আধঘণ্টা চলবার পর এপার খেজুরিয়া ঘাটে এসে থামল জলযানখানা। এখানে গেটে কোন পাহারাদার নেই। নিরাপদে ওরা নামল দুজন। বালির উপর রেল লাইন পেতে নদীর একেবারে কাছাকাছি এনে বানানো হয়েছে এই স্টেশন। যে কেউ দেখে এক নিমেষে বুঝে যাবে এ স্টেশন স্থায়ী নির্মাণ নয়।নদীর জল বাড়লেই একে তুলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে পিছনে। দোকানগুলোও তাই। সবই অস্থায়ী। হোগলা দরমার ঘেরা বেড়া দিয়ে বালির উপর বানানো হয়েছে চা দোকান হোটেল। একখানা ট্রেন তখন দাঁড়িয়ে রয়েছে লাইনের উপর। বগিগুলো টেনে নেওয়া ইঞ্জিনটা যেন ঘুমাচ্ছে। দৌড় শুরু করার আগে তার যে ফোঁস ফোঁস তেজ গর্জন নরম নিশ্বাস তা এখন নেই। গাড়ি টানা আলসে গরু যেরকম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে জাবর কাটে আর ঘন ঘন মূত্র ত্যাগ করে ইঞ্জিনটা তাই করছে।
বলে রাজা, গাড়ি ছাড়তে এখনো অনেক দেরি আছে বলে মনে হচ্ছে। চল দেখি কোথা থেকে কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কিনা।
ট্রেনের সামনে সোজা লম্বা হয়ে বসেছে বাজার। গ্রামের সাধারণ চাষীবাসী মানুষ নানারকম ক্ষেতের ফসল, যার মধ্যে পাকা আমই সব চেয়ে বেশি, তা নিয়ে এসে বিক্রি করছে বাজারে। চার কি পাঁচটায় এক কিলো হবে এমন আমের দাম একটা এক আনা। এক টাকার কিনলে ষোলটার বদলে আঠারো কেউ কেউ কুড়িটাও দিচ্ছে। রাজা এক বুড়ো মত চাষীর ঝুড়ির সামনে গিয়ে জানতে চায়–আম মিষ্টি হবে তো? নাকি টক? বুড়ো লোকটা কথার জবাব দেয় হাত দিয়ে–একটা কাটা আমের ফালি এগিয়ে ধরে। এক কামড় রাজা খেয়ে বাকিটা জীবনের দিকে এগিয়ে দেয়। দেখ তো।
এভাবে একে একে সারা বাজারের সব আমের ঝুড়ির কাটা টুকরো চাখা হয়ে যায় দুজনার। এ সেই ঝাটি ফুলের মধু চোষা, ধান ক্ষেতের কচি ধানের শীষ ছিঁড়ে দাঁতে চেপে দুধ বের করে খাওয়ার মতো ব্যাপার। খিতে এতে মিটবে না শুধু মনকে প্রবোধ দেবার কাজ চলবে।
বলে রাজা–এবার আমের ফলন খুব একটা ভালো হয় নি মনে হচ্ছে। না হলে আরো লোক আম নিয়ে আসত। আমাদের পেট ভরে যেত। যা একেবারে না হবার চেয়ে কিছু তো হল। সারা দিনে আর না পেলেও চলে যাবে কি বল!
