তালি সেদিন খুব পড়েছিল, আবেগ উচ্ছ্বাস আর সহর্ষ অভিনন্দনে যেন ছোট হল ঘরটা গমগম করছিল। আমি সব মুখের প্রশান্তি সব হাতের উজ্জ্বলতা তো দেখিনি–শুধু দেখেছিলাম একজন মানুষকে যিনি শাঁওলি মিত্র। সারা শরীর থেকে ঝরে পড়ছিল তার স্নেহমাখা ভালোলাগার অনুভূতি। সেই অনুভূতিতে ভিজে যাচ্ছিল আমার হৃদয়-মন।
পেয়েছি আমি পেয়েছি, পেরেছি, আমি পেরেছি সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থানের মহানায়িকার আশীর্বাদ আদায় করে নিতে। বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছে আমার। সার্থক হয়েছে কলমের যুদ্ধ। মঞ্চ থেকে নিচে নামবার পর চেনা-অচেনা অজস্র মানুষের অভিনন্দনে পূর্ণ হয়ে গেল জীবনের শূন্য ঝুলি। যে অবমানিত জীবনের বোঝা এতকাল বয়ে বেড়াচ্ছিলাম–সমুদ্র ঢেউয়ের মতো একটা জন উচ্ছ্বাসের ঢেউয়ে ধুয়ে দিয়ে গেল সব গ্লানি।
***
সবাই বলে তের নাকি একটা অশুভ সংখ্যা। হবে হয়তো। তবে সেটা আমার জন্য নয়। আমার কাছে এই বছরটা সারা জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বৎসর। এই বছর আমাকে যা দিয়েছে কোনো বৎসর তা দেয়নি।
একটি অল্পবয়স্ক ছেলে–নাম রাজদীপ, সে এসে ধরল আমাকে–দাদা, আমরা শিল্পী সাহিত্যিকদের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিবাদে স্টুডেন্ট হলে একটা সভা ডেকেছি। বক্তা হিসাবে আপনাকে চাই।
তার চোখে মুখে এমন আকুতি ছিল যে আর বলতে পারলাম না। তবে শর্ত রাখলাম–আমি যাব কিন্তু আমার নামটা বক্তার তালিকায় যেন রেখ না।
নির্দিষ্ট দিনে সভাঘরে গিয়ে সবার পিছনের এক কোণের একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। তখন মঞ্চে গান হচ্ছে। কিছু পরে শুরু হল বক্তৃতা। সবাই সুবক্তা এবং দেশ বিদেশের প্রচুর তথ্য জানেন। সব শেষে হঠাৎ উচ্চারিত হল আমার নাম–দলিত সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী আমাদের মধ্যে উপস্থিত আছেন। তাকে মঞ্চে আসতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। তিনি এসে কিছু বলুন।
রাজদীপ শর্ত ভেঙেছে। এখন কী করি? পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়াই মঞ্চে মাইকের সামনে। বলি, আমাকে না ডাকলেই ভালো হতো, এখন আমি কী যে বলি? আমার তো তেমন পড়াশোনা খুব একটা নেই। আছে একটা জীবন। সেই জীবনের শিক্ষা থেকে দু-একটা কথা বলছি।
একবার শঙ্কর গুহ নিয়োগীর কাছে সাফদার হাসমি এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন–কী ব্যাপার বলুন তো নিয়োগীজি, আপনারা যদি কোন মিটিং মিছিল জমায়েত করেন পুলিশ লাঠি গুলি চালিয়ে দেয়! আমরা তো সারা দেশ ঘুরে নাটক করি অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠাই, কই সরকার আমাদের তো কিছু বলে না।
তখন বলেছিলেন নিয়োগীজি–যেদিন আপনার কথা–কাজ এই শোষণ শাসন ব্যবস্থার গায়ে একটা আঁচড় কাটতে পারবে সেদিন আর আপনাকে সরকার ছাড়বে না। যতক্ষণ তা না হচ্ছে আপনি নিরাপদ।
