তখনই জীবনের মাথায় আসে, এক স্টেশন পিছিয়ে গিয়ে যদি কলকাতামুখি ট্রেনে চাপা যায় তাহলে এক স্টেশন এগিয়ে গিয়ে আসাম ট্রেনে ওঠাও তো কঠিন নয়। এখন মনে হল তার, ছিঃ ছিঃ এই সহজ কথাটা এত দিন কেন মনে আসে নি। যতদিন শিলিগুড়ির পথে পথে ঘুরছি। ঘুরে ঘুরে মরছি, রেল লাইন ধরে হাঁটতে থাকলে হয়ত আসামেই পৌঁছে যেতাম। সে আর কাল বিলম্ব করে না। হাটা দেয় রেল লাইন ধরে।
সময় এখন সকাল সাত কি সাড়ে সাতটা। যত দূরই হোক বেলা বারোটা নাগাদ কি সামনের স্টেশনে পৌঁছে যেতে পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে। এক স্টেশন থেকে আর এক স্টেশন কত দুরে দুরে হয় সে তো তার জানা। তবে আর চিন্তা কীসের! শহর পার হয়ে আসবার পর সামনে পড়ল একটা কুয়ো। কিছু মহিলা সেখানে বালতি কলসিতে জল ভরছে। এক জনের কাছ থেকে চেয়ে অঞ্জলি ভরে খানিকটা জল খেয়ে নেয়। পথে আর কোন পানীয় জল পাওয়া যাবে কিনা তা কে জানে। খালি পেটে জল পড়ায়, পেটটা কন কন করে ওঠে। হাটার সময় খল খল করে। কিন্তু এত তুচ্ছ ব্যাপারে এখন জীবনের নজর দেবার সময় নেই। সে হাঁটতে থাকে।
দু’তিন কিলোমিটার চলার পর দেখে রেল লাইন দুদিকে বেঁকে গেছে। একটা বা দিকে অন্যটা ডানে। বা দিকে লাইনটা সরু। ওই লাইনে যে ট্রেন চলে তা ট্রামের চেয়ে সামান্য বড়। এর নাম ন্যারোগেজ। এ ট্রেন যায় দার্জিলিং। জীবন ডান দিকের বড় রেললাইন ধরে। এটাই আসাম যাবার পথ।
আরো কিছুক্ষণ হাঁটবার পর ঘর বাড়ি দোর দালান গাড়ি ঘোড়া লোক জন সব চিহ্ন মুছে যায়। শুরু হয় ঘন গভীর বন। রেল লাইনের পাশেই একবুক উঁচু জংলা আগাছা আর পিছনে আকাশ ছোঁয়া উঁচু উঁচু বৃক্ষ। যে বৃক্ষের ডালে ডালে দোল খাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে শাখামৃগ। প্রচুর নানাবর্ণের পাখিও দেখা যাচ্ছে। সব কিচির মিচির করছে। ডালে ডালে দোল খাওয়া বানরগুলো বিস্ময় মাখা চোখে জীবনকে দেখছে আর মুখ দিয়ে বিচিত্র সব শব্দ করছে। বাঁকুড়ার জঙ্গল দেখেছে জীবন। একা একা সে জঙ্গলে অনেক ঘুরেছে। কিন্তু সে জঙ্গলের সাথে এ জঙ্গলের কোন মিল নেই। তাই কেমন যেন একটু ভয় ভয় করে জীবনের। প্রতিটা জঙ্গলের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। সেই গন্ধের মধ্যে গোপন থাকে তার চরিত্র। সে জানে যারা অভিজ্ঞ। জীবন এ জঙ্গলের স্বভাব চরিত্র জানে না। তাই একা এই পথে হেঁটে যেতে পারছে। জানলে কোনদিন পারত না। এ জঙ্গলে বাঘ আছে, তার চেয়ে মারাত্মক পাহাড়ি চিতা। আকারে কিছু ছোট অসম্ভব ক্ষিপ্র এই জীবেরা ক’দিন আগে এখানেই একটা গরু মেরেছে।
