যাদবপুর কফি হাউসে এক রকম জোর করে ধরে নিয়ে এল আমার বন্ধু বাপ্পা। আমি এখানে পৌঁছবার আগে পৌঁছে গিয়েছিল ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন। ফলে আমি আসা মাত্র পেয়েছিলাম উষ্ণ অভ্যর্থনা আর একদল বন্ধু।
এখানেই একদিন দেখা হয়ে গেল গৌতম ভদ্রের সাথে। পরিচয় পাওয়া মাত্র বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কত বড় মাপের মানুষ তিনি। শুনি, ওনার ‘ন্যাড়া বেলতলায় ক’বার যায়’-বইখানার দাম আঠারোশো টাকা। সে বইয়ে এমন কী আছে যে, লোকে এত দাম দিয়ে কিনে পড়ছে। ওনার স্পর্শে আবেগ বিহ্বল হয়ে পড়ি আমি। বলি–দাদা! আপনি আমার বইটা পড়েছেন!! চোখে ভালো লাগা আলো ছড়িয়ে বলেন তিনি–না, পড়িনি। মুখস্থ করেছি! চারবার।
বিজ্ঞানী সুজয় বসু লেখক শঙ্কর রায় তপন বন্দ্যোপাধ্যায়–জানলাম এনারাও আমার পাঠক। শঙ্করদা তপনদা তত আমার সঙ্গে পরিচয় হবার অনেক আগে–যখন সেই যুগ পরিবর্তন পত্রিকায় প্রতিবেদন লিখতাম সেই লেখা নিয়ে আলোচনা করেছেন বিভিন্ন ইংরাজি পত্রিকায়–যার মধ্যে অন্যতম-ফ্রন্টিয়ার পত্রিকা।
আমার অনেক লেখায় যেসব উচ্চবর্ণ মধ্যবিত্তদের বিরুদ্ধে বহু বিষোদ্গার করেছি–তারা যে আমাকে এত আপন করে নেবে, আগে জানতাম না। কেন কে জানে বন্ধু বাপ্পার কথাই এখন সত্যি বলে মনে হয়–”শ্রেণি নয় বর্ণ নয়, ধর্ম নয়–পৃথিবীতে মাত্র দু রকম মানুষ হয়–ভালো মানুষ আর মন্দ মানুষ।”
সে যাইহোক–এই কফিহাউসের কিছু বন্ধুও দায়িত্ব নিয়েছিল সেদিন হলের ফাঁকা চেয়ারগুলো ভরে দেবার।
কথা ছিল উত্তর ২৪ পরগণার নমঃশূদ্র সমাজ থেকে একটা বড় ‘মিছিল’ আসবে। শেষ মুহূর্তে তারা আর আসতে পারেনি। কামদুনির ঘটনার প্রতিবাদে ট্রেন অবরোধে আটকে যায়। তবে বজবজের মাঝের হাট থেকে হিমাংশু বিশ্বাসের উদ্যোগে কিছু লোক এসেছিল। সবটা মিলিয়ে হল ছিল “কানায় কানায় ভরা”। আকাদেমির সচিব শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ও স্বীকার করেছিলেন–এমন ভিড় আগে কখনও হয়নি।
অনুষ্ঠানের শেষ বক্তা আমি। সবার আগে বলেছেন সুনন্দা শিকদার। ওনার জীবন-গাথা-যা লেখা আছে দয়াময়ীর কথায়–কিছুটা শোনালেন শ্রোতাদের। তারপর বললেন সদানন্দ পাল, ওনার মাটি মাখা কুমোরের আত্মকথা থেকে। এরপর এল আমার পালা।
আমি এখন রণাঙ্গণে। আমার সামনে কোনো শ্রোতা নেই। আছে প্রতিপক্ষ সেনা। যে কোনো যুদ্ধের নিয়ম সেনাপতিকে ঘায়েল করে দেওয়া সেটা করতে পারলেই বিজয় অনিবার্য। ছোট খাটো সৈন্য মেরে কী হবে, প্রধানকে টার্গেট করি! প্রধান তো এখানে শাঁওলি মিত্র। বাংলা আকাদেমির বর্তমান সভাপতি। আমি তুলে নিই শক্তিশালী শব্দাস্ত্র।
অনেকদিন–তা প্রায় বছর তিরিশ আগে যাদবপুরের এক রিকশাঅলা অতি কষ্টের সারাদিনের রোজগার পনের টাকা দিয়ে টিকিট কেটে এই পাশের আকাদেমি মঞ্চে একটা নাটক দেখতে এসেছিল সেই নাটকের নাম ছিল—’নাথবতী অনাথবৎ’।
তাকিয়ে দেখি আমার শব্দাঘাতে শাঁওলি মিত্র চেয়ারের উপর নড়ে উঠলেন। তার শিল্প একজন সাধারণ মানুষকে কতখানি মোহিত করেছিল শোনবার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠলেন।
