সে আবার হাঁটা দেয়। দুর্বল পায়ের উপর যে অক্ষম শরীর তার উপর ঝিম ঝিম করা বোধহীন যে ফালতু মাথা সে সব টেনে টেনে যেন সামনে আগায়। আরো দেড় দু ঘন্টা চলার পর পৌঁছায়। আর এক স্টেশনে। সে স্টেশনে পৌঁছে জীবন অবাক। মনের ভুলে যেখানে লাইন থেকে নিচে নেমেছিল সেখান থেকে উল্টো দিকে হেঁটে চলে যায় নি তো। না হলে এখানেও সেই জনশুন্য মৃত নগরীর পুনরাবৃত্তি হল কেন? সেই রোদে জ্বলা খাঃ আঃ করা স্টেশন। যেখানে মানুষ তো বহুদূর, একটা কাক কুকুরও নেই।
এবার কি করবে জীবন? করার আর কিছু নেই চলা ছাড়া। যে করে হোক এখন একটা রেল স্টেশনে পৌঁছাতেই হবে যেখানে লোক জন আছে। যেখানে মেল ট্রেন যাত্রী তোলা নামানোর জন্য থামে। যেখানে ঘর বাড়ি দোকান পাট লোক জন কিছুই নেই সেখানে অপেক্ষা করা চরম মুখামি। তাই চালাকের মতো জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সোজা এগিয়ে যাওয়া রেল লাইন ধরে ধুঁকতে ধুঁকতে হাঁটে। হাটুর মালাইচাকি কন কন করছে, বুকে দাপাচ্ছে তৃষ্ণা, পেটে জ্বলছে আগুন, শরীর জ্বলছে রোদে, সব কিছু অস্বীকার করে সে উন্মাদের মত হেঁটে চলে। জঙ্গলের বানরগুলো অবাক হয়ে ওকে দেখে নিজেদের মধ্যে যেন কি বলাবলি করে। সে ভাষা অনুবাদ করতে পারলে জীবন হয়ত মানুষ সম্বন্ধে ওদের ধারণা জেনে মরমে মরে যেত।
সে যাই হোক শরীর তখন আর চলছে না। নিজের শরীর নিজের কাছে একটা বোঝা হয়ে গেছে। সেই বোঝা টেনে পরের স্টেশন গুলমায় পৌঁছাতে পারল, তখন ওর সামনে থেকে তির বেগে বের হয়ে গেল সেই চারটের আসাম মেল। সে ট্রেনও ওই স্টেশনকে যোগ্য বলে মনে করে নি এক মিনিট থেমে যাবার উপযুক্ত ভেবে।
ট্রেন চলে যাবার পর এই প্রথম একজন লোকের সাক্ষাৎ পেল জীবন। সে দু হাতে দুটো পতাকা যার একটা লাল একটা নীল, নিয়ে প্লাটফর্মে ধরে হেঁটে এসে জীবনের সামনে দাঁড়াল। ডানদিকে রেলের অফিস, সেদিকেই যাবে সে। ওদিকে গিয়েছিল ট্রেন পাশ করাতে। পতাকা নাড়িয়ে ট্রেনকে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দেওয়া তার কাজ।
জীনকে দেখে তার চোখে মুখে সারা শরীরে ঘনিয়ে উঠল চরম বিস্ময়। ঘন ঘোর জঙ্গল কুঁড়ে যে আসছে সে কে!
বলে সে–এ বাচ্চা, কাহা যায়েগা?
জীবন সরল গলায় জবাব দেয়–হাম আসাম যায়েগা।
তো পয়দল কিউ?
বলে জীবন–আমার কাছে তো গাড়ি ভাড়া নেই। তাই–
পতাকাবাহী লোকটার বিস্ময় আর সীমার মধ্যে থাকে না। একি পাগল নাকি। বারো, চোদ্দ ঘন্টার ট্রেন পথ আসাম। সেই আসামে যাচ্ছে পায়ে হেঁটে। পরের স্টেশনে পৌঁছাবার আগেই পথে রাত নামবে। জঙ্গল থেকে বের হবে শিকার সন্ধানী জন্তু জানোয়ার। তাদের সামনে পড়লে আর কি বাঁচবে?
