কত সময় সেই নির্বান্ধব গাছতলায় একা একা বসেছিল জীবন তা সে নিজেও জানে না। কখন চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে তা টেরও পায়নি। তখন জীবন মন শক্ত লক্ষ্যস্থির করে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে হাঁটা দেয় সামনে। কয়েক পা হাঁটবার পর মনে হয়, হ্যাঁ পারব। কারও কোন সহায়তা ছাড়াই সে একা হেঁটে যেতে পারবে।
.
পথ কোন আঁকা বাঁকা নেই, একেবারে ধনুকের ছিলার মত সোজা। সেই সোজা পথ ধরে হেঁটে জীবন পৌঁছে গেল রেল স্টেশনে। কাল যে স্টেশন থেকে রাজার হাত ধরে হেঁটে গিয়েছিল। এখন স্টেশন কালকের মত অত ফাঁকা নেই। কিছু লোকজন আছে। সেই কিছু লোকজনের মধ্যে একা একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসে পড়ে জীবন।
সকাল সাতটার যে ট্রেন তা সকাল সাতটাতেই ছেড়ে গেছে। সেই ট্রেন ধরে চলে গেছে রাজা। এরপর আসাম ট্রেন আবার আছে বেলা বারোটায়। ফের বিকেল চারটেয়। সময় এখন দশটার বেশি নয়। দু’ঘণ্টা কি করে কাটায় জীবন। কিছুক্ষণ বসার পর সে স্টেশন দেখতে বের হল। এক নাম্বার প্লাটফর্ম ঘুরে গিয়ে উঠল দু’নাম্বার প্লাটফর্মে। কিন্তু তার চোখ প্লাটফর্মের সেই চেনা চিহ্ন কিছুতেই খুঁজে পেল না। এখানে সেই উনুন নেই যা ঘিরে বসে থাকে ভিখারি মায়ের হাড় গিলগিলে সন্তানরা। রেলিংয়ের গায়ে ছেঁড়া ময়লা কথা শুকোতে দেওয়া নেই। কেউ মাতলামো করছে না। তাসের জুয়া খেলছে না রেলের কুলিরা দল বেঁধে। ঝগড়া মারামারি করছে না কেউ। বড় শান্ত বড়ই নিরুপদ্রব পরিবেশ এখানে।
এই সব দেখে অথবা কিছুই না দেখে ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দিল জীবন। এক সময় ঘড়িতে বারোটা বাজলো। কারশেড থেকে এবার একখানা ট্রেন এসে ঢুকল প্লাটফর্মে। যারা যাবার ছিলো সব ধীরে সুস্থে উঠে পড়ল কামরায়। জীবনকেও যেতে হবে। সে বা বসে থাকে কেন? ট্রেনে উঠে দরজার কাছে সেই পুরাতন ভঙ্গিতে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল সে।
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে এক সময় ট্রেন এসে পৌঁছাল শিলিগুড়ি স্টেশন। ট্রেনে ওঠার জন্য এখানে বড় বড় বেডিং ট্র্যাঙ্ক স্যুটকেশ নিয়ে অপেক্ষা করছে হাজার হাজার যাত্রী। ট্রেন থামা মাত্র হুড়মুড় করে তারা সব উঠে পড়তে লাগল কামরায়। চিৎকার চেঁচামেচি হৈ হট্টগোলে সমস্ত স্টেশন এক মুহূর্তে যেন রণভূমি হয়ে গেল। কে কার পা মাড়িয়ে কে কার বুকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে কে কাকে ঠেলে ফেলে আগে গিয়ে পছন্দের সিট দখল করবে তারই প্রতিযোগিতা শুরু হল। সে সব থামলে যাকে গত কয়েকদিন তপস্যা করেও দর্শন মেলেনি সেই অপ্রত্যাশিত অবয়ব আচমকা সামনে এসে দাঁড়াল। তিনি কালো কোর্ট পড়া বিশালদেহী এক চেকার। টিকিট! মাথা এবং হাত দুটো এক সাথে নেড়ে জানাল জীবন–নেই। চেকারের আর কিছু শোনবার দরকার ছিল না। বাজপাখি যেমন ছোঁ মেরে ইঁদুর ছানা তুলে নেয় সে তার বিশাল থাবায় ঠিক সেই ভাবে ধরে ফেলল জীবনকে। তারপর যেমনভাবে ঘোড়ায় বেঁধে যুদ্ধবন্দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় সেইভাবে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল স্টেশন থেকে বাইরে যাবার গেটের কাছে। শেষে সজোর এক ধাক্কা যাঃ–!