বলি, চেয়ার থেকে দেড়ঘণ্টায় আমি নড়তে পারিনি। আমাকে যিনি চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছিলেন সেই শাঁওলি মিত্র মহাশয়া এখানে উপস্থিত আছেন–আমি এখন ওনাকে প্রণাম ছাড়া আর কি বা দিতে পারি।
তালি তালি। মঞ্চে যখন প্রথম উঠেছিলাম তালি দিয়ে অভিনন্দিত করেছিল মানুষেরা। এখন আবার তালি পড়ল। তবে আগের চেয়ে দ্বিগুণ জোরে। তালি দিলেন শাঁওলি দিদিও।
বলি–আমি আজ সেদিনের বদলা নেব। উনি আমাকে দেড়ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছিলেন, আজ আমি ওনাকে বসিয়ে রাখব। সেদিন আমি ওনার নাটক দেখেছি আজ আমার নাটক উনি দেখবেন।
আবার করতালি। আমার বন্ধু-পাঠক-স্বজাতি-স্বশ্রেণির লোকসব উৎসাহে টগবগ করে ফুটছে। কিছুক্ষণ আগের সেই ঝিমিয়ে থাকা হলঘর যেন ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে উঠেছে। তখন উপস্থিত সব দর্শক শ্রোতাকে সম্মোহিত করে ফেলেছি। এখন তাদের একটাই কাজ মাঝে মাঝে তালি বাজানো। কারণ মঞ্চে আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে তারা নিজেরাই যারা দলিত-দরিদ্র চিরবঞ্চিত, মানহারা মানব, যেভাবে ফুটবল সম্রাট পেলের এক একটা লাথি–যেমনভাবে মহম্মদ আলির এক একটা ঘুষি বিশ্বের সব কালো মানুষের ক্রোধ-ঘৃণার প্রকাশ হয়ে যায়, এখন মঞ্চে আমার উপস্থিতি ঘোষণা করছে শ্রম-সংস্কৃতির জয়।
আমি সেই মানুষ যা কাল ছিলাম। কাল যা বলেছি আজও আমার বলার কথা সেই একই। সময় বদলে গেছেমঞ্চ বদলে গেছে সে আমি কি করতে পারি। তাই বিহারের পাটনা লিটারেচারে ফেস্টিভ্যালে–সংসদ আর অধ্যক্ষর যে গল্প বলেছিলাম সেটা আর একবার বলে জনতাকে সম্মান জানাই। আমি একটু উঁচু জায়গায় বসে আছি বলে এটা ভাববার কোনো কারণ নেই যে কেউ-কেটা হয়ে গেছি। আমিও আপনাদের মতো সাধারণ মানুষ। বলি মহাভারতের সেই অর্জুন আর বব্ৰুবাহনের যুদ্ধের গল্প। যে যুদ্ধে অর্জুন বব্ৰুবাহনের রথ চল্লিশ যোজন দুরে ছুঁড়ে ফেলেছিল এক বাণ মেরে আর বব্ৰুবাহন সরিয়েছিল অজুনের রথ মাত্র তিন পা।তবু অর্জুনকে সাবাশি দেয়নি শ্রীকৃষ্ণ দিয়েছিল বীর বব্ৰুবাহনকে।
এসব গল্প-কথার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতিটা কিছু নিজের অনুকূলে এনে তৃণ থেকে বের করি তীক্ষ্ণ শর। বন্ধুগণ আপনারা ভালো বাড়িতে থাকেন, ভালো জামা কাপড় পরেন, খান ভালোমন্দ, লেখাপড়া শিখেছেন ভালোভালো স্কুলে। আপনারা তো ভালো লিখবেনই। সেটা না করতে পারা আপনাদের ব্যর্থতা। আমি ভালো লিখতে পারব না, কী করে লিখব? যে বয়সে আপনি স্কুলে গেছেন আমি গেছি পাঁচনবারি হাতে গরু চরাতে। যখন আপনি কলেজে পড়ছেন আমি জেলখানার মাটিতে কাঠির আঁচড়ে বর্ণমালা শিখেছি। আপনি আমার চেয়ে এগিয়ে আছেন–এক হাজার মাইল, আর এক হাজার বইয়ে। তবু যদি আমার লেখায় সাহিত্যের রথ এক পাও এগিয়ে থাকে আপনার একটা তালি পাবার হকদার। আপনার সেই তালি আমার কাছে শ্রীকৃষ্ণের তালি। সব পুরস্কারের চেয়ে বড় পুরস্কার।
