ভারত সভা হলের এই সভার আয়োজক যোগেন মণ্ডল স্মৃতি রক্ষা কমিটি। শুনেছিলাম এখানে কানাডা থেকে দ্বৈপায়ন সেন আসবেন। যিনি প্রথম পরিচয়ে–আমার পাঠক। দ্বিতীয় পরিচয়ে বিনায়ক সেনের ভ্রাতুস্পুত্র। তিনি আমার সঙ্গে আলাপ করতে উৎসুক। তাই আমার যাওয়া।
গিয়ে দেখি কোনো আগাম আভাস না থাকা সত্ত্বেও মুম্বাই থেকে ডাঃ বিনায়ক সেনও এখানে এসে দর্শকাসনে বসে আছেন। ষোল বছর আগে ওনাকে দেখেছিলাম, মাঝে কোনো যোগাযোগ নেই। ইলিনা সেনকে দেখেছিলাম সেও প্রায় পাঁচ সাত বছর হয়ে গেল। কীভাবে কে জানে আমি গিয়ে বিনায়ক সেনের সামনে দাঁড়ালাম। বললাম ষোল বছর আগে দল্লীতে আপনার সাথে দেখা হয়েছিল। নিয়োগীজির মৃত্যুর কয়েকদিন পর। আমি তখন ছত্তিশগড়ে থাকতাম। ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার কর্মী ছিলাম।
উনি জিজ্ঞাসা করলেন–আপনার নাম?
বলি–মনোরঞ্জন ব্যাপারী।
নাম শুনে উনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আপনার সঙ্গে কথা আছে। বেরিয়ে এলেন ফাঁকা জায়গায়। বললেন–আপনাকে নিয়ে আমি লিখেছি। আমি আর ইলিনা সেন দুজনে।
কোথায় লিখেছেন, আমার গলায় বিস্ময় বিহ্বলতা।
বলেন তিনি–দি উইক পত্রিকায়।
১৫ জুলাই ২০১৩ মাত্র পাঁচদিন আগে যে লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আর আজ ওনার সাথে দেখা। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য ‘অলৌকিক’ যুক্তি বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না, এমন একটা বিষয়। একটা জীবনে এত সব ঘটনা, এ কী বাস্তবে সম্ভব!
ডাঃ বিনায়ক সেন, কবি শঙ্খ ঘোষ, নকশাল নেতা খোকন মজুমদার, গৌতম ভদ্র, কবি জয় গোস্বামী, নাট্য বক্তিত্ব শাঁওলী মিত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী, আমার পাঠক একি সত্যিই সম্ভব!
যদি তেমন হয়–যা জীবন তোকে ক্ষমা করে দিলাম। আর তোর উপর আমার কোনো ক্ষোভ নেই। রাগ নেই ক্রোধ নেই। সার্টিফিকেট দিয়ে দিলাম–যা তুই পরীক্ষায় পাশ। সফল তুই।
.
