঠোঙাটা ছুঁড়ে ফেলে দিল ওপাশের রেল লাইনের উপর। সেটা উঁচু থেকে নিচে পড়ার সাথে সাথে খুলে গেল। তখন দেখতে পেল জীবন, ওর মধ্যে রয়েছে মোটা মোেটা দেড়খানা আটার লালরুটি, সাথে কিছু ভাজাভুজি।
রুটি দেখেই মনে পড়ল জীবনের সে অনেকদিন কিছু খায়নি। এবং যেগুলো কেউ অবহেলায় বিসর্জন দিয়েছে, তা একটা খাদ্য। সেই মুহূর্তে জীবন তার আত্মা পরমাত্মাকে গলা টিপে হত্যা করে দিল। আর সে যা কোনদিন করেনি কোনও দিন করতে হবে বলে ভাবে নি তাই করে বসল। তড়াক করে ট্রেন থেকে নেমে পড়ল রেল লাইনের উপর। তারপর ছুটে গিয়ে সেই ঠোঙাটা যেন কোনও বহুমুল্য ধন, এমনভাবে তুলেনিল। রুটি দেখে কটা ছাল ওঠা নেড়ি কুত্তাও সেটা অধিকার করবার আশায় ছুটে এসেছিলো। ওরা এই স্টেশনে থাকে, তাই জানে পৃথিবীতে এখনও এমন বহু মানুষ আছে যাদের কাছে ছুঁড়ে ফেলার মত প্রচুর ভাত রুটি থাকে। এখানে ট্রেন থামলেই তারা কিছু না কিছু ফেলে দিয়ে যায়। কুকুরেরা তাই ট্রেন এলেই লাইন ধরে হেঁটে হেঁটে বেড়ায়। ট্রেনের দরজায় জানালায় তাকায় কুঁই কুঁই করে। তারা এতদিন জানত যে মানুষ আর যাইহোক কুকুরের মতো হবে না কোন দিন। কিন্তু এখন দেখতে পেল মানুষের সমাজে মানুষের ছদ্মবেশে তাদের মত একজন কেউ লুকিয়ে আছে যে তাদের মুখের খাবার কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ থেকে কুকুর হয়ে কুকুরদের বঞ্চিত করছে তাদের কুকুরিক অধিকার থেকে।
জীবনের এমন অমানবিক অন্যায় ব্যবহার দেখে এক যোগে ঘেউ ঘেউ করে প্রতিবাদ জানাল তারা। তেড়ে এল রুটির ঠোঙা কেড়ে নেবার জন্য। জীবন একা ওরা অনেক। জীবন নিরীহ নিরস্ত্র ক্ষুধার্ত কিন্তু ওরা আক্রমণে অভ্যস্ত। দাঁতে অনেক ধার আছে ওদের। সে পিছন ফিরে ছুট মেরে পালায়। পালিয়ে কিছু দুরে গিয়ে আর এক কামরায় উঠে পড়ে। বসে পড়ে আবার দরজায় পা ঝুলিয়ে। তারপর আস্ত মোটা লাল গমের রুটিখানা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে গন্ধ সোকে। মনে হচ্ছে যেন ঘিয়ে ভাজা। তবে আজকের নয় কাল কিংবা পরশুর। ভাজাভুজিও অতটাই পুরানো। তাই ইটের মত শক্ত আর পুরাতন ভাজাভুজি থেকে মিলে মিশে পাওয়া যাচ্ছে কেমন একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ। সে ঘ্রাণে যেন মানুষকে মানুষ থেকে কুকুরের পর্যায়ে নামিয়ে এনে অন্ততঃ একটা দিন কঠোর জঠর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবার প্রলোভন আছে। সেই প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করে জীবন।
রুটি খেয়ে পেট ভরে জল খাবার পর তখন আসে সেই আত্মগ্লানী যা আগে আসে নি। কে যেন তখন বুকের ভিতর কেঁদে ওঠে। ছিঃ ছিঃ করে, ধিক্কার দেয়। শেষকালে তোর এত অধঃ পতন। কুকুরের মুখের খাবার কেড়ে খেলি! নিজেকে আর কত নিচে নামাবি জীবন? কিন্তু অসহায় জীবন এখন এ কথার কি জবাব দেবে? দেবার মতো জবাব কি তার এখন আছে? সে কোন জবাব দিতে পারে না। হয়ত এ দেশের হাজার হাজার মানুষ এই যন্ত্রণায় ডাস্টবিন ঘেঁটে খাবার খোঁজে।
যে কামরায় উঠেছে জীবন সেটা বেশ ফাঁকাই। যার হারাবার মত কোন সম্পদ নেই কোনকিছু পাবার আশা, পথ, সম্ভাবনা নেই, জীবনের সব চাওয়া পাওয়া যার ফুরিয়ে গেছে, কোন রকম শোক, দুঃখ ব্যথা বেদনা যাকে আর বিচলিত করে না, সে ঈশ্বরের পায়ে ভবিষ্যতের হাতে নিজেকে সমর্পন করে, যা হবার তা হোক বলে বসে আছে, সেই সাধক তপস্বী বা নিরাশ হতাশ মানুষের মত জীবন দরজায় হেলান দিয়ে বসে থাকে। ট্রেন চলা শুরু করলে গায়ে এসে লাগে গ্রাম বাংলার মাঠ মাটি জলাভূমি জঙ্গলের ফুরফুরে হাওয়া।
