বলিস কি! এর মধ্যে ছয় মাস হয়ে গেল! ঠিক গুনেছিস?
আপনে গুইন্যা দেখেন। কার্তিক মাসে কামে লাগছি, এইডা বৈশাখ।
বাব্বা একেবারে ক্যালেন্ডার। তো ঠিক আছে, ছয় মাসইতে হয়েছে, ছয় বছর তো আর হয় নি। চার ছয় চব্বিশ, দুশো চব্বিশ টাকা আছে আমার কাছে তোর পাওনা। থাক না আরো ছয় মাস। একেবারে সব হিসেব করে দিয়ে দেব। একবারে টাকাটা পেলে তোরও কাজে লাগবে।
এবার বড় কাতর হয়ে পড়ে জীবন। কান্না এসে জমা হয় তার গলায়। বলে, বাবু মোরা বড় গরিব। বাড়িতে ছোড ছোড় ভাই বইন। অরা খাইতে পায় না। মোর বাপের প্যাডে ব্যথা। অষুধ পায় না। সেই লইগ্যা কামে বাইরাইছি। মোর টাকা কয়ডা মোরে দিয়া দ্যান বাবু। বাড়িতে পাড়াইয়া দিই।
সাহাবাবু বিষম বিরক্ত–তুই তো দেখছি কাবুলিওয়ালারও বাপ। বলছি এখন নেই তবু প্যানর প্যানর করছিস। এই রকম করবি জানলে কোনদিন তোকে কাজে রাখতাম না। দেখে মায়া হয়েছিল বলে রেখেছিলাম। কথায় বলে না উপকারীকে বাঘে খায়। আমার এখন সেই দশা। বড় ভুল করে ফেলেছি। বলছি পরের মাসে দিয়ে দেব। আরে ভগবান আমাকে অনেক দিয়েছে, অনেক দেবে। তোর ওই কটা টাকা মেরে আমার কি হবে।
বলে জীবন, বাবুমুই অনেকদিন ঘর ছাড়া। মার লইগ্যা মোন কেমন কেমন করে। তারা বাঁইচা আছে না বেবাকে মইরা গেছে তা কে জানে। সামনের মাসে মোর টাকা মিটাইয়া দিবেন। মুই বাড়ি যামু।
দরাজ গলায় বলেন সাহাবাবু–নিশ্চয় দেবো। দু’দশটাকা বেশিই দেবো। যা এখন মন দিয়ে কাজ কর।
পরের মাসেও বিনোদ সাহার সেই এক গৎ–নেই রে। হাতে একদম টাকা পয়সা নেই। ঠিক আছে, এতদিন যখন গেছে আর একটা মাস যাক। সামনের মাসে ঠিক দিয়ে দেব। কথা দিলাম। পরের মাসেও টাকা দেয় না বিনোদ সাহা, কথা দেয়। পাকা কথা পরের মাসে।
ত্রিকোণ পার্কে একটা বাড়িতে কাজ করত বিহারের একটা ছেলে। সে এক রাতে বাড়ির মালিকের গলা কেটে দিয়ে সোনাদানা টাকা পয়সা সব নিয়ে পালিয়ে চলে যায়। জীবনের মনের মধ্যে এখন একটা সেই ইচ্ছা দাপাদাপি করে। কিন্তু কিছুই পারে না সে, গোপনে চোখের জল ফেলা ছাড়া। সে কান্নায় একটা গাছের পাতা খসে পড়ে না। কে যেন কবে বলেছিল–মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। বিশ্বাস করতে করতে দশ মাস কেটে গেল। শেষে আর বিশ্বাস রইল না মানুষের ওপর। এবার জীবনের নিজের উপর, দেশ সমাজ মানুষের উপর রাগ হতে থাকে। একদিন বিনোদ সাহাকে বলে সে–আপনি আমারে খালি দিনই দিবেন। টাকা আর দিবেন না। আমি আপনেরে বুইঝা ফালাইছি। আমি আর কাম করমু না।
মিষ্টি করে হেসে, একটুও না রেগে বলেন তিনি কাজ করা না করা সবটা তোর ইচ্ছা। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক তার উপর তো জোর খাটানো চলবে না। পারি, ইচ্ছা করলে তোকে যতক্ষণ আর একজন লোক না পাই আটকে রাখতে পারি। সে আমি করব না। তবে আমার ওই এক কথা–সামনের মাসে।
সামনের মাসে আমি কইলকাতা থিকা টাকা নিতে কেমনে আমু?
