আমার লাগে না।
কেমনে?
কেমনে? আরে মাথা মোটা পথে কি একবারও চেকারে ধরবেন না? যদি না ধরে নিজেরা গিয়ে ধরা দেবো। জেলে নিয়ে গেলে খাওয়ার কি ভাবনা। দু-দশদিন খেয়ে দেয়ে শরীরটা একটু চাঙ্গা করে নিয়ে ফের রওনা দেবো।
বাল্যের সেই জেল ভীতি উঁকি দেয় জীবনের মনে। ওর বাবাকে ধরে জেলের বদলে কুড়ি পঁচিশ মাইল দুরে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এবারেও যদি সে রকম কিছু হয়? যদি চেকাররা কুড়ি পঁচিশ স্টেশন সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেয়? তখন এই না খাওয়া দুর্বল দেহ নিয়ে কি করবে জীবন। মরে যাবে যে। জীবনের আশংকা এক ফুয়ে উড়িয়ে দেয় রাজা। পঁচিশ স্টেশন আগে নিয়ে যাবে? যাক না। যতদূরই নিয়ে নামাক আসামের ওপারে তো নিয়ে যেতে পারবে না। রেল লাইনই নেই। তাছাড়া আসাম বর্ডার পার হলেই তো অন্য দেশ।
না, আর কোনো দ্বিধা সংকোচ ভয় ভীতি নয়, যা হবার তা হবে। মনঃস্থির করে বলে জীবন, তাইলে চলো।
মাঝ পথে গিয়ে কাদাকাটি জুড়বি না তো? মা’র জন্য মন কেমন করছে আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে আয়। তাহলে আমি কিন্তু তোকে ফেলেই চলে যাবো। তখন কিন্তু বলতে পারবি না রাজাটা বেইমান। ভেবে দেখ। যাবি?
যাবো।
বেশ তবে চল।
.
তখন বিকেল হয়ে গেছে। শুরু হল দুই আধ পাগলের এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। যাত্রা না বলে একে অভিযান বলাই বোধ হয় বেশি যুক্তিযুক্ত। কাছে কারও একটা পয়সা নেই সেই অবস্থায় রওনা দিয়েছে আসাম। সে দেশে কেউ চেনা নেই জানা নেই কোথায় থাকবে কি বিপদে পড়বে সবটাই অজানা। তবু শুধু মাত্র আশার ছলনে ভুলি পরবাসের পথে হাঁটা দিয়েছে দুই উন্মাদ বালক।
তখনো ফারাক্কায় ব্রিজ নির্মাণ হয়নি। হাওড়া থেকে ট্রেন এসে থামাতো এক বড় নদীর কিনারে ফারাক্কায়। তারপর লঞ্চ ধরে আসতে হত এই পারে। খেজুরিয়া ঘাটে। সেই স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে আসতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি। সেখান থেকে পাওয়া যাবে গৌহাটি মেল। পথে কোন বিঘ্ন না ঘটলে এটা পঞ্চাশ ষাট ঘণ্টার যাত্রা পথ। যা সমাপ্ত করতে হবে একেবারে নিখরচায়। এটা এ্যাডভেঞ্চারের চেয়ে কোনও অংশে কম রোমাঞ্চক, কষ্টকর, সাহসিকতাপূর্ণ তো নয়ই, বলা চলে কিছু বেশিই।
শিয়ালদহ স্টেশনের গেটে কোন গেট কীপার ছিলো না। ওরা সহজেই গেট পার হয়ে বাইরে এসে হাঁটা দিলো হাওড়ার দিকে। তখন হাওড়া থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ট্রামের ভাড়া মাত্র আট নয়া পয়সা। সেইটুকুও কারও কাছে নেই। ধীর কিন্তু দৃঢ় পায়ে ওরা হাঁটা দেয় ওদের সামনের দিকে যা দিকের বিচারে পশ্চিম। যেদিক থেকে সূর্য ওঠে না, ডুবে যায়। যখন ওরা হাওড়ায় পৌঁছায় তার আগে সূর্য ডুবে গেছে।
রাজা জানে কোন প্লাটফর্ম থেকে ফরাক্কার ট্রেন ছাড়বে। যার সময়ও খুব একটা বাকি নেই। কিন্তু সমস্যা বিনা টিকিটে কেমন করে ভিতরে ঢোকে! এখানে শিয়ালদহের মত গেট ফাঁকা নেই। সব গেটে দু’তিন জন গেট কীপার। তার উপর গেটের সামনে একটা চাকার মত অবরোধক। যা একজন একজন করে ঠেলে ঠেলে যেতে হয়।
অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর চোখে পড়ে রাজার একটা গেটে কোন গেট কীপার নেই। অবরোধক চক্রে তালা দিয়ে সে কোথায় যেন গেছে। সাথে সাথে তার সামনে শুয়ে পড়ে রাজা। তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন ভাবে সৈনিকেরা বুকে হেঁটে আগায় সেই ভাবে চাকার নিচে থেকে ঢুকে যায় প্লাটফর্মের ভিতরে। ডাকে, চলে আয় জীবন, শিগগির। ওই একইভাবে জীবনও ঢুকে পড়ে। তারপর ছোটে ট্রেনের দিকে। তখন গার্ড সাহেব তার হাতের নীল আলো দুলিয়ে ট্রেন ছাড়ার নির্দেশ দিচ্ছে। ওরা ছুটে গিয়ে উঠে পড়ে সেই ট্রেনের এক কামরায়।
এ কামরায় বিশেষ একটা ভিড় নেই। যাত্রীরা বেশ আরামে বসে যেতে পারছে। সিট দু’চারটে খালি ছিল ইচ্ছা করলে ওরাও বসতে পারত কিন্তু তা করল না। একে টিকিট নেই তার ওপর সিট দখল, সেটা টিকিট চেকার এবং বৈধযাত্রী দুজনের কাছে গর্হিত অপরাধ। ওরা গিয়ে বসলো উল্টো দিকের দরজায়, দুপাশে দুজন। সিঁড়িতে পা ঝুলিয়ে। এদিকে প্লাটফর্ম পড়বে না। বেশ হাওয়া খেতে খেতে বাইরেটা দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে। সামান্য কিছু সময়ের মধ্যে আলোয় আলোয় উজ্জ্বল শহর পার হয়ে ট্রেনখানা প্রবেশ করল রাত্রির নিকষ অন্ধকার গর্ভের ভিতর। যত সে চলে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায় হাওড়া ব্রিজের বাতিস্তম্ভ।
জীবন কলকাতা ছেড়ে এর আগে এতদুর যাত্রায় কখনো যায় নি। ট্রেন যত সামনে আগায় যত একটু একটু করে দুরে সরে যায় কলকাতা শহর, তত তার বুকটা কি এক বেদনায় যেন ভরে ওঠে। অনেকগুলো দিন কেটে গেছে এইশহরের পথে পথে। অনেক অপমান অন্যায় অত্যাচার দিয়েছে। এই শহর দিনের পর দিন অনাহারেও রেখেছে। তবু আজ কেন কে জানে ছেড়ে যেতে বড় মায়া হচ্ছে। এই শহরের এক কোণে ঝুড়ি কোদাল নিয়ে কাজের আশায় হা পিত্যেশ করে বসে থাকত তার অসময়ে বুড়ো হয়ে যাওয়া বাপ। বাপের ফেরবার পথের দিকে তাকিয়ে বসে থাকত তার অনাহারী ভাই, বোন। ভাই বোনের কাতর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছতে অসহায় মা। এ শহর তাদের কোন কষ্ট বোঝেনি। তাই তারা কোনদিন পেট ভরে দুটো ভাত খেতে পায়নি। অসুখে বিসুখে পায় নি একটু ওষুধ। বর্ষা নামলে ভাঙা ঘরের খড়পচা জল ভিজিয়ে দিতে চার ছয় জন অভাগা মানুষের শীর্ণ শরীর। শীতকাল এলে তারা শীতের কামড়ে কুই কুই করে কঁপে আর কাঁদে। মায়াটা কি ওই অসহায় মানুষগুলোর জন্য না এই নির্দয় শহরের জন্য, সেটা এখন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না জীবন। কিন্তু তার চোখে জল ভরে আসে। মনে মনে বলে–মা মাগো, আমি তোমার এক অধম সন্তান। ক্ষমা করো। আমি আমার দায়িত্ব কর্তব্য কিছুই পালন করতে পারি নি। তাই তোমাকে ফেলে চোরের মত পালিয়ে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি তা জানি না। কী পাবো সেখানে গিয়ে তাও আমার অজানা। তবু যাচ্ছি। কেন যাচ্ছি তা আর কেউ না জানুক না বুঝুক তুমি নিশ্চয় জানো বোঝো। যদি কোন অন্যায় করে থাকি ক্ষমা কোরো।
