রাতের ট্রেনের চলার ছন্দে এক অদ্ভুত মাদকতার মিশ্রণ আছে। এক মনে অনেকক্ষণ ধরে কান পেতে ছুটে চলা বেগবান ট্রেনের চাকার সাথে লাইনের ঘর্ষণের যে শব্দ, ইঞ্জিনের ফোঁস ফোঁস গর্জন, সব মিলে যে মধুর বাদ্যধ্বনি তা শুনে যেন নেশায় চোখ বুজে আসে। তারপরে বহু সময়ের একই ধরনের যন্ত্রসঙ্গীতের পর, কোন এক স্টেশনে যখন ট্রেন থামে, হকারদের সম্মিলিত কলতান, কুলিদের হাঁকাহাকি ছোটাছুটি সব মিলিয়ে যেন কোন মৃত নগরীর হঠাৎ কোন যাদুকাঠির ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পেয়ে জেগে ওঠার উল্লাস উৎসব আর আনন্দ আমেজ ফুটে ওঠে।
জীবন এখন সান্ধ্য শোক বিস্মৃত হয়ে রাত্রি গভীরের অনির্বচনীয় মাদক আমেজে ডুবে যায়। রাত যত বেড়ে চলে তত তার নেশা গাঢ়তর হয়। তখন চা অলার দ্বিমাত্রিক বাঁশচেড়া গলার গর্জনে, পাকোড়া ফল্লিদানা বিক্রেতার আনুনাসিক শব্দে, তার সাথে মিলে মিশে আসা আরও নানাবিধ জটিল এলোমেলো ধ্বনি তরঙ্গের মধ্যে একটা কাব্যিক সুষমা খুঁজে পায়। খুঁজে পায় নিশুতি রাতের শরীরময় এক আবহ সঙ্গীতের বর্ণময় রেশ।
জীবন নামক এক বালকের জীবনে এমন রাত আগে আর আসেনি। এ যেন জীবনকে সমৃদ্ধ করা নতুন রাগে রূপে উপস্থাপিত অন্যতর এক রাত। ফলে তার সারা শরীর মনে বহে যায় অদ্ভুত এক শিহরণ। এক ভালো লাগা ঢেউ। অনাস্বাদিত রোমাঞ্চের অগুনতি সেই ঢেউ দোলায় দুলে যায় প্রাণের ছোট তরণীখানি।
বেলা আট কি সাড়ে আটটার সময় ট্রেন পৌঁছে গেল ফরাক্কা স্টেশনে। এ স্টেশন হাওড়া শিয়ালদহের মত রেলিং গেট শেড দিয়ে অত ঘেরা ঘোরা নয়। চারদিকে অত পথঘাট যান বাহন বড় ছোট গাড়ির মিছিলও নেই। নেই উঁচু উঁচু বাড়ি গিজগিজে লোকের ভিড়। এখান থেকে এক দেড় মাইল দুরে ফেরীঘাট। ট্রেন থেকে নামা সব যাত্রীর পা সেই দিকে সচল। সবার পিছু পিছু রাজা আর জীবনও হাটা দেয় সেই পথ বেয়ে।
ফেরীঘাটে এসে দেখতে পায় সেখানে দাঁড়িয়ে আছে জলে গা ভাসিয়ে দু-তিনখানা স্টীমার। যারা অকারণে অথবা যাত্রী ডাকার জন্য মাঝে মাঝে ভেঁপু বাজাচ্ছে। আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় বেশ কিছু পণ্যবাহী নৌকা। যাতে মাল ওঠা নামা চলছে। রয়েছে কতগুলো মাছ ধরা ছোট নৌকাও। মালকোচা মারা খালি গায়ের কালো কালো কিছু মৎস্যজীবী ঝুড়ি ভরে ভরে নামাচ্ছে নানা জাতের নদীর মাছ। এই ফেরী ঘাট ঘিরে অসংখ্য হোটেল রেস্টুরেন্ট। সবই দরমা টিনের। সেগুলোয় এখন উপছে পড়া ভিড়।
যে স্টীমারটা প্রথম ছেড়ে যাবে তাতে যাত্রী বোঝাই করা হচ্ছে। কাঠের একটা পাটাতন বেয়ে মালপত্র নিয়ে ধীরে ধীরে তাতে চড়ছে মানুষ। পাটাতনের শেষ মাথায় স্টীমারের দরজায় রোগা কালো লুঙ্গি পড়া দুতিন জন চেকার যাত্রীদের টিকিট চেক করে তবেই ভিতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে। রাজা জীবনের টিকিট নেই। তাদের পক্ষে এই স্টীমারে চড়া অসম্ভব। সে কথা বুঝে রাজার দিকে তাকিয়ে বলে জীবন, কী হবে রাজা। আমরা ও পারে যামু কেমনে?
