রেল স্টেশন থেকে বাইরে বের হয়ে ওরা সেই দিকে মুখ করে হাটে।
এখানে একটু শীত শীত ভাব আছে এ সময়ের আবহাওয়ায়। পথে কোন লোকজন নেই। একদম ফাঁকা। যারা ট্রেন থেকে নেমেছিল তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কুড়ি পঁচিশজন হবে হয়ত। এতক্ষণে তারা চলে গেছে যে যার গন্তব্যে। কলকাতার আলো লোকজন গাড়ি ঘোড়া দেখা চোখে এখানকার নির্জনতা, পাহাড়, জঙ্গল, পুরো পরিবেশটাই এখন বড় ভীতিপ্রদ হয়ে উঠেছে। সেই ভয় থেকেই জীবন বাঁহাত দিয়ে রাজার ডানহাত চেপে ধরে। বিদেশ বিভুয়ে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা আগে বন্ধু হয়ে ওঠা একটা হাতের স্পর্শ মানুষকে যে কতখানি নিরাপত্তা কতখানি সাহস জোগাতে পারে তা জীবন জীবন থেকে অনুভব করে।
প্রায় পনেরো কুড়ি মিনিট হাটবার সামনে পড়ল একটা তেমাথার মোড়। সেখানে একটা বটগাছ। গাছের গোড়াটা গোল করে বাঁধানো। ডানদিকের রাস্তায় পর পর কয়েকটা দোকান। প্রথমটা মিষ্টির পরেরটা হোটেল। একটার মালিক বাঙালী। অন্যটার নেপালি।
বলে রাজা–চল তো দোকানগুলোর দিকে।
পয়সা নাই খাবার দোকানে কি কাম।
চারদিক দেখে নিয়ে বলে রাজা–দুটো পথ আছে, যা মন চায় পেট ভরে খেয়ে দেয়ে দৌড় মেরে পালানো। পারবি?
ধরা পড়লে খুব মারবে।
খুব মারবে না। দু-চারটে চড় ঘুষি মারতে পারে।
আমি মাইর খাইতে পারি না, ব্যথা লাগে।
তাহলে আর একটা উপায় আছে। গিয়ে বলা আমরা কাজ করব। যদি কাজ দেয় খেতেও দেবে। করবি কাজ? দু-চারদিন কাজ করে খেয়ে দেয়ে জিড়িয়ে যেতর আসামের দিকে রওনা দেবো।
এইটা ঠিক হইবে।
রাজা মিষ্টির দোকানের সামনে গিয়ে সহজ সপ্রতিভ গলায় দোকান মালিককে বলে, দেখুন, আমরা দুজন কলকাতায় থাকি। আপনাদের এখানটা ঘুরে দেখতে এসেছি। কটা দিন এখানে থাকার ইচ্ছা। আপনার দোকানে কোন কাজ টাজ পাওয়া যাবে? একটু বিড়ির নেশা আছে আমার। দু’একটা দিলে ভালো না দিলেও কোন কথা নেই। বাঙালী দোকান মালিক তার পাশের নেপালি মালিককে ডেকে আনে। দু’জনে প্রাণভরে খানিকক্ষণ হেসে সোৎসাহে বলে–নিশ্চয় কাজ পাবে। কাজের লোকের জন্য আমরা কবে থেকে পথ চেয়ে বসে আছি। কাজের লোকের অভাবে কত কাজ পড়ে আছে। এসো এসো তোমরা। যতদিন মন চায় থাকো, খাও দাও, দেশ দেখো।
রাজা নেপালির হোটেলে আর জীবন বাঙালীর মিষ্টির দোকানে তৎক্ষণাৎ বহাল হয়ে গেল। দুই দোকানের গোপন গুদাম থেকে এবার বের হল বিশাল বিশাল কড়াই গামলা বাথটব হাতা খুন্তি আরও কত কী। তারা সেই ছোট খাটো পাহাড় দেখিয়ে বলল–আজকে তোমরা ক্লান্ত, অনেক দূর থেকে এসেছো বলে এর বেশি আর কিছু দিলাম না। ভালো করে এগুলো মেজে ধুয়ে চকচকে করে ফ্যালো তো দেখি। মালিক দুজন মুখ নয়। তারা বুঝে গেছে এরা আজ আছে কালকে কোথায় তা কে জানে। প্রথম দিন আজ যখন তারা একবার এদের খাপে পেয়ে গেছে যতটা পারে খাঁটিয়ে নেবে সেটায় তার আশ্চর্য কি!
