মাইনা কত দিবেন।
মাইনে! হাসেন তিনি, আগে কাজে তো লাগ। এক দুমাস কাজ কর। সব কাজ শেখ তবে তো মাইনের কথা। কেমন কাজ করিস না করিস কিছু দেখলাম না, শুনলাম না–আগেই মাইনের কথা কি করে বলবো! এক দেশের লোক তুই, এক জাতের। আমরা সাহা। তোকে কি আর আমি ঠকাবো?
না, তবু আপনে কিছু এক্ট কন। আমার খুউব টাকার দরকার। আমি গেলাস ধুইতে, চা বানাইতে পারি।
ঠিক আছে। বলছিস যখন, প্রথম মাসের পর থেকে মাসে চল্লিশ করে নিস।
মাত্র ষাট দিন পরে পাওয়া যাবে চল্লিশ টাকা। মাত্র ষাটটা দিন। তারপরই জোগাড় হয়ে যাবে ট্রেন ভাড়া। এই কটা দিন পরে জীবন পেয়ে যাবে সেই জাদু নগরীর গেট পাশ। যেখানে পৌঁছাতে পারা মাত্র জীবনের নাগালে এসে যাবে কাঙ্খিত সুখ।
জীবন যখন তাড়া খাওয়া কুকুরের মত এখানে সেখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল ঠিক সেই সময় তারা অজান্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা পালাবদল ঘটে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে যে দল পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় অটল বসেছিল তারা টলে গেল। তাদের দলের এক প্রভাবশালী নেতা অজয় মুখার্জী তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে ডিগবাজী খাওয়ায় কংগ্রেস দল শাসন ক্ষমতা হারাল। পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় বসল চৌদ্দ দলের জোট যুক্তফ্রন্ট। অজয় মুখার্জী হল সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আর উপমুখ্যমন্ত্রী হল সিপিএম নেতা জ্যোতি বসু। পুলিশ বিভাগ রইল তাঁরই হাতে। এর ফলে গ্রাম বাংলার শ্রমিক কৃষক খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে একটা আশার সঞ্চার হল। শ্রমিকরা ভাবল শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির নেতার হাতে যখন পুলিশ বিভাগ তখন সেই পুলিশ দিয়ে মালিক শ্রেণি আর শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দাওয়ার আন্দোলন দমন করতে পারবে না। আর কৃষক, যারা এতকাল শুনে এসেছে লাঙল যার জমির প্রকৃত মালিকই সেই। মাটিতে যাদের ঠেকেনা চরণ মাটির মালিক তাহারাই হন–সেই পুরানো অন্যায় আইন এবার বদলে যাবে। এই আশায় টগবগ করে ফুটতে লাগল।
সেটা উনিশশো সাতষট্টি সাল। হেমন্তকাল গিয়ে শীতকাল এল বীর বিক্রমে। বস্ত্রহীন মানুষের হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে মাঠে মাঠে সবুজ ধানের শীষে সোনার রঙ ধরল। সে এক সময় বিল্টুদায় নিল। এসে গেল বসন্তকাল। বসন্তকালকে বলা হয় প্রেমের ঋতু। কিন্তু এবার সমগ্র উত্তরবঙ্গের জন্য তা নিয়েএল এক বিদ্রোহী বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ।
স্টেশনের এক চা দোকান, যেখানে নানা জায়গার লোক আসে তাদের মুখের টুকরো টুকরো কথায় জীবনও বুঝে যায় এই বসন্ত এই শহরের সুখী শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে কোন শুভবার্তা নিয়ে আসেনি। সর্বত্র কি যেন এক গুঞ্জন ত্রস্তভাব। সব যেন ভয়ের জ্বরে কাঁপছে। কয়েকদিন পরে দেখতে পেল জীবন, স্টেশন বাজার শহর সারা শিলিগুড়ি যেন খাকি রঙে ঢেকে গেল। জেলা পুলিশের সদর দপ্তর এখানেই। ট্রাক ভ্যান জীপ ভরে রাইফেল স্টেনগান এস, এল, আর নিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ সেখানে এল, এরা সব সি.আর.পি। আবার ঝাঁকে ঝাঁকে তারা গাড়ি ছুটিয়ে চলে গেল। এদের আসা যাওয়ায় ফুটে উঠলএকটা রণংদেহী ভাব। যা দেখে মনে হল এরা যেন সেই বাষট্টি সালে চিনের হাতে জুতো খাওয়ার বদলা নিতে যাচ্ছে আজ।
ইচ্ছা করে জীবনের কোথায় সেই নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি একবার গিয়ে দেখে আসতে। সাওতাল গরিব চাষী ক্ষেতমজুর কেমন করে লড়ছে এক সাহসিক লড়াই। ওদের নেতার নাম জঙ্গল সাওতাল। তারই নেতৃত্বে শোষণ বঞ্চনা অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে কৃষক জনতা। এলড়াই মনে হয় যেন তারও লড়াই। হিন্দু মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখেছে জীবন। সে দাঙ্গার ছিটেফোঁটা রক্ত তার হাতেও লেগে আছে। যে রক্তের ঘ্রাণ এখনো তাকে বিচলিত করে দেয়। সে লড়াইকে কখনো সঠিক লড়াই, নিজের লড়াই বলে মনে হয় নি। কিন্তু এই লড়াই যেন তার নিজেরই লড়াই এমনই মনে হয়।
কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও তার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সে রয়ে যায় সেই চা দোকানের এঁঠো থালা গেলাস প্লেট কাপের ডাই করা স্তূপের পাশে। এ ভাবেই কেটে যায় আট দশ মাস। কথা ছিল সাহাবাবু প্রথম মাসের মাইনে দেবেন না। পরের মাস থেকে দেবেন। সে মাস শেষ হতেই জীবন হাত পেতে দাঁড়ায় মালিকের সামনে—বাবু মোর মোর মাইনা দ্যান।
তেল চকচকে বকনা বাছুরের মত চেহারার সখি মুখে সাহাবাবু জীবনের কথা শুনে একটু নিরীহ হাসি দিলেন–মাইনে? কেন দেব না। নিশ্চয় দেব, একশো বার দেব। তবে এখন তো নেই। সামনের মাসে নিয়ে নিস।
মাইনে না পাওয়ায় মনটা একটু খারাপ হলেও সেটা সামলে নেয় জীবন। দুমাস তো গেছে আর একটা মাস গেলে বা কি হয়েছে। তাতে বরং ভালোই হবে। কিছু বেশি টাকা হাতে থাকবে। আসাম গিয়ে দু পাঁচদিন খেয়ে দেয়ে ঘুরে বেড়িয়ে একটা মনের মত কাজ খোঁজা যাবে। কিন্তু হায় হতভাগা! পরের মাসে সে যেই মাইনে চাইল বিনোদ সাহার অতি বিনীত জবাব নেই রে। পরের মাসে নিস। এভাবে পরের মাস পরের মাস করে ছয় সাত মাস কেটে গেল।
একদিন একটু ক্ষোভ রাগ গলায় এনে বলে জীবন পেত্যেক বার আপনে কন সামনের মাসে দিমু। ছয় সাত মাস হইয়া গেছে একটাও পয়সা দ্যান নাই। এইবার আমার মাইনা দ্যান। দ্যাখেন আমার গামছা গেঞ্জিও ছিইড়া গেছে। নতুন কেনা লাগবো।