জীবনের কাতরতাকে কোন আমল দেয় না রাজা। দৃপ্ত গলায় বলে, আমরা ওপারে যাবো আর স্টীমারেই যাবো। একটু ধৈর্য্য ধরে দেখ।
স্টীমার তো ছাড়ে ছাড়ে।
ছাড়ুক না। এটাই কী শেষ নাকি! এরপর আরো কত আছে, আধ ঘণ্টা পরপর। একটা না একটায় চান্স পাবো।
আর একবার স্টীমার ভোঁ বাজালো। এটাই শেষ ভো। এর আগে দুবার বাজানো হয়ে গেছে। যারা যাবার সব উঠে পড়েছে। এবার লুঙ্গি পড়া চেকার ক’জন মুখের বিড়ি জলে ছুঁড়ে ফেলে প্রস্তুত হল পাটাতন সরিয়ে দেবার জন্য। ঠিক সেই সময় এক মহিলা মাথায় একটা বড় মোট আর এক দঙ্গল ছেলে পুলে নিয়ে ছুটে এল স্টীমারের দিকে। এখানকার অধিকাংশ দোকানদার স্টীমার লঞ্চের কর্মচারী সম্ভবতঃ সবাই ভালোমত তাকে চেনে। কারণ তাকে দেখেই হেসে নানা দোকান থেকে নানা মন্তব্য ছুটে আসতে লাগল। মহিলা তাদের অকথ্য ভাষায় গাল দিতে দিতে গাদা গুচ্ছের বাচ্চা নিয়ে পাটাতন বেয়ে স্টীমারে উঠার মুখে বোধ হয় কোন নতুন কর্মচারী তার কাছে টিকিট দেখতে চেয়ে থাকবে। সাথে সাথে সে জুড়ে দিল চিল চিৎকার কান্না ঝগড়া গালাগালি–টিকিট! কেন–ঘরে তোর মা নেই, বোন নেই! তার টিকিট দেখতে পারিস না। টিকিট দেখবি তো চল আমার সাথে, চল তোকে দেখাবো টিকিট! মহিলার কথ্য ভাষার সাথে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি দেখে সে গোবেচারা চেকার ভয়ে এক পাশে সরে দাঁড়ায় আর মহিলা সদলবলে প্রবিষ্ট হল জলযানের অন্দর মহলে। প্রায় সাথে সাথে পিছন পিছন দৌড়ে যায় রাজা, বিড়ি ফোঁকা বোকা বোকা চেকারের সামনে দুটো হাত জোড় করে তুলে ধরে বলে বাবু, রাগ করবেন না বাবু। মা-টার আমার মাথার ঠিক নেই তো। একে বাবু শব্দ, তার উপর জোড় হাত–এই দুই ধাক্কায় চেকার কাত। তারা ধাতস্ত হবার আগেই জীবনের হাত টেনে ধরে স্টীমারের গিজ গিজ ভিড়ের মধ্যে রাজা উধাও।
বলে রাজা–যা বাবা চড়া তো হলো। এবার যা পারে হোক। রাজার স্বস্তিতে জীবন স্বস্তি পায় না। বলে–এখন যদি ওরা এসে আমাদের ধরে?
ধরলে ধরবে। বলে রাজা–ধরে আর কি করবে। হয় এপারে নয় ওপারে এক পারে তো নামাবে। ধাক্কা মেরে জলে তো ফেলে দিতে পারবে না।
ওরা ওঠবার প্রায় সাথে সাথে চলতে শুরু করে দিয়েছে সেই জলযান। জলের রঙ ঘোলা লাল মাটির মতো। যার উপর খেলছে ছোট ছোট ঢেউ। কিছুক্ষণ সেটা চলার পর ডানদিকে দূরে দেখা যায় একটা ছোট গ্রামের আম, জাম, নারকেল সুপারির সবুজ বাগান। ঠিক তারই সামনে জলে মাছ ধরছে কিছু নৌকা চড়া মৎস্যজীবী মানুষ।