দশটা কি সাড়ে দশটা নাগাদ নিউ জলপাইগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল সেই ট্রেন। সব কামরাই এখন কঁকা ফাঁকা। কোনটায় পাঁচ কোনটায় দশজন এইরকম যাত্রী নিয়ে বালির উপর পাতা লাইনের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল ট্রেন। রাজা জীবন দুজনে সেই প্রিয় পুরাতন স্থান একটা দরজার দুপাশ দখল করে বসে পড়ে। চোখ বিছিয়ে রাখে রোদ্দুর ধোয়া মাঠ ধান ক্ষেত জলাশয় ফলফলাদির বাগান মাঠে চড়তে থাকা গরু দূরের ছুটন্ত গ্রাম, গ্রামের মানুষের উপরে।
এইসব কি নতুন কিছু! আগে কখনো দেখেনি! দেখেছে খুব দেখেছে। কিন্তু এই রকম পরিবেশ পরিস্থিতি এই রকম মানসিক অবস্থায় একবারও আর দেখা হয়ে ওঠেনি।
ট্রেন এক এক স্টেশন করে পিছনে ফেলে আর একটু একটু করে যাত্রীর সংখ্যা বাড়ে। তবে সারা দিনে কখনো তেমন ভিড় হল না যাকে চামকাটাকাটি ভিড় বলে। পুরো দিন অবিরাম চলার পর সন্ধ্যে বেলায় নির্বিঘ্নে সে ট্রেন পৌঁছে গেল নিউ জলপাইগুড়ি। আজ আর আসামে যাবার মতো কোন ট্রেন নেই। সে পাওয়া যাবে কাল সকালে।
এখন জীবনের খিদের চোটে মুখে ফেনা উঠে গেছে। হাত পা সব তির তির করে কাঁপছে। কথা বলতে গেলে তা বের হচ্ছে কান দিয়ে। পেটের নাড়ি ভুড়িগুলো মনে হচ্ছে কেউ দু-হাতে টেনে ছিঁড়ে নিতে চাইছে। বুকের খাঁচায় পোষা প্রাণ পাখি আর বাঁচার মধ্যে বদ্ধ থাকতে চাইছে না। যেন এক্ষুণি খাঁচা ফেলে উড়ে যাবে কোন দিকে।
খিদে রাজারও লেগেছ। তবে তা জীবনের মত কষ্টে নয়, বদলে গেল রাগে। ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়ে বলে সে, শালাদের কাণ্ডটা দেখলি জীবন। কোন মানে হয়। সেই কলকাতা থেকে হাজার মাইল পথ এলাম। এক শালা চেকারকে দেখতে পেলি। ডাং ডাং করে বিনা টিকিটে দুদুটো লোক যাচ্ছে যেন তাদের বাপের ট্রেন। ধরার কেউ নেই। সব বাঞ্চোৎ অকস্মা। শালারা মাইনে নেয় আর ঘরে গিয়ে পড়ে পড়ে ঘুমায়। বলতো এখন আমরা কি করি।
চেকারের উপর এক বিনা টিকিটের যাত্রীর কেন এত দ্বগ স্ত্রী এখন জীবন ঠিক ঠাক বুঝে উঠতে পারে না। খিদেয় তার বোধ বুদ্ধি লুপ্ত হয়ে গেছে। তখন তাকে বিষয়টা ব্যাখ্যা করে বোঝায় রাজা–আরে যদি চেকার থাকত আর যদি আমাদের ধরে জেলে পাঠাত কটা দিন আরামে খেয়ে দেয়ে শরীরটা একটু চাঙ্গা বানিয়ে আনতে পারতাম। আমার নিজের জন্য বলছি না। তোর কথা ভেবেই বলছি। মুখ টুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তোর খুব কষ্ট হচ্ছে। খিয়ে পেয়েছে না?
এ্যাঃ। কি কইলা?
ঠিক পেয়েছে। নিশ্চয় কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে। সেই জন্য কথা শুনতে পাচ্ছিস না। চল দেখি তোর জন্য কোথা থেকে কিছু খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি কিনা।
তখন সন্ধ্যা বেশ ঘন হয়ে এসে গেছে। যদিও চারদিকে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে লাইট পোস্টে লাগানো বৈদ্যুতিক আলোগুলো তবু সে আলোয় তত জোর নেই যা গা ছমছম করা অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে দেয়। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে দূর পর্বত চূড়ায় অবস্থিত শৈল শহর দার্জিলিংকে। সেখানকার পথ ঘাট ঘর বাড়ি দোকান বাজারে সদ্য জ্বলে ওঠা আলোগুলোকে দেখাচ্ছে আকাশ থেকে খসে পড়া চারদিকে ছড়িয়ে যাওয়া একরাশ তারার মতো। মনে হচ্ছে কোন ঘন সবুজ বনের বৃক্ষ। বৃক্ষের ডালে ডালে আটকা পড়া তারারা জ্বল জ্বল করে জ্বলছে নিভছে আর জ্বলছে।