বলে সে–আভি শিলিগুড়ি নেবালা ট্রেন হ্যায়। উসমে বইঠকে বাপস চলা যা। মরে গা কেয়া? আসাম বহুত দূর হ্যায় কেইসে যায়েগা পয়দল? আর বেশি কথা না বাড়িয়ে সে নিজের কক্ষে গিয়ে ঢোকে।
না, আর চলার ক্ষমতা নেই জীবনের। আজ আর আসাম যাবার কোন ট্রেনও নেই। এ স্টেশনের এখনই যা ভয়াবহ অবস্থা রাত নামলে কেমন হবে তার অনুমান করতে পেরে জীবন ভয়ে মুষড়ে পড়ে। এখন ফিরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।
ফিরে গেলে শিলিগুড়িতে আবার চেকারে ধরতে পারে। এক আধটা ধাক্কা কি চড় চাপড় দিতে পারে। জেলেও নিয়ে যেতে পারে। সে যা হয় তোক। এই ভেবে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে এসে বসে সে।
ট্রেন এল সন্ধ্যে ঘোর করে। জীবন তখন আগপাছ না ভেবে উঠে পড়ল সেই ফিরতি ট্রেনে। সবকটা স্টেশনে থেমে থেমে সে ট্রেন পৌঁছাল শিলিগুড়ি। জীবন ট্রেন থেকে নেমে অগুনতি চেকার, পুলিশের সামনে থেকে হেঁটে ওভার ব্রিজের উপর গিয়ে ওঠে। এখন তার দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে জীবনের। সে বসে পড়ে ব্রিজের উপর। তারপর গামছা বিছিয়ে শুয়ে পড়ে এবং এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কেউ তাকে বিরক্ত করে না। নিরুপদ্রবে রাতটা কেটে যায়। ব্রিজের উপর চিৎ শোয়া জীবন ঘুম ভেঙে চোখ মুছে প্রথমে আকাশ দেখতে পেল। একখানা কালো মেঘ উড়ে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে কোথায় গিয়ে মাটির টানে নিজেকে ঢেলে রৌদ্র তাপে ফুটিফাটা মাটিকে নরম কোমল করে দেবে তা কে জানে। এ বছর এখনো বৃষ্টি হয় নি। তবে হবে। মেঘে মেঘে তারই বজ্রগর্ভ সঞ্চার। জল পেয়ে জমিতে জাগবেশস্যের সম্ভাবনা।শস্য জাগাবে মানুষের আশা আকাঙ্খ আর বেঁচে থাকার সম্ভাব্য প্রতিশ্রুতি। মানুষ বাঁচলে বাঁচবে মানুষের সমাজ সভ্যতা আর মানুষের যা কিছু নির্মাণ শিল্প সৃজন।
কিন্তু সময়ের গতি প্রবাহ ধারা সব এখন উল্টো দিকে ছুটছে। প্রাকৃতিক নিয়মকে বদলে দিয়েছে মানুষ। মানুষ তার চতুর কৌশলে খরা বন্যা মহামারী মন্বন্তর বানাতে পারে। পারে কৃত্রিম অভাব বানিয়ে মানুষের জীবনকে কষ্টকর মরণ যন্ত্রণার আকর বানিয়ে দিতে, জীবন নামক এক কিশোরের জীবন এখন সেই পাহাড় সমান যন্ত্রণার নিচে চাপা পড়ে ছটফট করছে।
চিৎ থেকে কাত হয়ে দেখতে পায় সে স্টেশনের উপরে যে মিষ্টির দোকান তার ঘাড়ে গর্দানে মালিক একঝুড়ি গতকালের অবিক্রিত সিঙ্গারা, নিমকি, কচুরি প্ল্যাটফর্মের বাইরে একটা একটা করে ছুঁড়ছে, আর মুখে আঃ আঃ করে কাক ডাকছে। তা দেখে জীবনের পেটের খিদে গন গন করে। কষ্ট পায়, কান্না আসে। সে জানে ওরা মানুষ না খেয়ে মরে গেলেও তাকে খাবারগুলো দেবে না। কাক কুকুরকে এইজন্য দেবে, কারণ, তারা মানুষ নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নাকি এই রকমই। এই ব্যবস্থায় মানুষের প্রতি মানুষের নাকি দয়া, মায়া, স্নেহ, প্রেম–এসব আবেগ প্রকাশের বিশেষ কোন ভূমিকা নেই। যা আছে তা লেনদেনের হিসেবী সম্পর্ক। কিছু দেবার আগে সেই অংক দিয়ে হিসেব নিকেশ করে দেখে নেবে। যা দেওয়া হবে তা লাভজনক হয়ে ফিরে আসবে কিনা।
