আর তাই আমার উপর অন্যায় অবিচারের কথা বলি–লোকের চোখে সেটা সিপিএমের নিজেদের খাওয়াখাওয়ির ব্যাপার। এতে তাদের কী করার আছে?
শেঠির হাসপাতালের উল্টোদিকে একটা হোটেলের বোর্ডে নাম লেখা বৌদির হোটেল।বউদির স্বামীর নাম অমূল্য মাঝি। অমূল্য মাঝি সিপিএম করে। সেই অপরাধে কংগ্রেস দলের লোকেরা মেরে একটা পা ভেঙে দেয়। সে কারণে এখন সে প্রতিবন্ধী। এবং প্রতিবন্ধী সংগঠনের সদস্য। যারা তাকে মেরেছিল পরে সব সিপিএম হয়ে গেছে। সেটা অবশ্য অন্য গল্প। তবে যেটা বলার সেটা হল–এই এলাকার এক সিপিএম নেতা কিছুদিন আগে জোর করে দুকাঠা জমি সহ অমূল্য মাঝির দোতলা বাড়িটা দখল করে নিয়েছে। যে খবর একটি দৈনিক পত্রিকাতেও বের হয়েছিল। কিন্তু কোনো প্রতিকার হয়নি। সবটা চাপা পড়ে গেছে ওই ‘ওদের নিজেদের ব্যাপার’ এর নিচে।
আমি ভেবেছিলাম, বলা চলে খুব আশা করেছিলাম, আগে যে সরকার ছিল, পরিবর্তনের পরে যে সরকার পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা দখল করেছে তারা তাদের মতো হৃদয়হীন অমানবিক হবে না। আমি একজন শ্রমজীবী মানুষ। লিখি, নিশ্চয় একটা কিছু সুব্যবস্থা করবে আমার জন্য। যাতে অন্ত দুবেলা খেতে পারি আর লিখতে পারি নিশ্চিন্ত মনে।
এই যে সরকার মা মাটি মানুষের সরকার, যার নেত্রী মাননীয়া মমতা ব্যানার্জী, তিনি কত তো সমিতি কমিটি গড়ে কত কবি শিল্পী সাহিত্যিক বিদ্বজনকে স্থান করে দিয়েছেন তাতে। তারা ভাতা পাচ্ছেন, পাচ্ছেন অনেক সুযোগ সুবিধা, যা না পেলেও তাদের খুব একটা অসুবিধা হতো না। তিনি তেলা মাথায় যখন তেল দিচ্ছেন এক আধ ফোঁটা এই নেড়া মাথাতেও নিশ্চয় দেবেন, যার খুব দরকার।
উনি নিজে খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে। এক কঠিন লড়াই করে পৌঁছেছেন এই জায়গায়। তিনি নিশ্চয় আর একটা লড়াকু মানুষের দিকে একটুদৃকপাত করবেন, বাড়িয়ে দেবেন সামান্য সাহায্যের হাত। যদি তা করেন লড়াইটা আমার কিছুটা সহজ হয়ে যায়। তাহলে হয়তো লিখে যেতে পারি সেই শেষ লেখাটা যেটা লেখার জন্য আমার জন্ম নেওয়া, লেখক হয়ে ওঠা, আর এত ঝড় ঝাঁপটা সয়ে এতকাল বেঁচে থাকা।
কিন্তু কে আমার কথা পৌঁছে দেবে মমতা ব্যানার্জীর কাছে? কেউ তো তেমন নেই। সবাই যে যার চরকা ঘোরাচ্ছে। কার সময় আছে আমার মতো এক অভাগার বোঝা বইবার। একদিন বড় আশা নিয়ে পৌঁছে গেলাম হরিশ মুখার্জী রোডে। মমতাময়ী মমতা দিদির বাড়ি। মনে হল যেন বহু পথ পার হয়ে বহু কষ্ট সয়ে সেই দেবধামে এসে গেছি, যেখানে আসতে পারলে জীবন সফল হয়ে যায়। পূর্ণ হয়ে যায় শূন্য কুম্ভ। ধন্য হয়ে যায় জীবন।
কালীঘাট ব্রিজের মুখেই সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র পুলিশ। পথ আটকালো তারা–কোথায় যাবে?
মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে। তখন সময় সকাল সাতটা। আমি অনেক আগে গেছি। বলল–বসে থাকো। বেলা নটায় যাবে। তার আগে যাওয়া বারণ।
দেখলাম অনেকে বসে আছে। আমিও বসে পড়লাম একধারে। বেলা নটার সময়ই যেতে পারলাম মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির দোরগোড়ায়। বসার একটা জায়গা আছে। পাতা আছে চেয়ার। কোন্ পথে কে জানে আমার আগেই শ’খানেক দর্শনপ্রার্থী এসে লাইন দিয়ে রয়েছে। আমি তাদের পিছনে বসি।
প্রায় ঘণ্টা দেড় দুই বাদে আমার ডাক এল। উল্টোদিকের এক ঘরে দেখা হল এক ভদ্রলোকের সাথে। ফরসা, মিষ্টি চেহারা, মাথায় টাক ইনি মুখ্যমন্ত্রীর সচিব। বলেন তিনি, মুখ্যমন্ত্রীর সাথে আজ দেখা হবে না। যা বলার আমাকে বলুন। যা বলার ছিল বললাম। যা দেখাবার ছিল দেখালাম। সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম আনন্দবাজার, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, স্টেটম্যান, প্রভাত খবর পত্রিকা সহ কিছু বই। আমার ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন। উনি সব দেখলেন। দেখে অবাক হলেন–আপনি লেখক! দেখে বোঝা যায় না।
বললাম ওনাকে–আমি এখন রান্নার কাজ করি। সারাদিন কেটে যায় সেই কাজে। লেখার সুযোগ পাই না। যদি উনি আমাকে একটু সুযোগ করে দেন চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
উনি কাগজ কলম দিলেন—এই কথাগুলো লিখে দিন। সাথে আপনার ঠিকানা, ফোন নম্বর, স্কুলের নাম লিখে দিলাম সেই সব।উনি যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে সেটা নিলেন। চা-ও খাওয়ালেন এক কাপ। তারপর সেই সব কাগজপত্র আন্তরিকভাবে মুখ্যমন্ত্রীর টেবিলে পৌঁছে দিয়েছিলেন কিনা আমি জানি না। এত বছর কেটে গেছে কোনো পরিবর্তন আসেনি আমার জীবনে।
বই, কাগজপত্র, দরখাস্ত নিয়ে দেখা করেছিলাম এলাকার এম.এল.এ. বিদ্যুৎমন্ত্রী মণীশ গুপ্তের সাথে। সেসব দিয়ে ওই একই অনুরোধ করেছিলাম। দেখা করেছিলাম নাট্য ব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষ আর বরো কমিটির চেয়ারম্যান তারকেশ্বর চক্রবর্তীর সাথে। তাদেরও বই-কাগজ দিয়েছি। কোনো লাভ হয়নি। মাঝখান থেকে আমার রক্ত জ্বালানো পয়সায় ছাপানো ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন বইগুলো ফালতু চলে গেছে। যা তারা হয়তো কোনো ফেরিওয়ালাকে বেচে দিয়েছে কিলো দরে।
বর্তমানে শ্রমমন্ত্রী পূর্ণেন্দু বোস, এককালে আমার গভীর চেনা ছিল। ছত্তিশগড়ের বস্তার জেলার পারালকোটে ৫৬ নং ভিলেজের এক নদীর ধারে এক সাথে পড়েছিলাম খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে। বহু বছর পরে আবার দেখা হয়েছিল দু-হাজার এগারো বইমেলায়। আমি আমার বই দিয়েছিলাম ওনাকে। উনি দোলা সেন ও ছাত্র নেতা শঙ্কুদেব পণ্ডার সাথে পরিচয় করিয়ে ছিলেন এই বলে–যেখানে কেউ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম পর্যন্ত শোনেনি সেই দণ্ডকারণ্য থেকে এসে এ বাংলা জয় করেছে। লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারী।