দুই দোকানের মাঝে একটা বাঁশের বেড়া। এপারের কলতলায় জীবন ওপারের কলতলায় রাজা। দুজনার সামনে বাসনের পাহাড়। যা মনে হয় বহু বছর ধরে মাজা ধোয়া হয়নি। ছাই দেওয়া হয়েছে সোড়া দেওয়া হয়েছে আর বলে দেওয়া হয়েছে—কাজ শেষ হবার পরই খেতে দেওয়া হবে গরম গরম ভাত। ভাতের লোভে দুই ক্ষুধার্ত বালকের শুরু হল বাসনের সাথে দুই তিন ঘণ্টার কঠিন কুস্তি। শেষে গামলা কড়াই মেজে ধুয়ে নিয়ে চলে যাবার আগে জীবনকে বলে যায় রাজা সকালেই কিন্তু পালাবো। সাতটার সময় আসাম যাবার ট্রেন, মনে থাকে যেন। না পালালে শালারা আমাদের খাঁটিয়ে খাঁটিয়ে মেরে ফেলবে।
যেমন কথা তেমন কাজ। সকাল বেলা রাজা চলে গেল তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। সে যে যাবে তা জানা ছিল জীবনের। যাবার কথা ছিল তারও। কিন্তু কথা থাকলেই কি সব কাজ সময় মত করে ওঠা যায়? রাতের খাওয়া দাওয়ার পর রাজাকে শুতে দেওয়া হয়েছিল বাইরে হোটেলের বারান্দায়। যেখান থেকে সটকে পড়া সহজ। আর জীবন ছিলো কাঠের দোতলার তালাবদ্ধ এক ঘরে। যার তালা বাইরে থেকে না খুলে দিলে বের হওয়া অসম্ভব। তাছাড়া বিগত চব্বিশ ঘন্টার পথ ক্লেশ তাকে সঠিক সময়ে জেগেও উঠতে দেয়নি। যখন তার ঘুম ভাঙল বাইরে তখন নেপালি ভাষায় চিৎকার গালি গালাজ–চোর শালে, চোরিসে ভাগ গিয়া।
চোরিসে ভাগ গিয়া, আর চোরি করকে ভাগ গিয়া দুটো কথার মধ্যে ব্যবধান আকাশ পাতালের। কিন্তু সে ব্যবধান স্থান কাল পাত্র অনুসারে বিবেচিত হয়। এক দুর্বল দরিদ্র দূর দেশের বাচ্চার জন্য কে কবে এত বিচার বিবেচনার ধারে কাছে গেছে। জীবনকে চুলের মুঠি ধরে দোকানের বাইরে বের করে আনলো একজন। ঠাস করে চড় হাঁকাল গালে। যাঃ শালা চোর। ভাগ।
এই বিদেশ বিভুয়ে বান্ধবহীন জীবন এখন কোথায় যাবে। চড়ের ব্যথায় নয়, কেঁদে ফেলল নিজের অসহায় অবস্থার কথা ভেবে। সে যেন এখন হাত পা বাঁধা কুয়োয় পড়া মানুষ। যার আর রক্ষা নেই। নিশ্চিত মৃত্যু এসে যেন শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছে। চিলের মত ছোঁ মেরে এখনই তুলে নেবে ধারালো নখে।
দোকানের সামনে থেকে সরে এসে তেমাথার মোড়ে বাঁধানো বটের গোড়ায় বসে পড়ল জীবন। সামনে পিছনে ডানে বাঁয়ে চারদিকে তাকাল। তেমন কাউকে চোখ পড়ল না যার সামনে গিয়ে অঞ্জলি পেতে দাঁড়িয়ে বলা যায় আমি বড় বিপদগ্রস্থ। আমাকে বাঁচান।