আসতে হবে না। ঠিকানা রেখে দিয়ে যা, মানি অর্ডার করে পাঠিয়ে দেব। জীবনে কারও এক পয়সা মারি নাই, তোরও মারবো না।
জীবন আর কোন কথা বলতে পারে না। কেন কে জানে চোখ ফেটে জল গড়িয়ে নামে। চোখের জল, যা এ সময়ের সব চেয়ে সস্তা সব চেয়ে ফালতু একটা জিনিস। নীরব ঝাঁপশা চোখে সে সামনে আগায়। নির্বান্ধব এক ছোট শহর শিলিগুড়ির পথে পথে খালি পায়ে ঘুরে খালি পেটে ঘুমিয়ে এক নিঃস্ব কিশোরের কেটে গেল কয়েকটা দিন কয়েকটা রাত। প্রথমে সে ভেবেছিল কলকাতার দিকে ফিরে যাবে। শিলিগুড়ি থেকে ট্রেনে যদিনা চাপা যায় রেল লাইন ধরে হেঁটে এক স্টেশন পেছনে পিছিয়ে আসবে, কিন্তু তখনই তার চোখে পড়েছিল নিজের দুটো নিঃস্ব হাত। অনবরত কাপ প্লেট ধোবার ফলে জলে ভিজে হাজা মজা পচা সে হাতে মা বাবা ভাই বোনকে দেবার মতো কোন সঞ্চয় ছিল না। ছিল নিঃসীম শূন্যতার বিপ। সে হাত যেন বলে উঠেছিল হেরো হেরো। তুই এক হেরে যাওয়া ব্যর্থ মানুষ। তোর মা বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর মত মুখ আর নেই। তখনই জীবনের ছোট্ট বুকটায় তোলপাড় হয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে জনমদুঃখী জননীর আশাহত ছলো ছলো মুখটা। সে যেন বলছে, জীবন রে কি আনলি তোর না খাওয়া ছোট ছোট ভাই বোনদের জন্য? এতদিনে একসের চালও জোগাড় করতে পারলি না!
তখনই এক অসহায় জীবন কাঁদে। মাকে তার বলতে ইচ্ছা করে, মা-মাগো, আমাদের বড় অভিশাপময় জীবন। নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে আমাদের জন্য কোথাও আর কিছু অবশিষ্ট নেই। আমাদের জন্মের বহু আগেই জগতের যত কিছু সম্পদ, যা কিছু ভালো যা কিছু বেঁচে থাকার জন্য জরুরি, সব–সব দখল হয়ে গেছে। যারা তা দখল করে বসে আছে তা থেকে তিলপরিমাণও আর আমাদের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি নয়। এরা বুক থেকে উঠে আসা গরম নিশ্বাস চোখ থেকে ঝরে পড়া নোনা জলের মূল্য দেয় না। শরীর থেকে বেয়ে পড়া ঘামকে কত কম দামে কিনতে পারে তারই কৌশল করে। দয়া ধর্ম ন্যায় এসব এদের কাছে অর্থহীন মূল্যহীন অবজ্ঞার বিষয়। কত পথ পার হলাম, কোথায় না কোথায় ঘুরলাম, কত মানুষ দেখে এলাম–সর্বত্র, সবার কাছে আমরা সমান উপেক্ষিত। এক উদ্বৃত্ত জীব মাত্র। যার দাম এই সমাজে কুকুর ছাগলের চেয়েও কম।
একদিন জীবনের আবার মনে পড়ে গেল আসামের কথা। মনে পড়ে গেল রাজার কথা। রাজা আসামের অনেক গল্প করেছিল। একবারও তার মুখ থেকে আসামের কোন নিন্দা বের হয় নি। যা বলেছে তার সবটা প্রশংসা। তাহলে এটা তো প্রমাণিত যে আসাম অন্য সব জায়গা থেকে আলাদা। সেখানকার মানুষ এখানকার মত অমানুষ দয়া মায়া শূন্য নয়।
