একটু থেমে ধীরে ধীরে বলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। যে কবির পায়ে সব কবির মস্তক প্রণত হয় সেই শ্রেষ্ঠ কবি–আমি কিন্তু তোমার একজন পাঠক।
আহঃ! কী শান্তি! কী তৃপ্তি! মনে হল যেন কেউ এই মাত্র দূরভাষে বলে দিল মনোরঞ্জন তুমি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়ে গেছ। কবি শঙ্খ ঘোষ তোমার একজন পাঠক। কোনোদিন কী ভাবতে পেরেছিলেন জীবনে এমন মহার্ঘ প্রাপ্তি ঘটবে!
না, কোনোদিন ভাবিনি। এত বড় আশা-স্বপ্ন বুকে লালন করার মতো দুঃসাহস আমার ছিল না। আর আমি কিছু চাই না। কিছু চাই না আর। আর আমাকে কে কী দেবে! যা দেবে তা কী অমৃতের চেয়ে বড়!
কবি শঙ্খ ঘোষ আমার শিল্পকে ছুঁয়েছেন। আমার শিল্প অমর হয়ে গেছে। শিল্পের মধ্যে জড়িয়ে থাকা আমার জীবন–অমর হয়ে গেছে।
***
আজ সাতাশে আগস্ট দুহাজার তের সাল। এই দিনটা এমন একটা দিন যেমন দিন আমার আগে আর কোনদিন আসেনি। এমন মহার্ঘ-মহত্তম দিন জীবনে খুব বেশি আসে না। যা মনের মণিকোঠায় চির ভাস্বর হয়ে রয়ে যায় হয়ে যায়, একটা অত্যাশ্চর্য ঘটনা।
আজ জীবনানন্দ সভাঘরে আমাকে কেন্দ্র করে একটা অনুষ্ঠান। আর সেই অনুষ্ঠানে সভাপতির আসন অলংকৃত করে মঞ্চে আসীন এই সময়ে বরিষ্ঠ-সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি মাননীয় শঙ্খ ঘোষ। আর গান গাইবেন সত্তর দশকের পাগল করে দেওয়া গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায়, আমার লেখা পাঠ করবেন রূপশ্রী কাহালী। সমগ্র অনুষ্ঠানটির সঞ্চালন করবেন মিহির চক্রবর্তী।
সকাল থেকেই আকাশ জুড়ে ছিল মেঘের ঘনঘটা। মাঝে মাঝে কেঁপে আসছিল বৃষ্টি-বাতাস। আমার মতো অনুষ্ঠানের আয়োজকদেরও মনে নিদারুণ ভয় দাপাচ্ছিল–শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটা ভালোভাবে হতে পারবেতো! নাকি গত এক মাস ধরে প্রস্তুতির সবটা পর্যবসিত হবে এক অকারণ পণ্ডশ্রমে!তবে শেষ পর্যন্ত বেলা প্রায় দুটো আড়াইটার পর বৃষ্টি বাদল থেমে গেল ঝলমলে রোদে ভরে গেল চারদিক।
সত্যি বলতে কি–এই দিনটায় যেন মূর্ত হয়েছিল একটা প্রতীকি ব্যঞ্জনা, যা যেন আমারই জীবনের এক প্রতিরূপ। প্রথম দিকটা কর্ম-কদাকার-দুর্যোগপূর্ণ জলময়। আর শেষটা …..অন্তত আজ কাল ……? একটু কি ঝলমল আলোকিত হয়ে ওঠেনি?
সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের আয়োজক আমার দুই প্রকাশক–বইওয়ালা এবং কলকাতা প্রকাশন। প্রথম জন প্রস্তুত করেছে আমার একটা গল্প সংকলন—’মনোরঞ্জন ব্যাপারীরর গল্প সমগ্র ১’, আর পরের জন একটা উপন্যাস ‘অমানুষিক’। এই বই দুখানার প্রকাশ হবে আজ। জীবনানন্দ সভাঘরটা খুবই ছোট। তাই আগত দর্শক-শ্রোতা–সবাই বসবার আসন পাননি। যত বসে আছেন, দাঁড়িয়ে আছেন তার চেয়ে ঢের বেশি। এরা সব আমার পাঠক, আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। বসার জায়গা পাননি তা বলে কোনো অসন্তুষ্টি নেই, অভিযোগ নেই কারও। এদের দিকে দেখে কেন কে জানে বুকটায় মোচড় মারছে আমার। এরা সবাই এসেছে আমার জন্য। সব কাজ ফেলে পকেটের পয়সা খরচ করে, ট্রেনে বাসে ভিড়ে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে বনগা বারাসাত বজবজ যাদবপুর নোনাডাঙ্গা সব জায়গা থেকে মানুষ এসেছে, এসেছে শুধু আমাকে ভালোবেসে। এসেছে আমাকে দেখবে বলে, আমার কথা শুনবে বলে। যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজের অধ্যাপক জয়দীপ ষড়ঙ্গী, সাংবাদিক চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য, নাট্য ব্যক্তিত্ব তীর্থঙ্কর চন্দ এনারা এসেছেন আমার জীবন এবং সাহিত্য বিষয়ে বলবেন বলে। এই সবকিছু সংঘটিত হচ্ছে আমার মতো একজন এই সময়ের কাছে মূল্যহীন মানুষকে কেন্দ্র করে।
সময়! সব কিছু মান-মূল্য নিয়ামক হচ্ছে সময়। সময় কাউকে মূল্যবান মনে করে মাথায় তুলে নাচে। আবার সময় কাউকে মাথার উপর থেকে আছড়ে ফেলে দেয় মাটিতে। সময়ের চেয়ে শক্তিমান জগতে আর কিছু নেই।
একজন লোককে দেখেছি সকাল সন্ধে যার বাড়ির দরজায় দর্শনপ্রার্থী মানুষের মহা ভিড়। মানুষ তাকে দেখতে চায়, পা ছুঁতে চায়, দুটো কথা বলে বুকটা হাল্কা করতে চায়। মানুষটা সেই একই আছে, বদলে গেছে সময়। এখন আর দরজায় দর্শনপ্রার্থীর সে ভিড় নেই। একবুক রিক্ততা নিয়ে খাঁ খাঁ করছে দরজার সামনেটা। তিনি রাস্তায় একা হেঁটে যান কেউ তার দিকে ফিরেও তাকায় না। যদি বা তাকায়, সম্ভ্রম নয় চোখে ঝিলিক মারে কিঞ্চিৎ করুণা। এই সেই পথ যে পথে একদা তিনি হাঁটলে স্তাবক চাটুকার কৃপাভিক্ষু শতেক মানুষ পিছে হাঁটত, সময় তাদের সরিয়ে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অন্য কোনো দরজায়। এখন তিনি একা ভীষণ আর বিষম একা।
কে জানে কাল কী হবে। সময় আমার জন্য কী অর্ঘ সাজিয়ে রেখেছে কে জানে। হতে পারে সময়ের আস্তাকুড়ে বিসর্জিত হয়ে যাব আগামীর দৃশ্যপটে। তাই সেই অমানিশা আসার আগে আজকের বৃষ্টি বাদলের পরে, ভাগ্যে পাওয়া গোধূলি রোদটুকু প্রাণভরে শরীরে মেখে নিই। অন্তত এইক্ষণে হেসে উঠি কী পাইনি সে কথা ভুলে–যা পেয়েছি সেই প্রাপ্তি সুখের উল্লাস-উৎসবে।
***
সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় শুরু হল অনুষ্ঠান, সভাপতি বরণ, বই প্রকাশ, গান, লেখ্যপাঠ সেসব তো হল, কিন্তু আর যেটা হল সেটা আমার তো বটেই, উপস্থিত শ্রোতা দর্শকদের কাছেও চরম বিস্ময়ের বিষয়। কবি শঙ্খ ঘোষ সভা সমিতি সমাবেশে আজকার আর কোন বক্তব্য রাখেন না। অনেক অনুষ্ঠানে তো মঞ্চেও ওঠেন না। বসে থাকেন দর্শক আসনে। আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করার আগে উনি সেই শর্ত রেখেছিলেন–আমি কিন্তু কিছু বলব না। বলেছিলাম আমি–সে জন্য আপনাকে কোনো জোর করব না। শুধু আপনার উপস্থিতিটাই আমাকে ধন্য করবে। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক মিহির চক্রবর্তী সে শর্তের কথা জানতেন না, তাই এক সময় তিনি কবি শঙ্খ ঘোষকে অনুরোধ করে বসলেন দু-কথা বলার জন্য। আর সেই মহান কবি–নিজের শর্ত ভেঙে নিজেই মাইক হাতে উঠে দাঁড়ালেন। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে বললেন মাত্র দুটো কথা। কথা মাত্র দুটোই তবে তা দু লক্ষ কোটি কথার চেয়েও ভারি। অন্ততঃ আমার জীবনে তো বটেই।