ঢেঁকি যদি চন্দন কাঠ দ্বারাও নির্মিত হয়ে থাকে তার ভাগ্যে লাথিই বরাদ্দ হয়ে আছে। আমি এক দলিত পরিবারের সন্তান তার উপর দরিদ্র। এক সাথে দু-দুটো অপরাধে অপরাধী। এই কারণে এই দেশ এই সমাজ আমাকে দয়া করে কৃপা করুণার অযোগ্য বলে মনে করে। আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা অন্যায় শুধু নয়–পাপ। আর তাই আমা হেন পাপিষ্ঠকে বিনাশ করে ফেলার সদিচ্ছায় আমার কর্মক্ষেত্র নামক কুরুক্ষেত্রে সপ্তদশ রথীর মতো ঘিরে ধরেছে ক্ষমতাধর সহকর্মীরা। যার হাতে যা অস্ত্র আছে নির্মমভাবে নিক্ষেপ করে চলেছে আমার দিকে। আমাকে ধ্বংস করে ফেলার ক্রুর অভিঙ্গায়।
একজন কেরানিবাবু আছেন, জন্ম প্রতিবন্ধী। দুটো পা চলৎশক্তিহীন। চলাফেরা সব হুইল চেয়ারে। নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই অথচ পদাধিকারে তিনি মহা শক্তিমান। আমি ছুটিছাটা নিলে দরখাস্ত তারই কাছে জমা দেবার নিয়ম! শুধু এইটুকু ক্ষমতার বলে তিনি আমাকে সাধ্যমতো বিরক্ত করে থাকেন। চেয়ারে বসে আছেন, হাতে কোনো কাজ নেই তবু দরখাস্ত নেবেন না। এক ঘন্টা পরে আসুন বলে চোখ বুজে থাকবেন। আমি তখন আমার ডিউটি শেষ করেছি। পেটে ছুঁচো ডন মারছে। বাড়ি গিয়ে চান করব খাবো। বিকালে ফের ডিউটি আছে। অকারণে বসে থাকতে হবে খিদে চেপে। উনি তখন সবে ডিউটিতে এসেছেন। বসে আছেন পাখার নিচে। আমার কষ্টে ওনার মুখে তৃপ্তির হাসি খেলছে।
একদিন একটু ক্ষুব্ধ হয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি যে আমার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন এর কারণ কী? তিনি জোরালো জবাব দিয়েছিলেন—’অন্যের কথা জানি না, আমি আপনার সাথে এই ব্যবহার করি, তার কারণ আপনি তৃণমূল!’
লোকটা সিপিএম পার্টির সদস্য। পা না থাকুক পিছনে পার্টি আছে। শুধু এই শক্তিতে-সাহসে একটা অসত্য অজুহাত দাঁড় করিয়ে অন্ধ আক্রোশের সপক্ষে যুক্তি দিচ্ছে সেটা সেই যুক্তি যা আমেরিকা দিয়েছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের সময়ে–যে আমাদের পক্ষে নয়, সে ওদের পক্ষে।
আমি সিপিএম নই। সেটা এরা সবাই জানে। আমি এদের মিছিলে যাই না মিটিংয়ে যাই না। পোস্টার মারি না কিন্তু তৃণমূল দলের সঙ্গেও তো নেই; সেটা কিছু নয়, শুধু সিপিএমের পিছনে ঝান্ডা নিয়ে না হাঁটায় আমি এদের বিচারে তৃণমূল।
একটা পুরাতন প্রবাদ আছে। যদি কোনো কুকুরকে মেরে ফেলতে চাও পাগল বলে বদনাম করে দাও। আমি জানতাম না যে আমার কর্মস্থলে দুষ্ট চক্রটি অতি সঙ্গোপনে অনেকদিন ধরে এই কাজটি করে চলেছে। আর তাই অতি সাধারণ সিপিএম সমর্থকও আমার উপর বিরূপ হয়ে উঠেছে। এই গুপ্ত তথ্য আমি আগে জানতাম না। জানলাম সেদিন তুমুল একটা ঝগড়া হবার কারণে। একা সে নয়–দেখলাম অনেকেই বিশ্বাস করে আমি তৃণমূল। আর সেই কারণেই মনে করে আমি কোনো সহানুভূতি সমবেদনা–মানবিক ব্যবহার পাবার অনধিকারি।
এরা তো তৃণমূলভাবে কিন্তু যারা তৃণমূল তাদের চোখে আমি কী?
সবাই জানে যে এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা একজন বড় মাপের সিপিএমের নেতা। শুধু এই স্কুল কেন, গত তিরিশ বত্রিশ বছরে যে কোন সরকারি দপ্তরে যত চাকরি হয়েছে কোথাও সিপিএম পার্টির লোক ছাড়া কেউ চাকরি পায়নি। দেওয়া হয়নি কাউকে সিপিএমের নিজের লোক না হলে। আর এই স্কুল তো স্থাপনাই করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্যে। আমি এখানে চাকরি করি। সবার মনে পেরেকের মতো গেঁখে বসে আছে সেই ধারণা–আরে বাবা সিপিএম নাহলে কী আর চাকরি পায়। কেউ কোথাও পেয়েছে?