জীবনের পরিধানে একটা হাফ প্যান্ট গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি জড়ানো গামছা আর খালি পা দেখে চেকার বুঝে গেছে এরকম লোকের ফাইন দেবার ক্ষমতা, ঘুষ দেবার যোগ্যতা থাকে না। বিনা টিকিটে চড়া এমন কোন গর্হিত কাজ নয়। গর্হিত ওই দুটোর কোন একটা না থাকা। তেমন লোক ধাক্কা খাবারই যোগ্য। জীবনের সর্বক্ষেত্রে পদে পদে এরা ধাক্কাই খায়। সেটাই দিয়েছে সে।
গেটের এপারে টিকিট কাউন্টার। তার পাশে একটা ফাঁকা কাঠের বেঞ্চি। সেটায় বসে ফের ভালো করে স্টেশন আর আসামগামী ট্রেনটার দিকে তাকায় জীবন। ট্রেন ঘিরে স্টেশনের চারদিকে থিকথিক করছে কালো কোর্ট আর খাকি জামা। এত পুলিশ এত চেকার হাওড়া শিয়ালদায়ও দেখা যায় নি। এত চোখ ফাঁকি দিয়ে কী করে ট্রেনে চড়া যায় সে জীবন জানে না। যে জানত সে রাজা আর নেই।
কী করা যায় এখন। ট্রেনে চড়া যাবে না, তাহলে কী একা এই পরদেশে ভয়ে ভাবনায় ক্ষুধা তৃষ্ণায় মরে পড়ে থাকবে। মরতেই যদি হয় তবে এতদূর দেশে আসতে গেল কেন! কলকাতায় কি মৃত্যুর কোন অভাব ছিল। এসেছে বাঁচতে। সে এখনও বেঁচে থাকতে চায়। সবাইকে বাঁচাবার জন্যই তার বাঁচাটা দরকারী। সবাইকে বাঁচাতে হলে আসাম যাওয়াও দরকার। যার পথে পথে পড়ে থাকে টাকা। যে টাকায় কেনা যায় বেঁচে থাকার উপকরণ।
আসাম যেতে হবে। না গিয়ে কোনও উপায় নেই। ঝিমুনি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায় জীবন। টিকিট কাউন্টারের সামনে একটা বড় স্টল। শো কেসে সাজানো নানা রকম খাবার। উনুনে ভাজা হচ্ছে কচুরি সিঙ্গারা আরও কত কী! বানানো হচ্ছে দুধের ঘন চা। দোকানের সামনে গিয়ে রাজার মত গলায় বলে সে, আপনেগো দোকানে কামে লোক লাগবে নাকি? আমি কাজের তালাশে কইলকাতা থিকা আইছি।
দোকানের মালিকের মাথায় লম্বা চুল দাড়িগোঁফ সব কামানো একেবারে সখি সখি চেহারা। গলায় বৈষ্ণব পদাবলীর মধুর সুর এনে বলে সে–দেশ কোথায় ছিল?
আইজ্ঞা পূর্ব পাকিস্থানের বরিশাল জেলায়।
আমরা ঢাকা জেলার লোক। বলে না বিদ্যা বুদ্ধি টাকা সব হচ্ছে ঢাকা। সেই ঢাকার। কি নাম তোর?
জীবন। আইজ্ঞা জীবন কৃষ্ণ দত্ত।
বড় ভালো নাম, কায়স্থ। হ্যাঁ, লোক তো আমার লাগবে।