আপনারা সবাই জানেন–কেন কাদের হাতে এরপর সাফদার হাসমি নিহত হন। কেন নিয়োগীজিকে বুকে গুলি চালিয়ে মেরে ফেলা হয়।
আমি একবার মহারাষ্ট্রে গিয়েছিলাম এক সম্মেলনে। সেখানে বিনায়ক সেনের স্ত্রী ইলিনা সেনও ছিলেন। তখন বিনায়ক সেন জেলে ছিলেন। ফলে সেটা আমার এখনও মনে আছে, সেখানে একটা দেওয়ালে একটা পোস্টারে লেখা ছিল অভিব্যক্তি কা খতরা উঠানাহি হোগা। তাই আমার মনে হয়–যদি আপনি লেখেন সে লেখা যদি এই শাসন শোষণ ব্যবস্থার গায়ে কোনো আঁচড় কাটতে পারে অভিব্যক্তি কা খতরা উঠানাহি হোগা। আপনাকে জেলে যেতে হবে, বুকে গুলি খেতে হবে। যদি সেই সম্ভাব্য বিপদের ঝুঁকি নিতে পারেন তবে লিখুন। তা না পারলে লিখবেন না। নমস্কার।
এই অনুষ্ঠানে পরিচয় হল কবি সব্যসাচী দেব-এর সাথে। উনি আগে থেকে আমাকে চেনেন। চেতনা লহর পত্রিকায় পড়েছেন আমার লেখা। বলেন তিনি–কবি শঙ্খ ঘোষ আপনার পাঠক।
এটা এমন একটা কথা যা বিশ্বাস করা কঠিন। চমকে উঠে বলি আমি–উনি কোন লেখাটা পড়েছেন আমার? ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন?
হ্যাঁ, উনি পড়েই তো আমাকে পড়তে বলেছেন।
কবি সব্যসাচী দেবের কাছ থেকে কবি শঙ্ ঘোষের ফোন নাম্বার নিয়ে পরের দিন ফোন করি কবিকে। দু-চার দিনের মধ্যে আমার একটা গল্প সংকলন প্রকাশিত হবে। খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম কার হাত দিয়ে বইটার প্রকাশ করব। এখন আমার আশা আকাশ ছুঁয়ে ফেলে–যদি কবি শঙ্খ ঘোষ ওটা করে দেন–এর চেয়ে ভালো আর কিছু হয় না।
ভয়ে ভয়ে ফোন করেছিলাম কবির ল্যান্ড ফোনে। ফোন উনিই তুলেছিলেন সে আর আমি কী করে জানব। বলেছিলাম কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে একটা কথা বলতে চাই।
আওয়াজ এল–বলছি।
গড়গড় করে এক নিঃশ্বাসে বলি আমি–কবি সব্যসাচী দেবের কাছ থেকে নাম্বার পেয়ে আপনাকে ফোন করছি। আমার নাম মনোরঞ্জন ব্যাপারী। আপনার কাছে ফোন করার কারণ–আমার একটা গল্প সংকলন বের হচ্ছে। যদি দয়া করে এটার আপনি একটু প্রকাশ করে দেন, খুব ভালো হয়।
কোথায় হবে প্রকাশ অনুষ্ঠান?
বাংলা আকাদেমিতে।
কবে?
যেদিন আপনি বলবেন। আপনি যেদিন দেবেন সেই দিনই হল বুক করব।
আমি তো আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের আগে পারব না।
গলা কাঁপছে আমার। এই সময়ের সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবি রাজি হয়ে গেছেন আমার বইয়ের প্রকাশ করতে। গলার কী দোষ সে তো কাঁপবেই। বলি–তৃতীয় সপ্তাহের পরেই প্রকাশ হবে।
হেসে বলেন তিনি–এতদিন দেরী করবে! বই বেচবে না? আমি তখন আনন্দে পেঁজা তুলোর মতো আকাশে ভাসছি-বলি কবি শঙ্খ ঘোষ যদি আমার বইকে ছুঁয়ে দেয়-বই ধন্য আমার জীবন ধন্য। সেই সুযোগ আমি ছাড়তে পারি! বই তো বিক্রি হবার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে।
