শান্ত ধীর গলায় বললেন তিনি উপস্থিত শ্রোতা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে–আপনারা কী কেউ এমন আছেন যিনি ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন পড়েননি! আমার মাত্র একটাই কথা বলার আছে–এই বইখানা সমস্ত বাঙালির পাঠ করা দরকার।
আর কিছু বলবার ওনার দরকার ছিল না। এর চেয়ে বড় আর কোনো কথা হয় না। আমার মতো একজন লেখকের এর চেয়ে বড় শংসাপত্র আর কী হতে পারে!
নাট্য ব্যক্তিত্ব তীর্থঙ্কর চন্দ তার বক্তৃতায় অনেক কথার মধ্যে বললেন সেই কথাটা যা শুনে অবশ্যই নিজেকে নিজে ধন্য বলতে পারি। বললেন তিনি বহু হাজার মাইলের দূরত্ব–তবু মনোরঞ্জন ব্যাপারী তার লেখার মধ্য দিয়ে গোর্কি এবং জ্যাক লণ্ডনের সমকক্ষ সাহিত্য রচনা করে আমাদের বিস্মিত করেছেন।
যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজের অধ্যাপক জয়দীপ ষড়ঙ্গী তার বক্তৃতার মধ্যে আমার জীবন এবং সাহিত্য নিয়ে আবেগঘন গলায় আক্ষেপ করে বললেন–আমাদের দুভাগ্য মনোরঞ্জনদাকে এই দেশ তার যোগ্য মর্যাদা দেয়নি। এখনও তাকে বারো চোদ্দঘন্টা আগুনের সামনে কাজ করতে হয়। তারপরে লেখেন–সরকারের উচিত তার লেখা স্কুল পাঠ্য-পুস্তকে স্থান দেওয়া।
আর সাংবাদিক চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য তিনি তো তার বক্তৃতায় মহাভারতের অনুষঙ্গ–মহারাজ যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করছেন সে যজ্ঞে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন কুরুকুলের স্বনামধন্য সমস্ত শ্রেষ্ঠ প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ। সেই সভায় যুধিষ্ঠির অন্য কাউকে নয়–পদার্থ দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণকে। “আজ আমি এই সভায় একজন ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও সভার অনুমতি নিয়ে এক চণ্ডালের পায়ে প্রণাম করবো। যুধিষ্ঠির যেমন সেদিন সবার চেয়ে যোচ্য শ্রীকৃষ্ণকে মনে করেছিলেন–আমি মনে করি এই সময়ে প্রণাম পাবার একজন যোগ্য মানুষ–মনোরঞ্জন ব্যাপারী। আমার মনোরঞ্জনদা।” বলেই সে সত্যি সত্যিই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বসলো।
দুখানি বই আজ যার প্রকাশ অনুষ্ঠান সে নিয়ে কেউ খুব একটা বিশেষ কিছু বলেনি। বলছিল ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন আর তাঁর লেখক বিষয়ে। এই সব দেখে মনে হচ্ছিল–সেই সীমা আমি ছুঁতে পেরেছি–যে সীমা ছুঁয়ে ফেলার সাধনা আমার ছিল।
***
সেটা সেই উনিশশো আশি সালের কথা। খাস খবর’ আমাকে খবর করেছিল। সেই প্রথম টিভির পর্দায় দেখা গিয়েছিল আমার মুখ। বাংলার মানুষ শুনেছিল আমার কথা। তখন সেই সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করেছিল–আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কী?