দু’আড়াই ঘণ্টা হাটবার পর অবশেষে জীবন পৌঁছে গেল সেই কাঙ্খিত স্টেশনে। কিন্তু এ কী! ঘন জঙ্গলের মধ্যে সে স্টেশনে একজনও লোক নেই। এমনকি যাদের না হলে ট্রেন চলে না সেই স্টেশন মাস্টার পোর্টার সিগন্যাল ম্যান কারো কোনো কোনো আত্তা পাতা নেই। স্টেশনটাকে দেখে মনে হয় বন জঙ্গলের মধ্যে বহু বছর আগে একে পরিত্যাগ করে চলে গেছে কেউ। সেই থেকে যেন অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। আর এখানে ঝক মক ধাতব শব্দ তুলে কোন ট্রেন এসে পৌঁছায় না। হৈ চৈ সোরগোল তুলে মানুষ ট্রেনে ওঠা নামা করে না। তাই স্টেশনের ঘুম ভাঙে না চেতনা ফেরে না। স্টেশন স্থাপনের প্রয়োজনে যেটুকু জঙ্গল সাফ করা হয়েছে তার ওপাশে গাছ পালা ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে কোনও গ্রাম নগর লোকালয় আছে কিনা কিছু বোঝা যায় না। তবে যেটুকু চোখে পড়ছে বৈশাখের প্রখর রোদে জ্বলা সেই সীমার মধ্যে কোন জীবিত প্রাণী আছে তেমন বিশ্বাস হয় না।
মনে মনে বুঝে যায় জীবন এ স্টেশনে অন্য ট্রেন যদি বা থামে মেল ট্রেন কিছুতে থামবে না। মেল ট্রেন থামার জন্য যত বড় স্টেশন চাই, এটা তা নয়। গৌহাটি মেল আসবে বারোটায়। হাতে এখনো তিনঘণ্টা সময়। ইচ্ছা করলে এই সময়ের মধ্যে সামনের স্টেশনে পৌঁছে যাওয়া কঠিন হবে না। আর তা করতেই হবে আসাম যেতে হলে। সে আবার সামনে হাটা দেয়। এবার জঙ্গল আরো ঘন আরো গভীর। আরো ভীতিকারক। গত কয়েক দিনের উপোস আর গত কয়েক ঘন্টার অনবরত হাটায় কিছুটা ঘায়েল তবু মনের জোরে এগিয়ে চলে। কে যেন কবে কোন পর্বতের গুহায় বসে বহু সাধনার জ্ঞান ব্যক্ত করেছিলেন–চরৈবেতি চরৈবেতি চরৈবেতি। এগিয়ে চলো এগিয়ে চলো। বিশ্ব চরাচর জল স্থল অন্তরীক্ষে, সর্বত্র ধ্বনিত হচ্ছে এই এক নাদ ধ্বনি, চলো চলো–চলার নামই জীবন। যে সচল একমাত্র সেই জীবিত। যার চলা থেমে গেছে তার মৃত্যু ঘটে গেছে। জীবন এখন অন্তরাত্মার মধ্যে সেই মহান বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন করে। এই জঙ্গলের মধ্যে না চলে বসে পড়লে দুচার দিন যাও বাঁচা যেত তাও যাবে না। ক্ষুধা তৃষ্ণায় ক্লান্ত অক্ষম অসমর্থ দেহ রাত নামার সাথে সাথে কোন বন্যপ্রাণী মেরে খেয়ে নেবে।
কে জানে, জীবনের চলার গতি কমে গেছে, নাকি পরবর্তী স্টেশনের দুরত্ব অনেক বেশি অথবা ঘড়ির কাটা জোরে ছুটছে বলে সূর্য মাথার উপর উঠে গেছে। চুলের সিঁথির মত জঙ্গলের মধ্যের রেলপথের উপর দারুণ আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েছে রোদ। জীবনের শরীর জ্বলছে। পায়ের পাতা পুড়ে যাচ্ছে গরমে। জল তেষ্টাও পাচ্ছে খুব। কিন্তু ঘাম নেই শরীরে।
স্টেশনে তখনো পৌঁছাতে পারে নি জীবন, তা রয়েছে এখনো বেশ কয়েক কিলোমিটার দুরে। ঠিক সেই সময় শিলিগুড়ির দিক থেকে ছুটে এল সেই বেলা বারোটার গৌহাটি মেল। শব্দ শুনে পিছন ফিরে ট্রেনকে দেখে পাশের বুক সমান ঘাস জঙ্গলের মধ্যে নেমে দাঁড়ালো সে। মাটি কাঁপয়ে জঙ্গল কাঁপিয়ে শুকনো পাতা উড়িয়ে পাখিদের ভয় ধরিয়ে যেন জীবনের বুকের উপর দিয়ে সে ট্রেন ছুটে গেল আসামের দিকে। কি আর করে জীবন, ফের রেল লাইনের উপর উঠে কিছুক্ষণ হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। কিন্তু কতক্ষণ দাঁড়াবে! দাঁড়িয়ে তো কোন সুরাহা হবে না, বোঝে সে, স্টেশনে তো পৌঁছাতেই হবে। এর কোন বিকল্পই যে নেই।