বলেছিলাম আমি–আর কিছু নয়, শুধু ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মতো কালজয়ী একখানা বই লিখে যাওয়া। যেটা পারলে মনে করব কলম পেশা সার্থক।
সেটা পেরেছি কিনা বলবে সময়। সময়ের চেয়ে বড় বিচারক আর কেউ নেই।
***
২০ জুলাই ২০১৩ আমার জীবনের আর একটি স্মরণীয় দিন। এইদিন ভারত সভা হলে দেখা হয়ে গেল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডাক্তার বিনায়ক সেনের সঙ্গে। আজ্ঞে হ্যাঁ ইনিই সেই মহান ডাক্তার যিনি দল্লী রাজহরায় শ্রমজীবী মানুষের দানে শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা শ্রমিক নেতাশঙ্কর গুহ নিয়োগীর সহযোগিতায় গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন এক আধুনিক চিকিৎসালয়–শহিদ হাসপাতাল। যে হাসপাতাল আজ দ্রুগ আর বস্তার জেলার দরিদ্র-দলিত আদিবাসী মানুষের সব চেয়ে বড় বান্ধব। প্রাণদায়ী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান।
ইনি সেই বিনায়ক সেন যাকে দরিদ্র দলিত আদিবাসী মানুষের সেবা করার অপরাধে ছত্তিশগড়ের বিজেপি সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে কারারুদ্ধ করেছিল। ইচ্ছা ছিল কারাগারের অন্তরালে যাবজ্জীবন অন্তরীণ রেখে তার মনোবল চুর্ণ বিচূর্ণ করে দেবার। সে অসৎ উদ্দেশ্য তাদের সফল হয়নি বিশ্বজনমত গর্জে ওঠার জন্য। শুধু সাধারণ মানুষ নয়–বাইশ জন নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব মুখর হয়ে উঠেছিলেন তার মুক্তির দাবিতে। ছিঃ ছিঃ ধ্বনি শোনা গিয়েছিল সর্বত্র। বৃদ্ধ ব্যরিস্টার রাম জেঠমালানি ছুটে গিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টে ডাঃ বিনায়ক সেনকে মুক্ত করার জন্য। কোনো এক মাওবাদী নেতার সঙ্গে সংযোগ–শুধু এই অভিযোগে রাষ্ট্রের এই বর্বর প্রতিহিংসার মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন বিচারপতি। তাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসতে পেরেছেন মানুষের মাঝে মানুষের কাজে।
আমার সঙ্গে ওনার মাত্র একবার দেখা হয়েছিল। সেটা দল্লীতে–নিয়োগীজির মৃত্যুর দিন সাতেক পরে। সেদিন আমি ছিলাম আর ছিল কাঁকেরের নাজিব কুরেশি। খুব বেশি হলে দশ মিনিট কথা বলেছিলাম। কী বলেছিলাম সেদিন আজ আর মনে নেই। তবে সেদিনের সেই সামান্য সাক্ষাৎকারের স্মৃতি মনের পর্দায় আজও রয়ে গেছে অমলিন হয়ে। ষোল বছর কেটে গেছে তারপর। অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে সময় সমাজ রাজনীতিতে। এত বছর পরে আবার মুখোমুখি হলাম সেই স্মৃতির। সেই কিংবদন্তীর মহা নায়কের।
আচ্ছা এটা কী ঠিক টেলিপ্যাথি বলে একটা কিছু আছে? যে মুহূর্তে কোন নাম কোনো প্রিয়মুখ আমার মনে পড়ছে অনুরূপভাবে তারও মনের মুকুরে প্রতিভাত হবে আমার মুখ। তা না হলে এই কয়েকদিন আগে যখন ডাঃ বিনায়ক সেন এবং তার যোগ্য সহধর্মিনী ইলিনা সেন আমার কথা ভাবছিলেন–তাদের কথা আমার মনে পড়বে কেন?
তারিখটা ঠিক মনে নেই তবে এই জুলাই মাসের প্রথমদিকে স্টুডেন্ট হলে একটা অনুষ্ঠান ছিল। সেই সময় আমার ডাঃ বিনায়ক সেন আর ইলিনা সেনের কথা মনে পড়েছিল। অংকের হিসাবে যে সময় ওনাদের মনের আনাচে কানাচে হেঁটে বেড়াচ্ছিল লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারী আর ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন নামক একখানা পুস্তক।
